ইসরাইলের জ্বালানি ও আটা প্রবেশে নিষেধাজ্ঞায় গাজায় বেশিরভাগ বেকারি বন্ধ
ইসরাইল কর্তৃক গাজা উপত্যকায় মৌলিক খাদ্যসামগ্রী, বিশেষ করে আটা এবং রুটি তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রবেশে ধারাবাহিক বাধার কারণে অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটিতে মানবিক বিপর্যয় চূড়ান্ত রূপ ধারণ করেছে। ফিলিস্তিনিদের জীবন এখন চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে বলে সতর্ক করেছে গাজার সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়।এক লিখিত বিবৃতিতে মন্ত্রণালয় জানায়, "আটা এবং বেকারির জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশে ক্রমাগত বাধা দেওয়া মূলত একটি পরিকল্পিত অনাহার নীতি। নিরীহ বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে খাদ্যকে যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার এই ধারাবাহিক প্রচেষ্টা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন।"মন্ত্রণালয় আরও উল্লেখ করে, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর দেওয়া সামান্য সাহায্যের ওপর নির্ভর করে বেঁচে থাকা শিশু, নারী ও পরিবারগুলোর জীবনের শেষ খাদ্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাটি এখন সম্পূর্ণ ভেঙে পড়ার মুখে। ইসরাইল কর্তৃক আটার চালান বাজেয়াপ্ত করা এবং প্রয়োজনীয় রসদ প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ফলে অধিকাংশ রুটির কারখানা ইতোমধ্যে বন্ধ হয়ে গেছে, যা চতুর্থ জেনেভা কনভেনশনের গুরুতর লঙ্ঘন।জাতিসংঘ, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর প্রতি কোনো শর্ত ছাড়াই আটার চালান পৌঁছানোর জন্য সীমান্ত ক্রসিংগুলো খুলে দিতে ইসরাইলের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টির আহ্বান জানিয়েছে সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়। একই সাথে সংস্থাগুলোকে গাজার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের কাছে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।এর আগে ১৯ অক্টোবর, জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবে গাজার প্রায় ৫ লাখ মানুষের জন্য বরাদ্দ খাদ্য সহায়তা স্থগিত করার ঘোষণা দিলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ডব্লিউএফপি জানায়, ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত গাজা ও পশ্চিম তীরে তাদের জরুরি ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে ৪৫ কোটি (৪৫০ মিলিয়ন) ডলার জরুরি তহবিল প্রয়োজন।জ্বালানি সংকটে বন্ধের মুখে শেষ অবশিষ্ট ৭টি বেকারিগাজার সরকারি মিডিয়া অফিসের মহাপরিচালক ইসমাইল আল-থাওয়াবতা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, তথাকথিত যুদ্ধবিরতি এবং অবরোধ সত্ত্বেও ইসরাইল ফিলিস্তিনিদের ওপর দুর্ভোগ চাপিয়ে দিচ্ছে।তিনি জানান, যুদ্ধবিরতির কথা বলা হলেও গত ৩৭৭ দিনে গাজায় যে ২ লক্ষ ২৬ হাজার ২০০টি ত্রাণবাহী ট্রাক প্রবেশ করার কথা ছিল, ইসরাইল তার মাত্র ৩৩.৭ শতাংশ (৭৬,২৯৭টি ট্রাক) প্রবেশের অনুমতি দিয়েছে। ফলে গাজাবাসীর দৈনিক চাহিদার মাত্র ৩৭ শতাংশ পূরণ সম্ভব হচ্ছে এবং ৬৬ শতাংশেরও বেশি মৌলিক চাহিদা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে।আল-থাওয়াবতা আরও জানান, জ্বালানি ও আটার তীব্র সংকটের কারণে অঞ্চলের দুটি বৃহৎ বেকারি সহ বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (WFP) পরিচালিত অবশিষ্ট যে ৭টি বেকারি এখনো চালু রয়েছে, প্রয়োজনীয় রসদ ও আটা বহনকারী ট্রাক ঢুকতে না দেওয়ায় আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সেগুলোও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।তিনি সতর্ক করে বলেন, এই বেকারিগুলো বন্ধ হয়ে গেলে বাস্তুচ্যুত হাজার হাজার পরিবার, বিশেষ করে শিশু ও নারীরা তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র মৌলিক খাদ্য উৎস থেকে বঞ্চিত হবে।অনাহার ও অপুষ্টিতে অন্তত ১৫৭ শিশু সহ ৪৬৬ জনের মৃত্যুসম্মিলিত খাদ্য নিরাপত্তা পর্যায় বিন্যাস (IPC)-এর তথ্যের বরাত দিয়ে আল-থাওয়াবতা জানান, গাজার প্রায় ১৪ লাখ ফিলিস্তিনি বর্তমানে তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। শাকসবজি, ফলমূল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ অত্যন্ত সীমিত এবং যা পাওয়া যাচ্ছে তার দাম সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বহু বাইরে। ফলে পরিবারগুলো তাদের দৈনিক খাবারের সংখ্যা কমাতে বাধ্য হচ্ছে। নবজাতকের দুধ, খাদ্য সম্পূরক এবং ডায়াবেটিস ও প্রবীণ রোগীদের উপযোগী খাবারের চরম সংকট দেখা দিয়েছে।সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, ইসরাইলি গণহত্যা ও অবরুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে অপুষ্টি ও তীব্র অনাহারে এ পর্যন্ত ৪৬৬ জন ফিলিস্তিনি প্রাণ হারিয়েছেন, যার মধ্যে ১৫৭ জনই নিষ্পাপ শিশু।আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, মধ্যস্থতাকারী দেশসমূহ এবং দাতা সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে আল-থাওয়াবতা বলেন, মানবিক বিপর্যয় রোধে অনতিবিলম্বে আটা, জ্বালানি ও ত্রাণসামগ্রী প্রবেশের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং স্থগিত হওয়া সহায়তা পুনরায় চালু করতে হবে।উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি বাহিনীর অনবরত হামলায় স্কুল, হাসপাতাল, আশ্রয়কেন্দ্র ও বেকারি সহ প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৪,৫০০ ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন এবং পৌনে দুই লাখেরও (১,৭৫,৬০০) বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।