ভারতে শত শত মাদরাসা শিক্ষার্থীকে ‘পাচার’ সন্দেহে আটক, ‘সন্ত্রাসী হতে যাচ্ছ?’ প্রশ্নে হয়রানির অভিযোগ
ভারতের বিহার থেকে দেশের বিভিন্ন রাজ্যের মাদরাসায় পড়তে যাওয়া শত শত মুসলিম শিশুকে মানব পাচারের মিথ্যা অভিযোগে পথিমধ্যে আটকে রেখে হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত মাত্র কয়েক মাসে অন্তত ৩৭৫টি শিশুকে বিভিন্ন রেলস্টেশন থেকে আটক করে চাইল্ড কেয়ার হোমে বন্দি রাখা হয়। পরবর্তীকালে তদন্তে পাচারের কোনো প্রমাণ না মেলায় সব শিশুকে ছেড়ে দেওয়া হলেও, এই প্রবণতাকে মুসলিম শিশুদের সুপরিকল্পিতভাবে টার্গেট করার একটি অংশ বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।বিহারের আরারিয়া জেলার বাগদাহরা গ্রামের ১৫ বছর বয়সী কিশোর ইরফান শেখ। গত এপ্রিল মাসে সে যখন মহারাষ্ট্রের একটি মাদরাসার উদ্দেশ্যে রওনা হয়, তখন তার মা কিসওয়ার জাহান ভাবতেও পারেননি যে ছেলেকে মানব পাচারের বানোয়াট অভিযোগে মধ্যপ্রদেশের কাটনি স্টেশনে ট্রেন থেকে নামিয়ে নেওয়া হবে। ইরফানের সাথে থাকা মাদরাসার শিক্ষক এবং আরও ১৬২ জন শিশুকে একই সাথে আটক করে মধ্যপ্রদেশ রেল পুলিশ ও শিশু কল্যাণ কমিটি।বিচারের বাণী যেখানে নীরবে কাঁদে, সেখানে দরিদ্র বিধবা কিসওয়ার জাহান নিজের শেষ সম্বলটুকু খরচ করে মধ্যপ্রদেশে ছুটে যান সন্তানের খোঁজে। সমস্ত বৈধ কাগজপত্র দেখানোর পরও জাবালপুরের সরকারি হোমে ইরফানসহ বাকি শিশুদের টানা ১৩ দিন আটকে রাখা হয়।মাদরাসা দেখলেই কি জঙ্গি? আপত্তিকর জেরার মুখে শিশুরাচাইল্ড কেয়ার হোমে কাটানো সেই দিনগুলোর বর্ণনা দিতে গিয়ে ইরফান জানায়, তাদের নানা অদ্ভুত প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছিল। ইরফান বলে, "ওরা আমাদের মা-বাবার ব্যাপারে জানতে চায়। এত দূরে কেন পড়তে যাচ্ছি তা জিজ্ঞেস করে। এরপর সরাসরি প্রশ্ন করে— তোমরা কি ওখানে গিয়ে জঙ্গি (সন্ত্রাসী) হতে যাচ্ছ?"জাবালপুরের শিশু কল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান মনীশ তিওয়ারি এই আপত্তিকর জেরার পক্ষ নিয়ে সাফাই গেয়ে বলেন, "এতে ভুলের কী আছে? পুলিশও এই প্রশ্ন করেছে। আজকের দেশের যে পরিস্থিতি, তাতে এটা স্বাভাবিক। যেহেতু এরা মাদরাসায় পড়তে যাচ্ছে, তাই আমাদের সবকিছু ভালোভাবে খতিয়ে দেখতেই হতো।" যদিও শেষ পর্যন্ত কোনো অপরাধের প্রমাণ না পাওয়ায় সব শিশুকে মুক্তি দেওয়া হয়।পরিসংখ্যান ও নেপথ্যের রাজনীতিএটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৬ সালের এই কয়েক মাসেই ৯টি পৃথক অভিযানে অন্তত ৩৭৫টি শিশুকে ট্রেন থেকে আটক করা হয়। এর মধ্যে:৯টি ঘটনার মধ্যে ৮টি ক্ষেত্রেই শিশুরা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের।৭টি ক্ষেত্রে শিশুরা দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মাদরাসায় পড়তে যাচ্ছিল।৯টি ঘটনার সবকটিতেই পরবর্তী সময়ে মানব পাচারের অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে।সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, ৯টি ঘটনার মধ্যে ৮টি ঘটনাই ঘটেছে ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) শাসিত রাজ্যগুলোতে—যার মধ্যে ওড়িশায় ৬টি, মধ্যপ্রদেশে ২টি এবং কর্ণাটকে ১টি ঘটনা ঘটেছে। ২০২৪ সালের রাজ্য নির্বাচনের পর ওড়িশায় বিজেপি সরকার গঠনের পর থেকেই এই প্রবণতা তীব্র রূপ নিয়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় মাদরাসা কর্তৃপক্ষ।