গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণা করতে সরকারের দ্বিধা কোথায়? প্রশ্ন মাওলানা আরশাদ মাদানির
ভারতে গো-রক্ষার নামে গণপিটুনি, সহিংসতা এবং ঘৃণ্য রাজনৈতিক ফায়দা লোটার খেলা বন্ধ করতে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণার জোরালো দাবি জানিয়েছে শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ। সংগঠনের সভাপতি মাওলানা আরশাদ মাদানি জানিয়েছেন, এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপে ভারতের মুসলিমদের কোনো আপত্তি নেই। বরং এর মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ফিরবে এবং নিরীহ মানুষের জীবন রক্ষা পাবে।ভারতে গরুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গণপিটুনি, হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের অবসান ঘটাতে গরুকে ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণা করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেছে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় মুসলিম সংগঠন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ (আরশাদ মাদানি)। গত বুধবার এক বিবৃতিতে সংগঠনটি জানায়, এই পদক্ষেপ নেওয়া হলে গো-রক্ষার নামে চলা সহিংসতা, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ এবং রাজনৈতিক অপব্যবহারের স্থায়ী অবসান ঘটবে।সরকারের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা নিয়ে প্রশ্নজমিয়ত প্রধান মাওলানা আরশাদ মাদানি এক প্রেস বিবৃতিতে বলেন, "যেহেতু ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ গরুকে পবিত্র মনে করেন এবং মায়ের মর্যাদা দেন, তাই একে ‘জাতীয় পশু’ ঘোষণা করতে সরকারের কী বাধ্যবাধকতা রয়েছে তা স্পষ্ট করা উচিত।" তিনি আরও যোগ করেন, এই দাবি শুধু মুসলিমদের নয়, বহু হিন্দু সাধু ও ধর্মীয় নেতারাও দীর্ঘদিন ধরে এই দাবি জানিয়ে আসছেন। এরপরেও সরকার কেন বিষয়টি নিয়ে আন্তরিক নয়, তা নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।অপপ্রচার ও মুসলিমদের ওপর প্রভাবমাওলানা মাদানি অভিযোগ করেন, গবাদি পশু পাচারের নামে নিরীহ মানুষকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে এবং সহিংসতা ছড়াতে এই বিষয়টিকে একটি সংবেদনশীল রাজনৈতিক ও আবেগীয় হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। মুসলিমদের হেয় প্রতিপন্ন করার উদ্দেশ্যে দেশজুড়ে মিথ্যা ও গুজব ছড়ানো হয়েছে, যার ফলে সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ের একটি অংশ মুসলিমদের সন্দেহের চোখে দেখছে এবং গণপিটুনির মতো ঘটনা ঘটছে।তিনি উল্লেখ করেন, আগে ভারতের বহু মুসলিম গরু পালন করতেন। কিন্তু ২০১৪ সালের পর তৈরি হওয়া বিদ্বেষমূলক পরিস্থিতির কারণে মুসলিমরা এখন অত্যন্ত সতর্ক এবং তারা গরুর পরিবর্তে মহিষ পালনকে বেশি অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।সম্প্রীতি ও ঈদ-উল-আজহার নির্দেশনামাওলানা মাদানি স্পষ্ট করেন যে, স্বাধীনতার আগেও এবং পরেও জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ সর্বদা মুসলিমদের পরামর্শ দিয়েছে যেন তারা এমন কিছু না করেন যা সহনাগরিকদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে। ইসলাম বহু-ধর্মীয় দেশে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির সাথে বসবাসের আহ্বান জানায়। আগামী ২৭ মে অনুষ্ঠিতব্য পবিত্র ঈদ-উল-আজহা (কোরবানি) উপলক্ষে তিনি মুসলিমদের নিষিদ্ধ পশু কোরবানি করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান, যাতে অন্য ধর্মের মানুষের সাথে কোনো সংঘাত সৃষ্টি না হয়।সরকারের দ্বিমুখী নীতিদেশজুড়ে ‘এক দেশ, এক আইন’ বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (UCC) নিয়ে জোর প্রচার চালানো হলেও পশু জবাইয়ের ক্ষেত্রে কেন রাজ্যভেদে ভিন্ন আইন—তা নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেন মাদানি। তিনি বলেন, "বিজেপি শাসিত অনেক রাজ্যেই গরুর মাংস প্রকাশ্যেই খাওয়া হয় এবং সেখানে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। এমনকি একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রীও সাক্ষাৎকারে স্বীকার করেছেন যে তিনি গরুর মাংস খান। এটি সরকারের একটি চরম দ্বিমুখী নীতি।"দরগাহ আলা হযরতের সমর্থন ও সচেতনতা তৈরিএদিকে বেরেলির বিখ্যাত দরগাহ আলা হযরতের শাখা সংগঠন ‘জামাআত রাজা-ই-মুস্তফা’ও গরুকে ভারতের জাতীয় পশু ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে তারা একটি বিশেষ সচেতনতা অভিযান শুরু করেছে। সংগঠনের জাতীয় সাধারণ সম্পাদক ফারমান হাসান খান বলেন, "আমরা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের কাছে গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণার দাবি জানাচ্ছি, যা গবাদি পশু সংক্রান্ত অপরাধ ও অবৈধ কর্মকাণ্ড হ্রাস করবে।"পাশাপাশি, কোরবানির ছবি, ভিডিও বা রিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপলোড না করার জন্য যুবসমাজ ও শিশুদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি, যাতে কোনো অপ্রীতিকর বিতর্ক বা সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট না হয়।জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ ভারতের স্বাধীনতার আগে এবং পরে সবসময়ই দেশের বহু-ধর্মীয় বাস্তবতাকে সম্মান জানিয়ে মুসলিমদের অন্যান্য ধর্মের অনুভূতির প্রতি যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে এসেছে। প্রতি বছরই ঈদুল আজহার আগে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে সংগঠনটি মুসলিমদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানায়।গো-সুরক্ষা এবং তৎসংশ্লিষ্ট সহিংসতা ভারতের সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সংবেদনশীল বিষয়। জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দ এবং দরগাহ আলা হযরতের এই সম্মিলিত অবস্থান দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ হিসেবে গণ্য হতে পারে।