শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

টার্গেটেড কিলিং: ওয়াশিংটন-তেল আবিবের নতুন আগ্রাসী নীতি ও বিশ্বশান্তি ঝুঁকি

আন্তর্জাতিক আইন ও মানবিক রীতিনীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ‘টার্গেটেড কিলিং’ বা লক্ষ্যভেদী গুপ্তহত্যাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। সম্প্রতি ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের ওপর পরিচালিত ধারাবাহিক ড্রোন ও বিমান হামলা এই অঞ্চলকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ঠেলে দিয়েছে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের এই আক্রমণাত্মক নীতি কেবল কূটনৈতিক পথকেই রুদ্ধ করছে না, বরং প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে শত শত নিরপরাধ বেসামরিক মানুষের।মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এবং ইসরাইলি সরকারের পক্ষ থেকে এই হামলাগুলোকে ‘প্রতিরোধমূলক’ এবং ‘সন্ত্রাসবাদ বিরোধী’ পদক্ষেপ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। ইসরাইলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ইসরাইল কাটজ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন যে, ইসরাইলি সেনাবাহিনী এখন থেকে যেকোনো স্থানে যেকোনো উচ্চপদস্থ ইরানি কর্মকর্তাকে লক্ষ্যবস্তু করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখে। তাদের দাবি, ইরানের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব এবং পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা রুখতে এই ধরণের ‘সার্জিক্যাল স্ট্রাইক’ অপরিহার্য। মার্কিন নীতিনির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে, সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে শীর্ষ নেতৃত্বকে সরিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে ইরানকে আলোচনার টেবিলে বাধ্য করা সম্ভব। তাদের মতে, এটি একটি ‘ন্যূনতম ক্ষয়ক্ষতির’ রণকৌশল যা বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ এড়াতে সহায়ক।১৭ ও ১৮ মার্চ, পরিচালিত মার্কিন-ইসরাইল যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সাবেক শীর্ষ কূটনীতিক আলী লারিগানি, রেভল্যুশনারি গার্ডের জেনারেল গোলাম রেজা সোলেইমানি এবং গোয়েন্দা মন্ত্রী ইসমাইল খাতিবকে হত্যা করা হয়েছে। এই হামলাগুলো কেবল সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে সীমাবদ্ধ ছিল না।বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ: আলী লারিগানিকে লক্ষ্য করে চালানো ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় একটি বহুতল আবাসিক ভবন সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকারী সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এই একটি হামলাতেই ১০০-এর বেশি সাধারণ নাগরিক নিহত হয়েছেন।অর্থনৈতিক বিপর্যয়: এই হত্যাকাণ্ডের পরপরই বিশ্বের বৃহত্তম গ্যাস ক্ষেত্র ‘সাউথ পার্স’-এ বড় ধরনের হামলা চালায় ইসরাইল। এর প্রতিক্রিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি অবকাঠামোতে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে কাতারসহ প্রতিবেশী মুসলিম দেশগুলোর ওপর।শান্তির পথ রুদ্ধ: বিশ্লেষকদের মতে, আলী লারিগানির মতো প্রজ্ঞাবান ও মধ্যপন্থী ব্যক্তিত্বকে হত্যার অর্থ হলো—শান্তি আলোচনার শেষ সুযোগটুকুও বন্ধ করে দেওয়া। এতে প্রমাণিত হয় যে, ইসরাইল পরিকল্পিতভাবে ইরানের অভ্যন্তরে ‘যৌক্তিক কণ্ঠস্বর’গুলোকে স্তব্ধ করে দিয়ে একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক যুদ্ধ উস্কে দিচ্ছে।এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ‘এক্সিকিউটিভ অর্ডার ১২৩৩৩’ এর মাধ্যমে সরকারিভাবে গুপ্তহত্যা নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭০-এর দশকে চার্চ কমিটির তদন্তে ফিদেল কাস্ত্রো বা লুমুম্বাদের মতো নেতাদের হত্যার অপচেষ্টা ফাঁস হওয়ার পর এই নৈতিক অবস্থান নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ওয়াশিংটন ধাপে ধাপে সেই আইনি দেয়াল ভেঙে ফেলেছে। ওবামা আমল থেকে শুরু হওয়া ড্রোন হামলার সংস্কৃতি ট্রাম্প প্রশাসনের সময় এসে এক নগ্ন ও প্রকাশ্য রূপ নিয়েছে।মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং জাতিসংঘ সনদের ৫১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অন্য একটি সার্বভৌম রাষ্ট্রের কর্মকর্তাদের হত্যা করা আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন। টার্গেটেড কিলিং-এর নামে সাধারণ মানুষের বসতিতে বোমা ফেলা সরাসরি ‘যুদ্ধাপরাধ’-এর শামিল। বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থা আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—হয় একে আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতির পথে ফিরতে হবে, নয়তো ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিতে ধ্বংসের অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে হবে। এই অবিচারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মঞ্চে শক্তিশালী কণ্ঠস্বর তোলা এবং অপরাধীদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা।বিশ্ব যখন বহুমুখী মেরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে, তখন সামরিক শক্তি আর গুপ্তহত্যার মাধ্যমে আধিপত্য বজায় রাখার চেষ্টা কেবল বিশৃঙ্খলা আর ঘৃণা তৈরি করবে।

টার্গেটেড কিলিং: ওয়াশিংটন-তেল আবিবের নতুন আগ্রাসী নীতি ও বিশ্বশান্তি ঝুঁকি