বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে ক্ষুধা নিরসনে সামান্য অর্থও জোগাড় করতে না পারার নৈতিক ব্যর্থতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি ছয় দফা প্রস্তাবনাও পেশ করেন।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ২০২৫ সালের 'ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে' (ডব্লিউএফএফ) মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা ও সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে একটি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, "ক্ষুধা দূর করতে আমরা কয়েক বিলিয়ন ডলারও তুলতে পারি না, অথচ অস্ত্র কেনায় সারা বিশ্বে ব্যয় হয়েছে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এটাকেই কি আমরা উন্নয়ন বলব?"
তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ক্ষুধা কোনো সংকটজনিত অভাবের ফল নয়, বরং এটি বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক ব্যর্থতা। অধ্যাপক ইউনূস জানান, ২০২৪ সালে ৬৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, যদিও বিশ্ব প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাদ্য উৎপাদন করে—যা উৎপাদনের নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা প্রমাণ করে।
বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
১. যুদ্ধ বন্ধ করা ও খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা: সংঘাতের দুষ্টচক্র ভাঙতে অবিলম্বে যুদ্ধ থামিয়ে সংলাপ শুরু করা এবং যুদ্ধাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। ২. এসডিজি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা। ৩. জলবায়ু পরিবর্তনের কার্যকর মোকাবিলা: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া। ৪. আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠন: খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্থিতিশীল রাখতে আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব। ৫. স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি: অর্থায়ন, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয়, বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলার আহ্বান। ৬. রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: বাণিজ্যনীতি যাতে খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধা না দিয়ে সহায়তা করে, তা নিশ্চিত করতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান।
অধ্যাপক ইউনূস মুনাফাভিত্তিক পুরনো অর্থনৈতিক পথকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে নতুন ব্যবসায়িক ধারা—'সমাজভিত্তিক ব্যবসা' (Social Business) প্রবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিগত মুনাফাহীন ব্যবসা যা সমস্যা সৃষ্টি না করে বরং সমাধান দেয় এবং টেকসই প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব বিলোপ এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত (Zero Net Carbon Emissions) 'তিন শূন্যের বিশ্ব' নির্মাণের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আইনি ও আর্থিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তরুণ প্রজন্মকে এই রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, "তরুণদের চাকরি খুঁজতে বলবেন না, তাদের চাকরি সৃষ্টি করতে সক্ষম করে তুলতে হবে।" তাদের জন্য বিনিয়োগ তহবিল ও সমাজভিত্তিক ব্যবসায়িক তহবিল গড়ে তুলে কৃষি উদ্ভাবনকেন্দ্র ও জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পে উদ্যোক্তা হতে সহায়তা দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
এই বছরের ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম, যা ১০ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রোমে এফএও সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার মূল প্রতিপাদ্য হলো: "উত্তম খাদ্য ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একসঙ্গে হাতে হাত রাখা।"
বিষয় : প্রধান উপদেষ্টা

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ অক্টোবর ২০২৫
বিশ্বজুড়ে সামরিক খাতে প্রতি বছর বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিপরীতে ক্ষুধা নিরসনে সামান্য অর্থও জোগাড় করতে না পারার নৈতিক ব্যর্থতা তুলে ধরেছেন বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বিশ্বনেতাদের প্রতি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার জোরালো আহ্বান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে, বিদ্যমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি ছয় দফা প্রস্তাবনাও পেশ করেন।
সোমবার (১৩ অক্টোবর) ইতালির রোমে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) আয়োজিত ২০২৫ সালের 'ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরামে' (ডব্লিউএফএফ) মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে শান্তিতে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বিশ্বজুড়ে ক্ষুধা ও সংঘাতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি বিশ্বনেতাদের কাছে একটি সরাসরি প্রশ্ন ছুড়ে দেন, "ক্ষুধা দূর করতে আমরা কয়েক বিলিয়ন ডলারও তুলতে পারি না, অথচ অস্ত্র কেনায় সারা বিশ্বে ব্যয় হয়েছে ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার। এটাকেই কি আমরা উন্নয়ন বলব?"
