মিরপুরে ফার্মেসির সাইনবোর্ড নিয়ে ভারতীয় অ্যাকাউন্টের অপপ্রচার; সাম্প্রদায়িক উস্কানির অভিযোগ
ঢাকার মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকায় অবস্থিত 'রানা ফার্মেসি' নামক একটি ঔষধের দোকানকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি বিভ্রান্তিকর ও উস্কানিমূলক ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) দ্বারা জেনারেটেড এবং এডিটেড ভিডিওর মাধ্যমে দাবি করা হচ্ছে যে, দোকানটির এলইডি সাইনবোর্ডে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের গরুর মাংস খাওয়ার দাওয়াত দেওয়া হচ্ছে। তবে সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, বিশেষ করে ভারতের বেশ কয়েকটি এক্স (সাবেক টুইটার) ও ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সম্প্রতি একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে শেয়ার করা হয়। ওই ভিডিওতে দেখানো হয়, মিরপুরের উক্ত ফার্মেসির এলইডি বিলবোর্ডে স্ক্রল আকারে লেখা ভাসছে: "আগামী কোরবানী ঈদে প্রতিটি সনাতনীদেরকে, তাজার গরুর গোশতের দাওয়াত রইলো।"ভিডিওটি শেয়ার করে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের অভিযোগ তুলছে এবং উত্তেজনাপূর্ণ মন্তব্য ছড়াচ্ছে। তবে ভিডিওর সত্যতা এবং এর ভিজ্যুয়াল এলিমেন্টগুলো নিয়ে শুরু থেকেই নেটিজেনদের একাংশ ও স্থানীয়দের মনে সন্দেহ দানা বাঁধে।ছড়িয়ে পড়া ভিডিওটির সত্যতা যাচাই করতে কওমী টাইমস প্রতিনিধি ঢাকার মিরপুরের ৬০ ফিট এলাকার ঘটনাস্থলে সরেজমিনে অনুসন্ধান চালান। অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে রানা ফার্মেসির সামনে কোনো ধরনের এলইডি সাইনবোর্ড বা বিলবোর্ড অস্তিত্বশীল নেই।বাস্তব পরিস্থিতি এবং ভাইরাল ভিডিওর মধ্যে একাধিক স্পষ্ট অমিলসাইনবোর্ডের অনুপস্থিতি: দোকান মালিক জানিয়েছেন, প্রায় ৫ থেকে ৬ মাস আগেই কারিগরি ত্রুটির কারণে পুরোনো এলইডি সাইনবোর্ডটি খুলে ফেলা হয়েছে।যোগাযোগ নম্বরের অমিল: বর্তমানে দোকানের শাটারে দুটি মোবাইল নম্বর লেখা রয়েছে, কিন্তু ভাইরাল ভিডিওতে মাত্র একটি নম্বর দেখা যাচ্ছে।ভিজ্যুয়াল এডিটিং: ভিডিওতে ব্যবহৃত সাইনবোর্ডের ডিজাইন, ফন্ট এবং আলোর গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে স্থানীয় প্রযুক্তি সচেতন ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এটি মূলত এআই (AI) প্রযুক্তির সাহায্যে এডিট করা একটি ভুয়া বা ম্যানিপুলেটেড ভিডিও।ভোক্তা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের অবস্থা ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর থেকে দোকানটির সামনে উৎসুক জনতার ভিড় এবং উঁকিঝুঁকি দিতে দেখা গেছে। বিভিন্ন দূরদূরান্ত থেকে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তিরা ফোন করে দোকান মালিককে ক্রমাগত হয়রানি করছে, যা তাঁর ব্যবসায়িক পরিবেশকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।আইনি ও সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে ডিজিটাল মাধ্যমে ভুয়া কন্টেন্ট তৈরি ও প্রচার করা বাংলাদেশের সাইবার নিরাপত্তা আইন এবং প্রচলিত দণ্ডবিধির স্পষ্ট লঙ্ঘন। নাগরিক অধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে, একজন বৈধ ব্যবসায়ীর সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং সমাজে উস্কানি ছড়ানোর এই অপচেষ্টা অত্যন্ত বিপজ্জনক।