দেয়ালকে 'অবৈধ মাদরাসা' দাবি করে গুঁড়িয়ে দিলেন বিজেপি বিধায়ক ও সমর্থকরা
ভারতের রাজধানী দিল্লির পীতমপুরা এলাকায় আদালতের বিচারাধীন একটি সীমানা প্রাচীরকে "অবৈধ মাদরাসা" দাবি করে গুঁড়িয়ে দিয়েছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের একদল উগ্র সমর্থক। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) বিধায়ক কর্নাইল সিংয়ের নেতৃত্বে এই ভাঙচুর চালানো হয়। ভাঙচুরের সময় মাদরাসার শিশুদের "জঙ্গি" বলে গালিগালাজ এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি চরম বিদ্বেষমূলক মন্তব্য করার অভিযোগ উঠেছে, যা নিয়ে এলাকায় তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।দিল্লির পীতমপুরায় গত বৃহস্পতিবার (২১ মে, ২০২৬) একদল উগ্র জনতাকে সাথে নিয়ে তাণ্ডব চালান স্থানীয় বিজেপি বিধায়ক কর্নাইল সিং। তাঁর দাবি, ভেঙে ফেলা কাঠামোটি দিল্লি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (ডিডিএ) জমিতে নির্মিত একটি "অবৈধ মাদরাসা"। তবে স্থানীয় পুলিশ ও নথিপত্র অনুযায়ী, বিতর্কিত ওই কাঠামোটি আদতে কোনো মাদরাসা নয়, বরং গত দুই মাসে নির্মিত মাত্র চার থেকে পাঁচ ফুটের একটি সাধারণ সীমানা প্রাচীর (বাউন্ডারি ওয়াল)। অধিকন্তু, এই জমির মালিকানা সংক্রান্ত বিরোধটি বর্তমানে উচ্চ আদালতে (হাইকোর্ট) বিচারাধীন রয়েছে।ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারপ্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ঘটনার দিন বিধায়ক কর্নাইল সিংয়ের সাথে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের প্রায় ৮০ থেকে ১০০ জন সমর্থক অনুষ্ঠানস্থলে এসে পৌঁছায়। তারা উসকানিমূলক স্লোগান দিতে দিতে নির্মাণাধীন দেয়ালটি ভেঙে মাটিতে মিশিয়ে দেয়। পুরো ঘটনার ভিডিও বিধায়ক নিজে ধারণ করেন এবং পরবর্তীতে তা নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে দেন।শিশুদের ‘জঙ্গি’ আখ্যা ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষস্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ অনুযায়ী, এই ভাঙচুরের সময় মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি চরম আপত্তিকর ও অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়। ক্ষিপ্ত জনতা মাদরাসায় পড়াশোনা করা ছোট ছোট শিশুদের "সন্ত্রাসী" বা "জঙ্গি" বলে আখ্যা দেয়।শুধু তাই নয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে বিজেপি বিধায়ককে প্রকাশ্যেই মাদরাসার ইমামকে হুমকি দিতে দেখা যায়। কর্নাইল সিং বলেন:"এখানে কোনো নামাজ পড়া যাবে না। আমি এটাকে চূড়ান্ত আলটিমেটাম বা হুঁশিয়ারি হিসেবে দিচ্ছি—আজকের পর থেকে এখানে আর কোনো প্রার্থনা বা নামাজ হবে না। এটাকে আপনারা শেষ সতর্কবার্তা হিসেবেই নিন কিংবা অনুরোধ হিসেবেই ভাবুন।"আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার দম্ভআইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে হিন্দুস্তান টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কর্নাইল সিং বলেন, "আমি কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের জন্য চার মাস অপেক্ষা করেছিলাম। কিন্তু তারা যখন কিছু করেনি, তখন আমাদের বিষয়টি নিজেদের হাতে নিতে হয়েছে।" তিনি দাবি করেন, জমিটি যে ডিডিএ-র, তার প্রমাণপত্র তাঁর কাছে আছে। যেকোনো পরিণতির মুখোমুখি হতে তিনি ভয় পান না বলেও দম্ভোক্তি প্রকাশ করেন।তবে এই বিরোধপূর্ণ স্থান থেকে মাত্র ১০০ মিটার দূরে অবস্থিত একটি মসজিদ সম্পূর্ণ অক্ষত ছিল। মসজিদ কমিটি এই ঘটনার সাথে তাদের কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে এবং ভেঙে ফেলা দেয়ালটির সাথে মসজিদের কোনো সম্পর্ক নেই বলেও নিশ্চিত করেছে।উচ্চ আদালতের নির্দেশনা লঙ্ঘন ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তাপ্রকাশ্য দিবালোকে বিশাল জনতা নিয়ে এই ভাঙচুর এবং স্যোশাল মিডিয়ায় ভিডিও প্রমাণের পরও এখন পর্যন্ত অভিযুক্ত বিধায়ক বা তাঁর সমর্থকদের বিরুদ্ধে পুলিশ কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে জানা গেছে।উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট তথাকথিত "বুলডোজার জাস্টিস" বা আইনি প্রক্রিয়া বহির্ভূত ভাঙচুরকে অসাংবিধানিক বলে ঘোষণা করেছিলেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছিলেন, যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া শাস্তিমূলক ভাঙচুর আইনের শাসনের পরিপন্থী।তা সত্ত্বেও হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর উসকানিতে বিভিন্ন রাজ্যে বিচারবহির্ভূত ভাঙচুরের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যমতে, ২০২৪ সালের জুন থেকে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে মুসলিমদের মালিকানাধীন বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অন্তত ২০টি ভাঙচুরের ঘটনা নথিবদ্ধ হয়েছে, যার মধ্যে ১১টি ঘটেছে অবৈধ নির্মাণের অভিযোগ বা জনস্বার্থ মামলার (PIL) প্রেক্ষিতে। শুধু ২০২৫ সালেই ৬৯টি ইসলামি ধর্মীয় স্থানকে হয় বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, নয়তো অবৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। দিল্লির এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি ভারতের রাজধানীতে সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরাপত্তা এবং আইনের জবাবদিহিতা নিয়ে পুনরায় গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।