যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের পাল্টাপাল্টি হামলায় ফের উত্তপ্ত মধ্যপ্রাচ্য
ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) চালানো এই হামলাকে যুক্তরাষ্ট্র জুলাইয়ের পর ইরানের ভূখণ্ডে প্রথম উল্লেখযোগ্য অভিযান হিসেবে বর্ণনা করেছে। হামলার পর জর্ডানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে পাল্টা হামলার দাবি করেছে ইরান। হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এই সংঘাত বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। রোববার (৩০ আগস্ট) চালানো এ হামলার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিনের সামরিক উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে।ইরান জানিয়েছে, মার্কিন হামলায় দেশটির কয়েকজন সেনা ও বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন। এর পরপরই পাল্টা জবাব দেওয়ার ঘোষণা দেয় ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)। পরে জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালানোর দাবি করে ইরান।এক মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, লারাক দ্বীপে ইরানের দুটি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণকারী স্থাপনাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্র মাইন বহনকারী রকেট উৎক্ষেপণের প্রস্তুতি নিতে আইআরজিসির সদস্যদের দেখা যাওয়ার পর ওই অভিযান চালানো হয়েছে বলে জানান তিনি।মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডের মুখপাত্র কমান্ডার টিম হকিন্স এই অভিযানকে ‘সীমিত ও নির্ভুল’ বলে বর্ণনা করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালির জন্য তাৎক্ষণিক হুমকি তৈরি করা মাইন স্থাপনকারী বাহিনীকে লক্ষ্য করেই হামলা চালানো হয়েছে।তবে মার্কিন সামরিক বাহিনীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে হামলার নির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ করা হয়নি। পরে এক মার্কিন কর্মকর্তা লারাক দ্বীপে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, মার্কিন বাহিনী ড্রোন ব্যবহার করে হামলাটি চালিয়েছে।হামলায় নিহত-আহতের দাবি ইরানেরলারাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় কয়েকজন সেনা ও বেসামরিক নাগরিক হতাহত হয়েছেন বলে প্রথমে জানায় আইআরজিসি। পরে বাহিনীটি জানায়, হামলায় দুজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন।আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি হামলাটিকে ‘ট্রাম্প প্রশাসনের কৌশলগত ও প্রাণঘাতী ভুল’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এ হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক ও সামরিক—দুই ক্ষেত্রেই পরিণতি ভোগ করতে হবে।ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমও জানিয়েছে, মার্কিন হামলার ‘জবাব ও শাস্তি’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে আইআরজিসি।জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দাবিলারাক দ্বীপে মার্কিন হামলার কয়েক ঘণ্টা পর জর্ডানে থাকা দুটি মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানোর দাবি করে ইরান।ইরানি গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, কিং হুসেইন ও আল-আজরাক ঘাঁটি হামলার লক্ষ্য ছিল। আইআরজিসির দাবি, হামলায় কারিগরি অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণ স্থাপনা এবং মার্কিন যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত বিভিন্ন অবস্থানে ‘ভারী ক্ষয়ক্ষতি’ হয়েছে।তবে জর্ডানের সশস্ত্র বাহিনী জানিয়েছে, দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জর্ডানের আকাশসীমায় প্রবেশ করা আটটি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করেছে। জর্ডানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা পেত্রা নিউজ এজেন্সির বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।আমিরাতের বিমানঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবিসংযুক্ত আরব আমিরাতের আল মিনহাদ বিমানঘাঁটিতেও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘাঁটির যেসব এলাকায় মার্কিন সেনা ও হেলিকপ্টার অবস্থান করছিল, সেসব স্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।ইরানি সেনাবাহিনী দাবি করেছে, লারাক দ্বীপে আইআরজিসির সদস্য ও ইরানি বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় এ হামলা চালানো হয়েছে।তবে ইরানের এই দাবির বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি সংযুক্ত আরব আমিরাত। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ও কোনো বিবৃতি দেয়নি। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ডও তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানায়নি।মার্কিন ড্রোন ভূপাতিতের দাবিএর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর একটি মার্কিন এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন ভূপাতিত করার দাবিও করেছে আইআরজিসি।রেভল্যুশনারি গার্ডসের দাবি, আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ড্রোনটি উপসাগরের পানিতে বিধ্বস্ত হয়েছে। ইরানের মেহর নিউজ এজেন্সি আইআরজিসির একটি বিবৃতির বরাত দিয়ে এ তথ্য প্রকাশ করেছে।লারাক দ্বীপ ও হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বলারাক দ্বীপটি বান্দার আব্বাসের কাছাকাছি এবং হরমুজ প্রণালির পাশে অবস্থিত। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হিসেবে পরিচিত এই প্রণালি দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, ইরান বর্তমানে লারাক দ্বীপের কাছ দিয়ে চলাচলকারী ট্যাংকারগুলোকে পরিদর্শনের জন্য থামতে বাধ্য করছে। পারাপারের জন্য জাহাজগুলোকে প্রায় ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে।হরমুজ প্রণালির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে এখানে সামরিক উত্তেজনা বাড়লে শুধু ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র নয়, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারও এর প্রভাবের মুখে পড়তে পারে।ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রসামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি ইরানের ওপর অর্থনৈতিক চাপও বাড়িয়ে চলেছে ওয়াশিংটন।গত ২৪ আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আরও বিচ্ছিন্ন করার লক্ষ্যে নতুন নিষেধাজ্ঞা কর্মসূচি ঘোষণা করে। ওই কর্মসূচিতে ইরানের সঙ্গে ব্যবসা করা দেশ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধেও সেকেন্ডারি নিষেধাজ্ঞা আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।ইরানের কর্মকর্তারা এসব নিষেধাজ্ঞাকে আগের মার্কিন অর্থনৈতিক পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা হিসেবে দেখছেন। তেহরানের দাবি, সাম্প্রতিক সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যর্থতার পরই নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানো হয়েছে।ইরানের তেল স্থাপনা নিয়ে ট্রাম্পের ভিডিওলারাক দ্বীপে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে ইরানের তেল অবকাঠামোতে বিস্ফোরণের কিছু ভিডিও প্রকাশ করেন।এর মধ্যে একটি ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই দিয়ে তৈরি বলে মনে হয়েছে। ভিডিওটির সঙ্গে ‘খার্গ দ্বীপকে ধ্বংস করে দেওয়া হচ্ছে!!!’-এমন একটি ক্যাপশন দেওয়া হয়।ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল টার্মিনাল খার্গ দ্বীপ নিয়ে এর আগেও হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। তবে সর্বশেষ পোস্টে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানাননি।ছয় মাসের বেশি সময় ধরে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান সংঘাত ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে চলছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে ব্যাপক হামলা শুরু করার পর পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।এর জবাবে ইরান ইসরায়েল, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন অবস্থানে হামলা চালায়। সংঘাতের প্রভাবে হরমুজ প্রণালিতে নৌ চলাচলও কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।এখন লারাক দ্বীপকে ঘিরে নতুন করে সামরিক সংঘাত শুরু হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে।সংঘাত শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো।ফলে লারাক দ্বীপকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের নতুন সামরিক উত্তেজনা শুধু মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার জন্যই নয়, বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ, আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।