শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

আন্তর্জাতিক

ভারতে অপারেশন লিটল অ্যাঞ্জেলস: ওডিশায় ৫৯ মাদ্রাসা ছাত্রকে আটক করে হয়রানির অভিযোগ

ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে রেলওয়ে পুলিশের ‘অপারেশন লিটল অ্যাঞ্জেলস’ অভিযানের নামে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের আটকের ঘটনা ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের জন্ম দিচ্ছে। মধ্যপ্রদেশের পর এবার ওডিশার কটক রেলওয়ে স্টেশনে বিহারের ৫৯ জন মাদ্রাসা ছাত্রকে আটক করে শিশু কল্যাণ সমিতির (CWC) হাতে তুলে দিয়েছে রেলওয়ে পুলিশ (RPF)। বৈধ নথিপত্র থাকার পরেও নিছক সন্দেহের বশবর্তী হয়ে এই পদক্ষেপ নেওয়ায় শিশুদের ভবিষ্যৎ এবং শিক্ষা অর্জনের অধিকার নিয়ে গভীর সংকটের সৃষ্টি হয়েছে।রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (RPF) এবং স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, মানব পাচার রোধে গৃহীত ‘অপারেশন লিটল অ্যাঞ্জেলস’-এর অধীনে এই তল্লাশি চালানো হয়েছে। পুলিশের একজন পরিদর্শক জানান, শিশুদের বয়স অত্যন্ত কম (৭ থেকে ৮ বছর) হওয়ায় তাদের মনে সন্দেহের উদ্রেক হয়। কর্তৃপক্ষের দাবি, শিশুদের সাথে থাকা শিক্ষকের কাছে মাদ্রাসা সংশ্লিষ্ট পর্যাপ্ত নথি বা ভর্তির ফর্ম ছিল না। রেলওয়ে পুলিশের মতে, অভিভাবকের অনুমতিপত্র বা আধার কার্ড থাকলেও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং পাচারের কোনো যোগসূত্র আছে কি না তা যাচাই করতেই তাদের উদ্ধার করে চাইল্ড লাইনের হেফাজতে পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনের ভাষায়, এটি একটি সতর্কতামূলক ব্যবস্থা।১৬ এপ্রিল বিহারের আররিয়া জেলা থেকে ৫৯ জন শিক্ষার্থীর একটি দল ওডিশার জগৎসিংহপুরের ‘জামিয়া ইসলামিয়া রিয়াজতুল উলূম’ মাদ্রাসায় উচ্চতর দ্বীনি শিক্ষা অর্জনের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। কটক রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছালে আরপিএফ তাদের গতিরোধ করে।ভুক্তভোগী পরিবারগুলো অত্যন্ত দরিদ্র। বিহারের আররিয়া থেকে ওডিশায় গিয়ে শিশুদের ফিরিয়ে আনার সামর্থ্য অনেকেরই নেই। অভিভাবকরা জানিয়েছেন, তারা সন্তানদের সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থার জন্য মাদ্রাসায় পাঠিয়েছিলেন।মাদ্রাসার প্রধান মাওলানা এস কে শরীফ গণমাধ্যমকে জানান, শিশুদের সাথে থাকা শিক্ষকের কাছে বৈধ আধার কার্ড এবং অভিভাবকদের লিখিত সম্মতিপত্র ছিল। তা সত্ত্বেও পুলিশ কোনো কথা না শুনে শিশুদের আটকে দেয়।শিক্ষা সফরে থাকা এই মাসুম শিশুদের হঠাৎ করে আটক করে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ায় তারা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। চলতি মাসেই এটি তৃতীয় ঘটনা যেখানে বিহারের শিক্ষার্থীদের ভিন্ন রাজ্যের মাদ্রাসায় যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া হলো। এর আগে মধ্যপ্রদেশেও ১৬৭ জন শিশুকে একইভাবে আটক করা হয়েছিল।বিভিন্ন মানবাধিকার রিপোর্ট ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, অপরাধ দমনের নামে একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের শিশুদের টার্গেট করা ভারতের সাংবিধানিক অধিকারের পরিপন্থী। ভারতীয় সংবিধানের ২১ ও ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেকের শিক্ষা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে।যদি শিশুদের সাথে অভিভাবকের সম্মতিপত্র থাকে, তবে কেবল ‘মাদ্রাসা’ পরিচয়ের কারণে তাদের পাচার হওয়া শিশু হিসেবে গণ্য করা প্রশাসনিক পক্ষপাতিত্বের ইঙ্গিত দেয়।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং শিশু সুরক্ষা আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুকে তার পরিবার বা বৈধ অভিভাবকের সম্মতি থাকা সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন করা হলে তার পেছনে সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ প্রয়োজন। নিছক অনুমানের ভিত্তিতে মাদ্রাসা শিক্ষার পথ রুদ্ধ করা এক ধরনের কাঠামোগত নিপীড়ন।এই পরিস্থিতিতে একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। দরিদ্র মুসলিম পরিবারগুলোর সন্তানদের হয়রানি বন্ধ করে দ্রুত তাদের শিক্ষার পরিবেশে ফেরার সুযোগ করে দেওয়া রাষ্ট্রের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। ভবিষ্যৎ এই শিশুদের সাথে এমন আচরণ ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর জন্য হুমকিস্বরূপ।

ভারতে অপারেশন লিটল অ্যাঞ্জেলস: ওডিশায় ৫৯ মাদ্রাসা ছাত্রকে আটক করে হয়রানির অভিযোগ