সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

বাংলাদেশ

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি: দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে এক শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়

স্বাক্ষরিত হওয়ার এক মাস পার হওয়ার আগেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে এসেছে ঐতিহাসিক ‘মক্কা চুক্তি’। মধ্যপ্রাচ্য কেন্দ্রিক তুর্কিয়ে-সৌদি আরব-পাকিস্তান নিরাপত্তা অক্ষটি এখন দক্ষিণ এশিয়া ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে বিস্তৃত হতে চলেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক উপমন্ত্রী হুমায়ুন কবীরের মন্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে যে, ইসলামিক দেশগুলোর এই স্ব-প্রতিরক্ষা মেকানিজমে ঢাকার অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি ইতিবাচক মূল্যায়ন পাচ্ছে। বাংলাদেশ যদি এই প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত প্যাক্টে আনুষ্ঠানিকভাবে যোগ দেয়, তবে তা পুরো অঞ্চলের সার্বিক ভূ-রাজনৈতিক মানচিত্র পাল্টে দিয়ে এক বৃহৎ "আন্তঃআঞ্চলিক ইসলামিক নিরাপত্তা বলয়" গঠন করবে।তুর্কিয়ে-সৌদি-পাকিস্তান থেকে দক্ষিণ এশিয়াপ্রাথমিকভাবে তুর্কিয়ে, সৌদি আরব এবং পাকিস্তান—এই তিন প্রধান শক্তি নিয়ে গঠিত মক্কা চুক্তিকে অনেকে শুধু মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জোট হিসেবেই মূল্যায়ন করেছিলেন। তবে তুরস্কের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম ইয়েনি সাফাক-এ প্রকাশিত তুর্কি বিশ্লেষক নেদরেত এরসানেল-এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই চুক্তির প্রকৃতিকে কখনোই শুধু একটি সুনির্দিষ্ট অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখা সম্ভব ছিল না। বাংলাদেশে এই প্রস্তাব আসার মাধ্যমে স্পষ্ট যে, চুক্তির কেন্দ্রবিন্দু এখন দক্ষিণ এশিয়া, ভারত মহাসাগর এবং বঙ্গোপসাগরের দিকে সম্প্রসারিত ও সমন্বিত হচ্ছে।সম্প্রতি বাংলাদেশের সাবেক উপমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর সাংবাদিকদের জানান, ইসলামিক দেশগুলোর জন্য একটি কমন সিকিউরিটি বা প্রতিরক্ষা মেকানিজম গড়ে উঠলে বাংলাদেশ তার অংশ হওয়াকে অস্বাভাবিক হিসেবে দেখে না এবং বিষয়টি ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করছে। আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণাঙ্গ আমন্ত্রণপত্র পর্যালোচনা ও যোগদানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হলেও ঢাকার এই নমনীয় ও ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ১৭ কোটি জনসংখ্যার মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশকে সঙ্গে পেলে এই জোটের ইসলামিক বিশ্বের প্রতিনিধিত্ব করার ক্ষমতা ও জনমিতিক (demographic) ওজন বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।দিল্লির ওপর নতুন ভূ-কৌশলগত চাপবিশ্লেষকদের মতে, মক্কা প্যাক্টে বাংলাদেশের সম্ভাব্য যোগদান সবচেয়ে বেশি অস্বস্তিতে ফেলবে ভারতকে। দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তানের পাশাপাশি যদি বাংলাদেশও একই নিরাপত্তা ও কৌশলগত কাঠামোয় অবস্থান নেয়, তবে তা নয়াদিল্লির ওপর এক ধরনের ‘কৌশলগত বেষ্টনী’ তৈরি করবে। দীর্ঘ ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে বিভক্ত হওয়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশ যদি অর্ধশতাব্দী পর মক্কা চুক্তির মাধ্যমে একই প্রতিরক্ষা বলয়ে সামিল হয়, তবে তা বিশ্বমঞ্চে এক বিশাল ঐতিহাসিক বার্তা বহন করবে। এর ফলে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা অবকাঠামো প্রথমবারের মতো ভারতের পূর্ব সীমান্ত সংলগ্ন বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত সম্প্রসারিত হওয়ার সুযোগ পাবে।তুর্কিয়ে-বাংলাদেশ কৌশলগত প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্ববাংলাদেশের সাথে তুরস্কের সম্পর্ক সাম্প্রতিক সময়ে অত্যন্ত সুদৃঢ় হয়েছে। গত জুলাই মাসেই বাংলাদেশের সেনাবাহিনী প্রধান আঙ্কারা সফর করে তুর্কি প্রতিরক্ষামন্ত্রী, সেনাপ্রধান এবং শীর্ষ প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে বৈঠক করেন। এতে ড্রোন (UAV) প্রযুক্তি এবং যৌথ সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনের বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির রূপরেখা তৈরি হয়। বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে তুর্কি সামরিক শিল্পের জন্য দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা রপ্তানির একটি প্রধান কৌশলগত দরজা উন্মুক্ত হচ্ছে।চীন, ব্রিটেন এবং বৈশ্বিক প্রতিক্রিয়ামক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অংশগ্রহণকে বেইজিং-বিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঢাকার সাথে চীনের গভীর কূটনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক রয়েছে; বাংলাদেশ আধুনিক যুদ্ধবিমান কেনার ক্ষেত্রেও চীনের সাথে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্বের প্রেক্ষাপটে বেজিং এই পদক্ষেপে কোনো বৈরিতা প্রকাশ করবে না বলেই মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি হিসেবে এ অঞ্চলে যুক্তরাজ্যের অর্থনৈতিক ও কমনওয়েলথ প্রভাব বিদ্যমান থাকলেও বৈশ্বিক নিরাপত্তার পরিবর্তনশীল এই সমীকরণে মক্কা চুক্তি এক নতুন বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে।সামনে যদি মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া বা মিসরের মতো বৃহৎ মুসলিম দেশগুলো এই কাঠামোয় যুক্ত হয়, তবে এটি কেবল একটি সাধারণ চুক্তিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না—এটি একটি পূর্ণাঙ্গ "আঞ্চলিক ও আন্তঃআঞ্চলিক নিরাপত্তা মেরু" -তে রূপান্তরিত হবে।

মক্কা চুক্তিতে বাংলাদেশের সম্ভাব্য অন্তর্ভুক্তি: দক্ষিণ এশিয়ায় তৈরি হচ্ছে এক শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়