তিনি দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেন, ক্ষুধা কোনো সংকটজনিত অভাবের ফল নয়, বরং এটি বর্তমান অর্থনৈতিক ব্যবস্থার একটি নৈতিক ব্যর্থতা। অধ্যাপক ইউনূস জানান, ২০২৪ সালে ৬৭ কোটি ৩০ লাখ মানুষ ক্ষুধার্ত ছিল, যদিও বিশ্ব প্রয়োজনের তুলনায় বেশি খাদ্য উৎপাদন করে—যা উৎপাদনের নয়, বরং অর্থনৈতিক কাঠামোর ব্যর্থতা প্রমাণ করে।
বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রধান উপদেষ্টা ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব পেশ করেন। এর মধ্যে রয়েছে:
১. যুদ্ধ বন্ধ করা ও খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা: সংঘাতের দুষ্টচক্র ভাঙতে অবিলম্বে যুদ্ধ থামিয়ে সংলাপ শুরু করা এবং যুদ্ধাঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করা। ২. এসডিজি অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন: টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনের জন্য দেওয়া প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করা। ৩. জলবায়ু পরিবর্তনের কার্যকর মোকাবিলা: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে টিকে থাকার সক্ষমতা গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়া। ৪. আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠন: খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (সাপ্লাই চেইন) স্থিতিশীল রাখতে আঞ্চলিক খাদ্য ব্যাংক গঠনের প্রস্তাব। ৫. স্থানীয় উদ্যোক্তা সৃষ্টি: অর্থায়ন, অবকাঠামো ও বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে স্থানীয়, বিশেষত তরুণ উদ্যোক্তাদের গড়ে তোলার আহ্বান। ৬. রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: বাণিজ্যনীতি যাতে খাদ্য নিরাপত্তাকে বাধা না দিয়ে সহায়তা করে, তা নিশ্চিত করতে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের আহ্বান।
অধ্যাপক ইউনূস মুনাফাভিত্তিক পুরনো অর্থনৈতিক পথকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে নতুন ব্যবসায়িক ধারা—'সমাজভিত্তিক ব্যবসা' (Social Business) প্রবর্তনের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, এটি ব্যক্তিগত মুনাফাহীন ব্যবসা যা সমস্যা সৃষ্টি না করে বরং সমাধান দেয় এবং টেকসই প্রতিষ্ঠান তৈরি করে। তিনি দারিদ্র্য দূরীকরণ, বেকারত্ব বিলোপ এবং কার্বন নিঃসরণমুক্ত (Zero Net Carbon Emissions) 'তিন শূন্যের বিশ্ব' নির্মাণের আহ্বান জানান। তিনি আরও বলেন, এই ধরনের উদ্যোগকে এগিয়ে নিতে আইনি ও আর্থিক কাঠামো তৈরি করতে হবে।
তরুণ প্রজন্মকে এই রূপান্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, "তরুণদের চাকরি খুঁজতে বলবেন না, তাদের চাকরি সৃষ্টি করতে সক্ষম করে তুলতে হবে।" তাদের জন্য বিনিয়োগ তহবিল ও সমাজভিত্তিক ব্যবসায়িক তহবিল গড়ে তুলে কৃষি উদ্ভাবনকেন্দ্র ও জলবায়ু-সহনশীল প্রকল্পে উদ্যোক্তা হতে সহায়তা দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।
এই বছরের ওয়ার্ল্ড ফুড ফোরাম, যা ১০ অক্টোবর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত রোমে এফএও সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তার মূল প্রতিপাদ্য হলো: "উত্তম খাদ্য ও সুন্দর ভবিষ্যতের জন্য একসঙ্গে হাতে হাত রাখা।"

আপনার মতামত লিখুন