চার্চে জায়নবাদী সেন্সরশিপ: ইসরায়েলের অপরাধের কথা বলায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সন্ন্যাসিনীর বক্তব্য নিষিদ্ধ
মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদী ইসরায়েলি শাসনের জাতিগত নিধনযজ্ঞ যখন ফিলিস্তিনে প্রকাশ্যে চলছে, তখন পশ্চিমা চার্চের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা কীভাবে এই গণহত্যার সহযোগী হচ্ছে তা প্রকাশ্যে এসেছে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত জেরুজালেমের সেন্ট মেরি ম্যাগডালিন মঠ বা মনাস্ট্রিতে বসবাসকারী গ্রিক বংশোদ্ভূত আমেরিকান অর্থোডক্স রাহেবা (সন্ন্যাসিনী) আগাপিয়া স্তেফানো পোলোস ফিলিস্তিনের বাস্তব সত্য তুলে ধরায় চার্চ প্রশাসন কর্তৃক কঠোর সেন্সরশিপের শিকার হয়েছেন।জায়নবাদের আগ্রাসী রূপ এবং ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি নির্যাতনের প্রকৃত চিত্র উন্মোচন করায় এবার খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এক খ্রিস্টান ধর্মযাজিকা বা রাহেবাকে মুখ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ফিলিস্তিনের মাটিতে দীর্ঘ এক দশক যাপন করা এবং সেখানকার পরিস্থিতি সম্পর্কে গভীরভাবে অবগত রাহেবা আগাপিয়া স্তেফানো পোলোস সম্প্রতি জানিয়েছেন, সত্য প্রকাশের কারণে চার্চের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ তার ওপর কথা বলার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে।সত্যের মুখোমুখি হতে ভীত চার্চ হায়ারার্কিইউটিউবের জনপ্রিয় অনুসন্ধানী চ্যানেল 'রিজন টু রেজিস্টি উইথ দিমিত্রি লাস্কারিস'-কে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে রাহেবা আগাপিয়া জানান, ইসরায়েল কেবল ফিলিস্তিনের ইসলামি পরিচয়ের ওপরই নয়, বরং সেখানে থাকা প্রাচীন খ্রিস্টান ঐতিহ্যের বিরুদ্ধেও এক সর্বাত্মক যুদ্ধ শুরু করেছে। তিনি যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের 'গ্রিক অর্থোডক্স আর্চডায়োসিস' বা প্রধান ধর্মপ্রদেশের চার্চগুলোতে এই সত্য প্রচার করতে যান, তখন চার্চের উচ্চপদস্থ নেতারা সাধারণ খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীদের কান থেকে এই সত্য দূরে রাখতে তার বক্তব্য প্রদানের ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।অর্থোডক্স চার্চের এই রহস্যজনক নীরবতার কারণ ব্যাখ্যা করে রাহেবা আগাপিয়া বলেন, চার্চের প্রভাবশালী নেতারা একদিকে গ্রিক সরকারের সাথে নিবিড় রাজনৈতিক সম্পর্কে জড়িত, অন্যদিকে নিজেদের ক্ষমতা ও অবস্থান হারানোর চরম ভয়ে ভীত। তাদের আশঙ্কা, ইসরায়েলের সমালোচনা করলে তাদের রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলস্বরূপ, তারা ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্বকে বিসর্জন দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ও বস্তুগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।ভেঙে পড়ছে 'জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান' জোটের কল্পকাহিনীরাহেবা আগাপিয়ার এই চাঞ্চল্যকর তথ্যগুলো পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলোর বছরের পর বছর ধরে প্রচার করা তথাকথিত 'জুডিও-ক্রিশ্চিয়ান ভ্যালুজ' বা ইহুদি-খ্রিস্টান যৌথ মূল্যবোধের রূপকথাকে ধূলিসাৎ করে দেয়। তিনি জানান, দখলদার ইসরায়েলি সৈন্যরা চেকপয়েন্টগুলোতে ফিলিস্তিনি খ্রিস্টানদের থামিয়ে তাদের গলার ক্রুশ ছিঁড়ে আবর্জনার স্তূপে ফেলে দেয়। শুধু তাই নয়, চার্চের জমি বা সম্পত্তি জোরপূর্বক দখল করা হচ্ছে এবং স্থানীয় খ্রিস্টানদের সুপরিকল্পিত উপায়ে দেশত্যাগে বাধ্য করা হচ্ছে। আগাপিয়ার মতে, জায়নবাদ মধ্যপ্রাচ্যের সমস্ত প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ধর্মের জন্য একটি অস্তিত্ব সংকটের নাম।খ্রিস্টান জায়নবাদের বিভ্রান্তি ও প্রতিরোধখ্রিস্টান জায়নবাদের তীব্র সমালোচনা করে রাহেবা আগাপিয়া উল্লেখ করেন, এই মতবাদ ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রাচীন 'ইসরায়েল' ধারণাকে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত আধুনিক ইসরায়েল রাষ্ট্রের সাথে গুলিয়ে ফেলে একটি মিথ্যা ঈশ্বরের ধারণা তৈরি করেছে। তার মতে, এই উগ্র মতাদর্শ মূলত যীশু খ্রীষ্টের (ঈসা মসিহ) মূল বাণী এবং শিক্ষার পরিপন্থী এক ধরনের 'মহাভ্রান্তি'। ফিলিস্তিনে চলা দমন-পীড়ন ও সহিংসতাকে সমর্থন করা খ্রিস্টধর্মের মূল ভিত্তি ও মানবিক করুণার সম্পূর্ণ বিপরীত।সাক্ষাৎকারের শেষাংশে ফিলিস্তিনিদের এই সংগ্রামকে দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে একটি সম্পূর্ণ বৈধ ও ন্যায়সঙ্গত প্রতিরোধ হিসেবে আখ্যা দেন আগাপিয়া। তিনি মনে করেন, গ্রিক এবং অর্থোডক্স সাধারণ জনগণের নিজস্ব স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মাতৃভূমি রক্ষার ইতিহাসের আলোকেই ফিলিস্তিনের এই মুক্তিকামী লড়াইকে বোঝা উচিত এবং তাদের প্রতি সর্বাত্মক সহানুভূতি জানানো উচিত।জায়নবাদের আগ্রাসনে ফিলিস্তিন শুধু মুসলিমদের নয়, প্রাচীন খ্রিষ্টান ঐতিহ্যেরও এক বিশাল সংকটের কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এই খ্রিষ্টান জনগোষ্ঠীর জনসংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। সিস্টার আগাপিয়ার ঘটনাটি প্রথম নয়; এর আগেও ইসরায়েলি নীতির সমালোচনা করায় অনেক পশ্চিমা পাদ্রি ও অধিকারকর্মীকে চার্চ বা প্রাতিষ্ঠানিক চাপ সহ্য করতে হয়েছে।ধর্মের মূল বাণী যেখানে নিপীড়িতের পাশে দাঁড়ানো, সেখানে রাজনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থে একজন প্রত্যক্ষদর্শী সন্ন্যাসীর কণ্ঠরোধ করা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এই সেন্সরশিপ ফিলিস্তিনের প্রকৃত বাস্তবতাকে আড়াল করার একটি ব্যর্থ চেষ্টা মাত্র, যা বিশ্বজুড়ে বিবেকবান মানুষের কাছে ধর্মীয় নেতৃত্বের নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।