ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শাসক দল বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রম ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী (SIR) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংগঠিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা। নির্বাচন কমিশনের তথ্যের অভাবে এই প্রচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
দিল্লি রাজ্য বিজেপির সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসলামবিদ্বেষী মিম, ভিডিও ও গ্রাফিক্সের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এসব কনটেন্টে চলমান Special Intensive Revision (SIR) অভিযানের অজুহাতে মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ এবং ‘পোকামাকড়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই প্রচারে মুসলমানদের দাড়ি, টুপি ও বোরখা পরা চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাদের তুলনা করা হয়েছে ইঁদুর, শূকর ও মশার সঙ্গে। এমনকি একটি অ্যানিমেটেড ভিডিওতে দেখা যায়—একটি মশার কয়েলের ধোঁয়ার প্রতীকে SIR দেখিয়ে মুসলিম পরিবারকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ‘পেস্ট’ বা ক্ষতিকর জীব হিসেবে চিত্রিত করে।
SIR হলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। বিজেপি নেতারা এটিকে ‘অবৈধ বিদেশি নির্মূল অভিযান’ হিসেবে প্রচার করছেন। তবে নির্বাচন কমিশন এখনো পর্যন্ত বিহারে এই অভিযানে কতজন বিদেশিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ করেনি।
The Wire-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি নথি অনুযায়ী বিহারের মোট ভোটারের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যা মাত্র ০.০১২ শতাংশ—যা বিজেপির প্রচারিত ‘বড় অনুপ্রবেশ সংকট’-এর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবু দিল্লি বিজেপি এই অভিযানকে ‘সারাদেশব্যাপী অনুপ্রবেশকারীদের নির্মূল’ হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মুসলমানদের দেখানো হচ্ছে। একটি পোস্টে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি চরিত্র ব্যবহার করে গোটা মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই বিদেশি হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়—যার মাধ্যমে নাগরিক মুসলমান ও অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।
১ ডিসেম্বর, বিজেপির দিল্লি শাখার অফিসিয়াল X (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে একটি সিনেমা পোস্টার-ধাঁচের গ্রাফিক প্রকাশ করা হয়, যেখানে রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অখিলেশ যাদব ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুসলিম পোশাকে দেখানো হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়—SIR-এর সমালোচনা মানেই ‘অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষ নেওয়া’।
আরেকটি গ্রাফিকে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেয়ালের ফাঁক বন্ধ করছেন, আর ভেতর থেকে ইঁদুর উঁকি দিচ্ছে—যা মুসলমানদের ইঁদুরের সঙ্গে তুলনা করে। অন্য একটি রিলে ‘SIR’ লেখা যন্ত্রের সামনে শূকর সদৃশ প্রাণীদের দৌড়ে পালাতে দেখা যায়।
কিছু ভিডিওতে মুসলিম শ্রমিকদের উদ্দেশে মালিকদের বলতে শোনা যায়—‘শ্রমিক সেজে অনুপ্রবেশকারীরা চাকরি কাড়ছে’, যা সরাসরি মুসলিমদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে অপরাধমূলক অনুপ্রবেশের অভিযোগে জড়াচ্ছে।
এই ধারা শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আসামে মন্ত্রী অশোক সিংহাল ফুলকপি ক্ষেতের ছবি ব্যবহার করে পোস্ট দেন, যা ১৯৮৯ সালের ভগলপুর মুসলিম গণহত্যার গণকবরের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আসাম বিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেও নিয়মিত ইসলামবিদ্বেষী কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে নির্বাচনের সময় এই বক্তব্য ক্রমেই ভারতের নাগরিক মুসলমানদের দিকেও প্রবাহিত হয়।
এই প্রচারণা এমন সময়ে জোরদার হয়েছে, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিহারের প্রসঙ্গ টেনে ‘বিদেশি ভোটার কারসাজি’ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, মুসলমানদের পোকামাকড় ও শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা একটি ভয়ংকর সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে, যা সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম।
নির্বাচন কমিশনের কোনো শক্ত তথ্য ছাড়াই বিজেপির এই প্রচারণাকে সমালোচকরা একটি পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন—যার উদ্দেশ্য সংখ্যালঘুদের বলির পাঁঠা বানানো, ভয় সৃষ্টি করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে অকার্যকর করা।
বিষয় : ভারত ইসলামফোবিয়া

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৫