ওড়িশা ও কর্ণাটকের চিত্র১ থেকে ১৪ এপ্রিলের মধ্যে ওড়িশার কটক রেলস্টেশন থেকে তিন দফায় ৮৫টি শিশুকে আটক করা হয়। আরারিয়া জেলার বাসিন্দা আবিদ হুসাইন তার ১২ বছরের সন্তানকে নিয়ে নিজেই যাচ্ছিলেন ওড়িশার একটি মাদরাসায়। তিনি সাথে থাকা সত্ত্বেও পুলিশ তার সন্তানকে কেড়ে নেয়। কটকের শিশু কল্যাণ কমিটির চেয়ারম্যান মানস রঞ্জন বিসোয়াল স্বীকার করেন যে, এক মাস ধরে তদন্ত করেও পাচারের কোনো প্রমাণ না পাওয়ায় সব শিশুকে বিহারে ফেরত পাঠানো হয়েছে।জগৎসিংপুরের জামিয়া ইসলামিয়া রিয়াজতুল উলুম মাদরাসার প্রধান কাজী শেখ শরিফ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "আমাদের বিরুদ্ধে কখনো শিশুশ্রমের অভিযোগও ওঠেনি। পুলিশ চাইলে এক মিনিটেই আমাদের বৈধতা যাচাই করতে পারত। কিন্তু এটি মাদরাসা শিক্ষাকে বাধাগ্রস্ত করার একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চেষ্টা।"অন্যদিকে, কর্ণাটকের তুমাকুরু এলাকার একটি মাদরাসা থেকে ২৪ জন শিশু পালিয়ে যাওয়ার পর দেশজুড়ে শোরগোল পড়ে যায়। প্রাথমিকভাবে শিশুরা মাদরাসায় শারীরিক নির্যাতনের গল্প ফাঁদলেও, পরে তাদের অভিভাবকরা জানান যে, বাড়ির কথা মনে পড়ায় এবং নতুন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে শিশুরা বানিয়ে মিথ্যা বলেছিল। কর্ণাটকের শিশু সুরক্ষা কর্মকর্তা পবিত্র জি. পরবর্তীতে ওই মাদরাসা পরিদর্শন করে কোনো নির্যাতনের প্রমাণ পাননি।জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের ভূমিকাএই পুরো অভিযানের নেপথ্যে কাজ করছে ভারতের জাতীয় শিশু অধিকার সুরক্ষা কমিশনের একটি দীর্ঘমেয়াদী প্রচারণা। ২০২৪ সালের মে মাসে কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রিয়াঙ্ক কানুনগো সব রাজ্যের মুখ্য সচিবদের চিঠি দিয়ে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে শিশুদের যাতায়াতের ওপর কড়া নজরদারির নির্দেশ দেন। একই বছর কমিশন উত্তরপ্রদেশ সরকারকে মাদরাসার সরকারি অনুদান বন্ধের নির্দেশ দিলেও দেশের সর্বোচ্চ আদালত (সুপ্রিম কোর্ট) সেই নির্দেশের ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন। তবুও কমিশন দমে যায়নি এবং মাদরাসা শিক্ষাকে আধুনিক শিক্ষার পরিপন্থী হিসেবে তুলে ধরতে তাদের প্রচারণা জারি রেখেছে।ভ্রমণের আইনি জটিলতাশিশু অধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জুভেনাইল জাস্টিস অ্যাক্ট অনুযায়ী মা-বাবা ছাড়া শিশুরা ভ্রমণ করলে তাদের সুরক্ষার খাতিরে আটক করার আইনি সুযোগ রয়েছে। তবে শিক্ষকরা যখন স্থানীয় পঞ্চায়েত প্রধানের প্রত্যয়নপত্র, শিশুর ও মা-বাবার আধার কার্ড এবং মাদরাসার ভর্তি রসিদ সাথে রাখছেন, তখন তাকে 'পাচার' বলে ধরে নেওয়া চরম হয়রানি। মানবাধিকার সংস্থা 'বিধায়ক ভারতী'-র পরিচালক সন্তোষ শিন্দে বলেন, এই ধরণের অভিযানের ফলে দরিদ্র পরিবারগুলো চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছে। তাই রাজ্যগুলোর সংখ্যালঘু কমিশনের উচিত এই অভিবাসনের একটি সুনির্দিষ্ট গাইডলাইন তৈরি করা।মহারাষ্ট্রের উদগির মাদরাসার প্রধান মাওলানা আজিজুর রহমান আক্ষেপ করে বলেন, "আমরা বিহারের এই দরিদ্র শিশুদের বিনামূল্যে বাসস্থান ও শিক্ষার ব্যবস্থা করি। কিন্তু যদি প্রতিনিয়ত এমন আইনি হেনস্থার মুখোমুখি হতে হয়, তবে ভবিষ্যতে বিহারের শিশুদের ভর্তি নেওয়া বন্ধ করে দেওয়া ছাড়া আমাদের কোনো উপায় থাকবে না।"