বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের বার্ষিক ২.২ বিলিয়ন পাউন্ড দান রাষ্ট্রীয় কল্যাণ ব্যবস্থায় বড় অবদান রাখলেও ব্যাংকিং, তহবিল ও নীতিনির্ধারণে কাঠামোগত বাধার অভিযোগ উঠেছে

ব্রিটেনে মুসলিমদের সর্বোচ্চ দান, তবু ইসলামোফোবিয়া ও বৈষম্যের মুখে: গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

ব্রিটেনে মুসলিমদের সর্বোচ্চ দান, তবু ইসলামোফোবিয়া ও বৈষম্যের মুখে: গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

যুক্তরাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়কে দেশের সবচেয়ে উদার দাতা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তারা এখনও ইসলামোফোবিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি নতুন গবেষণায়। মুসলিমদের দান ও দাতব্য কার্যক্রম সামাজিক কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখলেও তাদের পরিচালিত সংস্থাগুলো নানামুখী কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এটি ব্রিটিশ সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই।

যুক্তরাজ্যের চিন্তাধারা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Equi প্রকাশিত “Building Britain: The Contribution of British Muslims to Society” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় সবচেয়ে উদার দাতা গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও এখনও ব্যাপক ইসলামোফোবিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

প্রতিবেদনটির লেখক তাইবা আল-ফাগিহ ব্রিটিশ মুসলিমদের সমাজে অবদান ও তাদের সম্মুখীন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, মুসলিমদের দানকৃত অর্থ শিক্ষা, আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পুনর্বাসন ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ নানা সামাজিক খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২.২ বিলিয়ন পাউন্ড দান: জাতীয় গড়ের চার গুণ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩–২০২৪ সময়ে যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা প্রায় ২.২ বিলিয়ন পাউন্ড দান করেছেন, যা জাতীয় গড়ের প্রায় চার গুণ এবং উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর গড় দানের তুলনায় দশ গুণেরও বেশি।

২০২4 সালে মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলো ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে সহায়তা দিয়েছে। আল-ফাগিহ বলেন,

“ইংল্যান্ডের মুসলিমরা দেশের সবচেয়ে উদার দাতা। এটি শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ।”

নীতিনির্ধারণে উপেক্ষা ও কাঠামোগত বাধা

প্রতিবেদনটি মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্যমান চারটি প্রধান কাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে:

  • ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার
  • অস্বাভাবিক মাত্রার নিয়ন্ত্রক নজরদারি
  • তহবিল ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা
  • জনসেবা শক্তিশালীকরণে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতির অভাব

এই সমস্যাগুলো মুসলিম সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করছে এবং সমাজে তাদের ইতিবাচক অবদান সত্ত্বেও কার্যকর সমাধান অনুপস্থিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাকাত: রাষ্ট্রের জন্য ব্যয়-সাশ্রয়ী সামাজিক মডেল

আল-ফাগিহ বলেন, মুসলিমদের দান অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের জাকাত ব্যবস্থার আধুনিক প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন,

“জাকাত ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। জাতীয় জাকাত ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, জাকাতে দান করা প্রতি এক পাউন্ড স্থানীয় সরকারকে ৭৩ পাউন্ড সাশ্রয় করে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাতীয় জাকাত ফাউন্ডেশন এমন উচ্ছেদ (eviction) প্রতিরোধ করেছে, যা সরকারকে ২৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হতো।

গবেষকরা সরকার ও মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক কাঠামোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • স্থানীয় সামাজিক সেবা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচি
  • ধর্ম-সচেতন নীতিনির্ধারণ
  • পৌরসভা ও মুসলিম সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ
  • মুসলিম সংস্থার ব্যাংক হিসাব বন্ধের বৈষম্যমূলক চর্চা বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা

