ভারতে মুসলিম প্রত্নতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য ধ্বংসের চলমান ধারাবাহিকতায় এবার যুক্ত হলো মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরের প্রায় ৬০০ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শাহী মসজিদ। হিন্দু ধর্মীয় উৎসব 'সিংহস্থ কুম্ভ ২০২৮'-এর রাস্তা প্রশস্তকরণ প্রকল্পের নাম করে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট মসজিদটির আংশিক ভাঙার অনুমোদন দেয়। বুলডোজার অভিযানের মুখোমুখি হয়ে এবং পুলিশের টিয়ারগ্যাস ও দমন-পীড়নের মুখে বাধ্য হয়ে মসজিদ কমিটি ও স্থানীয় মুসল্লিরা অশ্রুসজল চোখে নিজেদের ইবাদতখানার ঝুলন্ত অংশ ভেঙে ফেলার কাজ শুরু করেন।ভারতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে মুসলিমদের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও ইবাদতখানার ওপর অব্যাহত আঘাতের আরও একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটেছে মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনী শহরে। ২০২৮ সালে অনুষ্ঠিতব্য হিন্দু ধর্মীয় উৎসব 'সিংহস্থ কুম্ভ'-এর সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের অজুহাতে ছাবড়ি চকের অবস্থিত প্রায় ৬০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক শাহী মসজিদের একটি অংশ ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে।বুলডোজার প্রতিরোধ ও পুলিশি দমন-পীড়নঘটনার সূত্রপাত হয় ২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার রাতে, যখন স্থানীয় প্রশাসন মসজিদটির আংশিক ভাঙার উদ্দেশ্যে প্রাঙ্গণে বুলডোজার মোতায়েন করে। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে শত শত স্থানীয় মুসলিম চরম আতঙ্ক ও ক্ষোভ নিয়ে মসজিদের সামনে অবস্থান নেন। টানা তিন দিন ধরে চলা এই প্রতিবাদে গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার রাত পর্যন্ত সাধারণ মানুষ মসজিদটিকে বুলডোজারের হাত থেকে রক্ষা করার চেষ্টা করেন।সোমবার (২৮ সেপ্টেম্বর) সকালে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটে। ক্ষুব্ধ জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে দেশটির আধা-সামরিক বাহিনী ও পুলিশ ব্যাপক টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করে এবং লাঠিচার্জ শুরু করে। পুলিশের এই সংঘাতময় পদক্ষেপে সরু গলিগুলোতে চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রশাসন ও বুলডোজার অ্যাকশনের আতঙ্কে অনেক মুসলিম পরিবারের সদস্যরা দিনরাত মসজিদের ভেতরেই অবস্থান করছিলেন।'য়া আল্লাহ মদদ কর': অশ্রুসজল চোখে নিজেদের হাত দিয়ে মসজিদ ভাঙাপ্রশাসনের একপক্ষীয় ও নিষ্ঠুর বুলডোজার অভিযানের শিকার হয়ে পুরো কাঠামোটি হারিয়ে যাওয়ার ভয়ে বাধ্য হয়ে মসজিদ কমিটির স্বেচ্ছাসেবকরা নিজেরাই ইবাদতখানার তিন ফুটের ঝুলন্ত স্ল্যাবটি ভাঙতে শুরু করেন।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বেশ কিছু ভিডিওতে দেখা যায়, যে হাত দিয়ে একসময় আল্লাহর ঘর সংস্কার বা নির্মাণ করা হয়েছিল, সেই হাত দিয়েই নিজেদের পবিত্র মসজিদ ভেঙে ফেলার সময় কান্নায় ভেঙে পড়ছেন সাধারণ মুসল্লিরা। আকুল কণ্ঠে তারা আল্লাহর দরবারে ফরিয়াদ জানিয়ে বলছিলেন:"য়া আল্লাহ মদদ কর... য়া আল্লাহ, এই হাতগুলো দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে মসজিদ তৈরি করিয়েছিলে, আর আজ এই হাতগুলো দিয়েই তা ভাঙাতে হচ্ছে!"পুলিশি গ্রেপ্তার ও নজরদারিউজ্জয়িনীর পুলিশ সুপার (এসপি) প্রদীপ শর্মা জানান, ঘটনায় উত্তাপ ছড়ানোর অভিযোগে ১৫ জনকে আটক করা হয়েছে এবং ৭ জনের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। মামলাপ্রাপ্তদের মধ্যে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার রয়েছেন, যারা ভারতীয় কর্তৃপক্ষের ভাষায় "উস্কানিমূলক বক্তব্য" প্রচার করেছেন।এসপি আরও জানান, গোটা এলাকায় সিসিটিভি ক্যামেরা ও ড্রোন দিয়ে কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন স্থানে সতর্কতামূলক ফ্ল্যাগ মার্চ পরিচালনা করছে পুলিশ। অন্যদিকে, উজ্জয়িনী নগর নিগমের নোটিশের বিরুদ্ধে মুসলিম পক্ষের দুটি রিট পিটিশনই মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের বিচারপতি সন্দীপ এন ভাট খারিাজ করে দেন। আদালত এটিকে "বাস্তবতা" আখ্যা দিয়ে প্রশাসনের রায়কে বৈধতা দেয়।যদিও স্থানীয় শাহর কাজী খলিল-উর-রহমান ও জেলা প্রশাসন শান্তি বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন, তবে হিন্দুত্ববাদী প্রশাসনিক চাপের মুখে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের দীর্ঘদিনের ধর্মীয় ও ঐতিহাসিক অবকাঠামোগুলোকে কীভাবে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা শাহী মসজিদের এই ঘটনায় আবারও স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।