ইতিমধ্যেই বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এসেছে। স্থানীয় থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে তদন্ত শুরু করেছে। স্বাধীন সূত্র এবং স্থানীয় প্রশাসনের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ভাইরাল ভিডিওটির সাথে বর্তমান বাস্তবতার কোনো মিল নেই এবং এটি সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্টের একটি অপচেষ্টা মাত্র।ব্যবসায়ী মাসুদ রানার পূর্ণ বক্তব্যরানা ফার্মেসির মালিক মাসুদ রানা কওমী টাইমসকে বলেন:"আসসালামু আলাইকুম, আমি মাসুদ রানা, রানা ফার্মেসি, ৬০ ফিট। গতকাল সোশ্যাল মিডিয়াতে আমি একটা ভিডিও দেখলাম যেটা খুবই দুঃখজনক। যে কথা সেখানে লেখা হয়েছে, তা দেখে আমার খুব খারাপ লাগছে, কষ্ট লাগছে। কারণ আমরা মুসলমান; হিন্দু, মুসলিম, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ সবাইকে নিয়ে চলি। আর যেহেতু এটি আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, সেহেতু এখানে সব ধর্মের লোক আসে। তো যেটা দেখছি আমার কাছে খারাপ লাগছে। সেখানে যে সাইনবোর্ড দেখছেন তা এখানে ৬ মাস আগে ছিল, আর সেখানে লেখা ছিল ‘সুলভ মূল্যে ঔষধ বিক্রয় করা হয়’। হঠাৎ করে আমার সাইনবোডটা ডিস্টার্ব হয়, লেখা চলে যাচ্ছিল আসতেছিল, কোনো অক্ষরে ছিল না। পরে সাইনবোর্ডটা নামায় থুইছি পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে, তারপর থেকে কোনো কিছু নাই।"তিনি আরও বলেন, "হঠাৎ করে গতকালকে সোশ্যাল মিডিয়ায় এভাবে দেখি। দেখার পরে থানায় গেছি, জিডি করেছি। থানা থেকে লোকজন আসছে, তারা দেখে গেছে, তদন্ত করছে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই মানুষ। আর যেহেতু এটি একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, আর কোনো লোক কি চাবে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এমন কিছু হোক? কেউ কি কখনো নিজের ক্ষতি চাইবে? বাংলাদেশে হিন্দু-মুসলিম সবাই আমরা এখানে চলাফেরা করি। এখানে এমন কিছু করার সুযোগ নাই। যে বা যারা এটা করছে, আমরা তাদের বিচার চাই। কারণ আমি ব্যবসায়িকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আমাকে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। যারাই করছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হোক বা যেভাবেই হোক আমি তাদের বিচার চাই, আমার দীর্ঘদিনের সুনামটুকু তারা নষ্ট করছে।"সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন এআই টুলস এবং প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে ধর্মীয় ও সামাজিক সংবেদনশীল বিষয়ে ভুয়া ভিডিও তৈরির প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক কিছু অ্যাকাউন্ট থেকে এগুলোকে উস্কানিমূলক ক্যাপশনসহ প্রচার করে ফায়দা তোলার চেষ্টা করা হয়। এর আগেও দেশের বিভিন্ন স্থানে সামাজিক মাধ্যমের গুজবকে কেন্দ্র করে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।ডিজিটাল যুগে যেকোনো সংবেদনশীল ভিডিও বা তথ্য বিশ্বাস করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি। মিরপুরের এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কীভাবে প্রযুক্তির অপব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসন ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উচিত দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে এই ভুয়া ভিডিওর নেপথ্যের কারিগরদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনা।
১০ ঘন্টা আগে