উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলায় একটি বেসরকারি স্কুলে শিশুদের উর্দু ভাষায় ইসলামি পাঠ শেখানোর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ, স্কুল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং জেলা প্রশাসনের তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি সাংবিধানিক অধিকার ও সংখ্যালঘু শিক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার রানি কি সারাই এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি স্কুল ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভিডিওটি ২৩ ডিসেম্বর ধারণ করা বলে দাবি করা হচ্ছে, যেখানে দেখা যায়—পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী কয়েকজন শিশু স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে একযোগে উত্তর দিচ্ছে।
ভিডিওতে শিক্ষকের মুখ দেখা না গেলেও তাঁর কণ্ঠ স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তিনি শিশুদের জিজ্ঞাসা করছেন—তারা কারা, পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন, ইসলাম ও নবী সম্পর্কে মৌলিক কিছু প্রশ্ন। শিশুরা উত্তরে বলে, “আমরা মুসলিম” এবং “আল্লাহ তাআলা”। এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা স্কুলটির নাম আজমগড় পাবলিক স্কুল। এটি একটি সিবিএসই অনুমোদিত ইংরেজি মাধ্যম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্কুলটি সমাজবাদী পার্টির বিধান পরিষদ সদস্য শাহ আলম ওরফে গুড্ডু জামালির প্রতিষ্ঠিত এবং এর ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নোমান। স্কুলটি এমন একটি এলাকায় অবস্থিত যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও বসবাসকারী জনগণ ধর্মীয়ভাবে মিশ্র।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে। স্কুলের অধ্যক্ষ রুপাল পান্ডে বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “শিক্ষকের লিখিত জবাব পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে ভিডিওটি আমাদের স্কুলের কি না এবং কখন ধারণ করা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্কুল ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নোমান বলেন, স্কুলে উর্দু একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো হয় এবং ভিডিওতে দেখা পাঠটি উর্দু বিষয়ের অংশ হতে পারে। তিনি জানান, শিক্ষকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, ডানপন্থী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ‘ধর্মীয় উগ্রতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিশ্ব হিন্দু মহাসঙ্ঘের জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি অরুণ কুমার সিং সাধু বলেন, “এটি কোনো মাদ্রাসা নয়। এখানে সব ধর্মের শিশুরা পড়ে। কেবল ইসলামি ধর্মশিক্ষা দেওয়া নিন্দনীয়।” তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কাছে স্কুলটির স্বীকৃতি বাতিলের দাবিতে চিঠি দেওয়ার কথাও জানান।
বিতর্কের জেরে জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করেছে। আজমগড়ের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবীন্দ্র কুমার নিশ্চিত করেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ড. মীনা শর্মা বলেন, “সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল সরকারি অর্থে পরিচালিত স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। বেসরকারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া আইনত বৈধ। একই সঙ্গে ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অধিকার সুরক্ষা দেয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মীরাও এই বিতর্ককে ‘নির্বাচিত ক্ষোভ’ বলে অভিহিত করেছেন। রানি কি সারাই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “মিশনারি স্কুলে যিশুর কথা শেখানো হয়, হিন্দু পরিচালিত স্কুলে সংস্কৃত ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখানো হয়। মুসলিম শিশুদের ধর্ম শেখানো হলেই তা বিতর্ক হয়ে যায়।”
সমাজকর্মী সাকিব আহমেদ বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এটি ভয় ছড়ানোর চেষ্টা। বেসরকারি স্কুলের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তু বানানো নয়।”
স্কুলের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মুসলিম অভিভাবকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা নিরাপদ পরিবেশে তাদের ধর্ম সম্পর্কে জানছে। এখানে কোনো জোর বা ধর্মান্তরের বিষয় নেই। তবুও আমাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।”
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের বিতর্ক সংখ্যালঘু শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা নীতি গবেষক ড. অনিল কুমার বলেন, “সংখ্যালঘু পরিচালিত স্কুলগুলোকে ভয় দেখানো হলে অভিভাবকরা নিরুৎসাহিত হন এবং শিশুদের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পরিপন্থী।”
বিষয় : ভারত

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জানুয়ারি ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলায় একটি বেসরকারি স্কুলে শিশুদের উর্দু ভাষায় ইসলামি পাঠ শেখানোর একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়ার পর তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। ভিডিওটি ঘিরে হিন্দু ডানপন্থী সংগঠনগুলোর প্রতিবাদ, স্কুল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা এবং জেলা প্রশাসনের তদন্ত শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বিষয়টি সাংবিধানিক অধিকার ও সংখ্যালঘু শিক্ষার প্রশ্নও সামনে এনেছে।
সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওকে কেন্দ্র করে উত্তরপ্রদেশের আজমগড় জেলার রানি কি সারাই এলাকায় অবস্থিত একটি বেসরকারি স্কুল ঘিরে ব্যাপক বিতর্ক শুরু হয়েছে। ভিডিওটি ২৩ ডিসেম্বর ধারণ করা বলে দাবি করা হচ্ছে, যেখানে দেখা যায়—পাঁচ থেকে ছয় বছর বয়সী কয়েকজন শিশু স্কুল ইউনিফর্ম পরিহিত অবস্থায় শ্রেণিকক্ষে দাঁড়িয়ে শিক্ষকের প্রশ্নের উত্তরে একযোগে উত্তর দিচ্ছে।
ভিডিওতে শিক্ষকের মুখ দেখা না গেলেও তাঁর কণ্ঠ স্পষ্টভাবে শোনা যায়। তিনি শিশুদের জিজ্ঞাসা করছেন—তারা কারা, পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন, ইসলাম ও নবী সম্পর্কে মৌলিক কিছু প্রশ্ন। শিশুরা উত্তরে বলে, “আমরা মুসলিম” এবং “আল্লাহ তাআলা”। এই দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়।
বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা স্কুলটির নাম আজমগড় পাবলিক স্কুল। এটি একটি সিবিএসই অনুমোদিত ইংরেজি মাধ্যম বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। স্কুলটি সমাজবাদী পার্টির বিধান পরিষদ সদস্য শাহ আলম ওরফে গুড্ডু জামালির প্রতিষ্ঠিত এবং এর ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নোমান। স্কুলটি এমন একটি এলাকায় অবস্থিত যেখানে মুসলিম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও বসবাসকারী জনগণ ধর্মীয়ভাবে মিশ্র।
ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর স্কুল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি খতিয়ে দেখার কথা জানিয়েছে। স্কুলের অধ্যক্ষ রুপাল পান্ডে বলেন, সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের কাছে ব্যাখ্যা তলব করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, “শিক্ষকের লিখিত জবাব পাওয়ার পর নিশ্চিত হওয়া যাবে ভিডিওটি আমাদের স্কুলের কি না এবং কখন ধারণ করা হয়েছে। এরপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্কুল ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ নোমান বলেন, স্কুলে উর্দু একটি বিষয় হিসেবে পড়ানো হয় এবং ভিডিওতে দেখা পাঠটি উর্দু বিষয়ের অংশ হতে পারে। তিনি জানান, শিক্ষকের বিরুদ্ধে নোটিশ জারি করা হয়েছে এবং তদন্তের ফলাফলের ওপর পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ভর করবে।
অন্যদিকে, ডানপন্থী সংগঠনগুলো বিষয়টিকে ‘ধর্মীয় উগ্রতা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। বিশ্ব হিন্দু মহাসঙ্ঘের জাতীয় কার্যনির্বাহী সভাপতি অরুণ কুমার সিং সাধু বলেন, “এটি কোনো মাদ্রাসা নয়। এখানে সব ধর্মের শিশুরা পড়ে। কেবল ইসলামি ধর্মশিক্ষা দেওয়া নিন্দনীয়।” তিনি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের কাছে স্কুলটির স্বীকৃতি বাতিলের দাবিতে চিঠি দেওয়ার কথাও জানান।
বিতর্কের জেরে জেলা প্রশাসন হস্তক্ষেপ করেছে। আজমগড়ের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট রবীন্দ্র কুমার নিশ্চিত করেন, অভিযোগ পাওয়ার পর তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাঁর বক্তব্য, “কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে আইন ও সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন। সাংবিধানিক বিশেষজ্ঞ ড. মীনা শর্মা বলেন, “সংবিধানের ২৮ নম্বর অনুচ্ছেদ কেবল সরকারি অর্থে পরিচালিত স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করে। বেসরকারি স্কুলে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়া আইনত বৈধ। একই সঙ্গে ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার অধিকার সুরক্ষা দেয়।”
স্থানীয় বাসিন্দা ও সমাজকর্মীরাও এই বিতর্ককে ‘নির্বাচিত ক্ষোভ’ বলে অভিহিত করেছেন। রানি কি সারাই এলাকার এক বাসিন্দা বলেন, “মিশনারি স্কুলে যিশুর কথা শেখানো হয়, হিন্দু পরিচালিত স্কুলে সংস্কৃত ও ধর্মীয় মূল্যবোধ শেখানো হয়। মুসলিম শিশুদের ধর্ম শেখানো হলেই তা বিতর্ক হয়ে যায়।”
সমাজকর্মী সাকিব আহমেদ বলেন, বিষয়টিকে রাজনৈতিক রঙ দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “এটি ভয় ছড়ানোর চেষ্টা। বেসরকারি স্কুলের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে। শিক্ষার দিকে মনোযোগ দেওয়া উচিত, সাম্প্রদায়িক লক্ষ্যবস্তু বানানো নয়।”
স্কুলের সঙ্গে যুক্ত কয়েকজন মুসলিম অভিভাবকও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানরা নিরাপদ পরিবেশে তাদের ধর্ম সম্পর্কে জানছে। এখানে কোনো জোর বা ধর্মান্তরের বিষয় নেই। তবুও আমাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।”
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরাও সতর্ক করেছেন যে, এ ধরনের বিতর্ক সংখ্যালঘু শিক্ষার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা নীতি গবেষক ড. অনিল কুমার বলেন, “সংখ্যালঘু পরিচালিত স্কুলগুলোকে ভয় দেখানো হলে অভিভাবকরা নিরুৎসাহিত হন এবং শিশুদের শিক্ষা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এটি অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পরিপন্থী।”

আপনার মতামত লিখুন