ভারতে সংখ্যালঘু মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার ও উপাসনালয়ের ওপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী নীতি ও প্রশাসনিক নিপীড়নের আরেকটি জঘন্য দৃষ্টান্ত স্থাপিত হলো। উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর কালেক্টরেট চত্বরে অবস্থিত এক শতকেরও বেশি পুরোনো একটি ঐতিহাসিক মসজিদ গুঁড়িয়ে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। আদালতের বিতর্কিত আদেশের অজুহাতে ভোর ৫টায় বিপুলসংখ্যক পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর উপস্থিতিতে বুলডোজার চালিয়ে মসজিদটি ধ্বংস করা হয়।এই চরম সাম্প্রদায়িক ও একপেশে পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন সর্বভারতীয় মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমীন (এআইএমআইএম)-এর প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়াইসি, সমাজবাদী পার্টির সংসদ সদস্য ইকরা হাসান এবং কংগ্রেসের জ্যেষ্ঠ নেতা ও সংসদ সদস্য ইমরান মাসুদসহ দেশের শীর্ষ মুসলিম নেতৃত্ব।ওয়াইসির কড়া হুঁশিয়ারি ও সাংবিধানিক প্রশ্নসোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে (এক্স-পূর্বে টুইটার) দেওয়া এক দীর্ঘ ও ঝাঁঝালো পোস্টে আসাদউদ্দিন ওয়াইসি ভারতের তথাকথিত গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলেন।ওয়াইসি লিখেন:“ভারতে কি মুসলিমদের জন্য ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক গ্যারান্টি আর অবশিষ্ট নেই? কেন বারবার তুচ্ছ অজুহাতে আমাদের উপাসনালয়গুলোর ওপর বুলডোজার চালানো হচ্ছে? কেবল আপনাদের মনে খচখচ করছে বলেই আমাদের মসজিদ ভেঙে ধূলিসাৎ করে দিতে পারেন না। আমার ধর্মীয় স্বাধীনতা কারো দয়া বা করুণার ওপর নির্ভরশীল নয়।”তিনি জোর দিয়ে বলেন, ১৯১১ সালের ঐতিহাসিক নথিপত্র এবং ভূমির রেকর্ডে স্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে যে সেখানে এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ধারাবাহিকভাবে নামাজ আদায় করা হচ্ছিল। ভারতীয় আইনের দৃষ্টিতেও এটি ‘ওয়াকফ বাই ইউজার’ (ব্যবহারের মাধ্যমে ওয়াকফ) হিসেবে শতভাগ সুরক্ষিত ও স্বীকৃত।ওয়াইসি প্রশাসনিক দাবির আইনগত ভিত্তি উড়িয়ে দিয়ে 'তামাদি আইন' (Limitation Act) এবং 'দীর্ঘদিনের বিরোধী দখল' (Adverse Possession)-এর আইনি বিধান স্মরণ করিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সরকার হঠাৎ একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দাবি করতে পারে না যে একশো বছর ধরে উন্মুক্তভাবে ব্যবহৃত একটি জমি তাদের। কালেক্টরেট ভবন নির্মিত হওয়ার বহু আগেই এই পবিত্র মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ মসজিদ আগে এসেছে, কালেক্টরেট পরে।”বিরোধীদের অবরুদ্ধ করণ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদমসজিদ ধ্বংসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমগ্র পশ্চিম উত্তর প্রদেশে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সমাজবাদী পার্টির (এসপি) কাইরানা আসনের জনপ্রিয় লোকসভা সদস্য ইকরা হাসান যেন সাহারানপুরে গিয়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করতে না পারেন, সেজন্য তাকে কাইরানায় নিজ বাসভবনে গৃহবন্দি করে রাখা হয়।গৃহবন্দি অবস্থায় এক প্রতিক্রিয়ায় ইকরা হাসান বলেন, “জনপ্রতিনিধিদের কণ্ঠরোধ করে এবং উচ্চ আদালতে আপিল করার ন্যুনতম সময় না দিয়ে রাতারাতি এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে, যা পুরোপুরি সংবিধানবহির্ভূত ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।”অন্যদিকে, কংগ্রেস এমপি ইমরান মাসুদ প্রশাসনের এই সিদ্ধান্তকে চরম বেআইনি আখ্যা দিয়ে বলেন, “মসজিদটি ওয়াকফ বোর্ডের অন্তর্ভুক্ত হলেও আইনি প্রক্রিয়ায় ওয়াকফ বোর্ডকে কোনো পক্ষই করা হয়নি। সরকার মূলত দেশের সংবিধান ও বিচারব্যবস্থাকে বুলডোজারের নিচে পিষে মারছে। আমরা এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাব।”আইনি অজুহাত ও প্রশাসনিক তোড়জোড়গত ৪ সেপ্টেম্বর জেলা জজের আদালত মসজিদ কমিটির করা স্থগিতাংশের আবেদন খারিজ করে দিলে পরদিনই অতি দ্রুততার সাথে প্রশাসন বুলডোজার অভিযানে নামে। এর আগে গত ১৭ জুলাই স্থানীয় সিটি ম্যাজিস্ট্রেট আদালত মসজিদটিকে 'অবৈধ দখল' আখ্যা দিয়ে ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেন এবং মুসলিম পক্ষের ওপর ৬ কোটি ৪১ লাখ রুপি জরিমানা আরোপ করেন।সাহারানপুরের ডিআইজি অভিষেক সিং জানান, আদালতের রায় বাস্তবায়নেই এই উচ্ছেদ চালানো হয়েছে। এলাকাটিতে যাতে কোনো প্রতিরোধ সৃষ্টি না হতে পারে, সেজন্য র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্স (আরএএফ) ও প্রভিন্সিয়াল আর্মড কনস্ট্যাবলরি (পিএসি)-র অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করে পুরো এলাকা দুর্গ বানিয়ে ফেলা হয়।পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ভারতে হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে নিয়মিতভাবে ওয়াকফ সম্পত্তি ও ঐতিহাসিক মসজিদগুলোকে নিশানা করা হচ্ছে, যা ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সমাজকে আরও প্রান্তিক ও আতঙ্কিত করার এক পরিকল্পিত নীলক নকশা।