ভারতের রাজধানী দিল্লিতে শাসক দল বিজেপির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কার্যক্রম ঘিরে নতুন করে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক। ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধনী (SIR) কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ ও ‘রাষ্ট্রের শত্রু’ হিসেবে চিত্রিত করা হচ্ছে। বিরোধী দল, মানবাধিকার সংগঠন ও গণমাধ্যম বিশ্লেষকদের মতে, এটি সংগঠিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা। নির্বাচন কমিশনের তথ্যের অভাবে এই প্রচারের গ্রহণযোগ্যতা নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।
দিল্লি রাজ্য বিজেপির সামাজিক মাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইসলামবিদ্বেষী মিম, ভিডিও ও গ্রাফিক্সের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। এসব কনটেন্টে চলমান Special Intensive Revision (SIR) অভিযানের অজুহাতে মুসলমানদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘দেশদ্রোহী’ এবং ‘পোকামাকড়ের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত উপাদান’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
এই প্রচারে মুসলমানদের দাড়ি, টুপি ও বোরখা পরা চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে, যাদের তুলনা করা হয়েছে ইঁদুর, শূকর ও মশার সঙ্গে। এমনকি একটি অ্যানিমেটেড ভিডিওতে দেখা যায়—একটি মশার কয়েলের ধোঁয়ার প্রতীকে SIR দেখিয়ে মুসলিম পরিবারকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হচ্ছে, যা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সরাসরি ‘পেস্ট’ বা ক্ষতিকর জীব হিসেবে চিত্রিত করে।
SIR হলো ভারতের নির্বাচন কমিশনের একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যার লক্ষ্য ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা। বিজেপি নেতারা এটিকে ‘অবৈধ বিদেশি নির্মূল অভিযান’ হিসেবে প্রচার করছেন। তবে নির্বাচন কমিশন এখনো পর্যন্ত বিহারে এই অভিযানে কতজন বিদেশিকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত তথ্য প্রকাশ করেনি।
The Wire-এর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, সরকারি নথি অনুযায়ী বিহারের মোট ভোটারের মধ্যে বিদেশিদের সংখ্যা মাত্র ০.০১২ শতাংশ—যা বিজেপির প্রচারিত ‘বড় অনুপ্রবেশ সংকট’-এর দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
তবু দিল্লি বিজেপি এই অভিযানকে ‘সারাদেশব্যাপী অনুপ্রবেশকারীদের নির্মূল’ হিসেবে উপস্থাপন করছে এবং এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হিসেবে মুসলমানদের দেখানো হচ্ছে। একটি পোস্টে রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশি চরিত্র ব্যবহার করে গোটা মুসলিম জনগোষ্ঠীকেই বিদেশি হিসেবে ইঙ্গিত করা হয়—যার মাধ্যমে নাগরিক মুসলমান ও অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলা হয়েছে।
১ ডিসেম্বর, বিজেপির দিল্লি শাখার অফিসিয়াল X (সাবেক টুইটার) হ্যান্ডেল থেকে একটি সিনেমা পোস্টার-ধাঁচের গ্রাফিক প্রকাশ করা হয়, যেখানে রাহুল গান্ধী, অরবিন্দ কেজরিওয়াল, অখিলেশ যাদব ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মুসলিম পোশাকে দেখানো হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়—SIR-এর সমালোচনা মানেই ‘অনুপ্রবেশকারীদের পক্ষ নেওয়া’।
আরেকটি গ্রাফিকে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দেয়ালের ফাঁক বন্ধ করছেন, আর ভেতর থেকে ইঁদুর উঁকি দিচ্ছে—যা মুসলমানদের ইঁদুরের সঙ্গে তুলনা করে। অন্য একটি রিলে ‘SIR’ লেখা যন্ত্রের সামনে শূকর সদৃশ প্রাণীদের দৌড়ে পালাতে দেখা যায়।
কিছু ভিডিওতে মুসলিম শ্রমিকদের উদ্দেশে মালিকদের বলতে শোনা যায়—‘শ্রমিক সেজে অনুপ্রবেশকারীরা চাকরি কাড়ছে’, যা সরাসরি মুসলিমদের কর্মসংস্থানের সঙ্গে অপরাধমূলক অনুপ্রবেশের অভিযোগে জড়াচ্ছে।
এই ধারা শুধু দিল্লিতেই সীমাবদ্ধ নয়। আসামে মন্ত্রী অশোক সিংহাল ফুলকপি ক্ষেতের ছবি ব্যবহার করে পোস্ট দেন, যা ১৯৮৯ সালের ভগলপুর মুসলিম গণহত্যার গণকবরের ইঙ্গিত হিসেবে ব্যাপকভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। আসাম বিজেপির অফিসিয়াল অ্যাকাউন্ট থেকেও নিয়মিত ইসলামবিদ্বেষী কনটেন্ট ছড়ানো হচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিজেপি দীর্ঘদিন ধরেই ‘অনুপ্রবেশকারী’ শব্দটিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে আসা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। তবে নির্বাচনের সময় এই বক্তব্য ক্রমেই ভারতের নাগরিক মুসলমানদের দিকেও প্রবাহিত হয়।
এই প্রচারণা এমন সময়ে জোরদার হয়েছে, যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বিহারের প্রসঙ্গ টেনে ‘বিদেশি ভোটার কারসাজি’ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য রাখছেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করে বলেছে, মুসলমানদের পোকামাকড় ও শত্রু হিসেবে চিত্রিত করা একটি ভয়ংকর সামাজিক বিভাজন তৈরি করতে পারে, যা সহিংসতার দিকে ঠেলে দিতে সক্ষম।
নির্বাচন কমিশনের কোনো শক্ত তথ্য ছাড়াই বিজেপির এই প্রচারণাকে সমালোচকরা একটি পরিকল্পিত সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে দেখছেন—যার উদ্দেশ্য সংখ্যালঘুদের বলির পাঁঠা বানানো, ভয় সৃষ্টি করা এবং বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে অকার্যকর করা।

আপনার মতামত লিখুন