আল-ফাগিহ বলেন, মুসলিমদের দাতব্য কার্যক্রম জনসেবার ওপর চাপ কমিয়ে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর বোঝা হ্রাস করতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য সমস্যায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চাপ ও ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে আরও ন্যায্য ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়া সম্ভব।

প্রতিবেদনটি উপসংহারে উল্লেখ করেছে, যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের দান গৃহহীনতা, দারিদ্র্য ও শিশু কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নাগালের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।

বিষয় : যুক্তরাজ্য

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


ব্রিটেনে মুসলিমদের সর্বোচ্চ দান, তবু ইসলামোফোবিয়া ও বৈষম্যের মুখে: গবেষণায় চাঞ্চল্যকর তথ্য

প্রকাশের তারিখ : ২৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

যুক্তরাজ্যে মুসলিম সম্প্রদায়কে দেশের সবচেয়ে উদার দাতা গোষ্ঠী হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও তারা এখনও ইসলামোফোবিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের মুখোমুখি হচ্ছে—এমন তথ্য উঠে এসেছে একটি নতুন গবেষণায়। মুসলিমদের দান ও দাতব্য কার্যক্রম সামাজিক কল্যাণে বড় ভূমিকা রাখলেও তাদের পরিচালিত সংস্থাগুলো নানামুখী কাঠামোগত বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। গবেষকরা বলছেন, এটি ব্রিটিশ সমাজ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই।

যুক্তরাজ্যের চিন্তাধারা বিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Equi প্রকাশিত “Building Britain: The Contribution of British Muslims to Society” শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশটির মুসলিম সম্প্রদায় সবচেয়ে উদার দাতা গোষ্ঠী হওয়া সত্ত্বেও এখনও ব্যাপক ইসলামোফোবিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছে।

প্রতিবেদনটির লেখক তাইবা আল-ফাগিহ ব্রিটিশ মুসলিমদের সমাজে অবদান ও তাদের সম্মুখীন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি জানান, মুসলিমদের দানকৃত অর্থ শিক্ষা, আবাসন, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, পুনর্বাসন ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ নানা সামাজিক খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২.২ বিলিয়ন পাউন্ড দান: জাতীয় গড়ের চার গুণ

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩–২০২৪ সময়ে যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা প্রায় ২.২ বিলিয়ন পাউন্ড দান করেছেন, যা জাতীয় গড়ের প্রায় চার গুণ এবং উচ্চ আয়ের গোষ্ঠীর গড় দানের তুলনায় দশ গুণেরও বেশি।

২০২4 সালে মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলো ৩ লাখ ৩০ হাজারের বেশি মানুষকে সহায়তা দিয়েছে। আল-ফাগিহ বলেন,

“ইংল্যান্ডের মুসলিমরা দেশের সবচেয়ে উদার দাতা। এটি শুধু নৈতিক দায়িত্ব নয়, বরং একটি কৌশলগত জাতীয় সম্পদ।”

নীতিনির্ধারণে উপেক্ষা ও কাঠামোগত বাধা

প্রতিবেদনটি মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্যমান চারটি প্রধান কাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করেছে:

  • ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবায় সীমিত প্রবেশাধিকার
  • অস্বাভাবিক মাত্রার নিয়ন্ত্রক নজরদারি
  • তহবিল ও অনুদান পাওয়ার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা
  • জনসেবা শক্তিশালীকরণে তাদের ভূমিকার স্বীকৃতির অভাব

এই সমস্যাগুলো মুসলিম সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত করছে এবং সমাজে তাদের ইতিবাচক অবদান সত্ত্বেও কার্যকর সমাধান অনুপস্থিত বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

জাকাত: রাষ্ট্রের জন্য ব্যয়-সাশ্রয়ী সামাজিক মডেল

আল-ফাগিহ বলেন, মুসলিমদের দান অনেক ক্ষেত্রে ইসলামের জাকাত ব্যবস্থার আধুনিক প্রতিফলন। তিনি উল্লেখ করেন,

“জাকাত ইসলামের মৌলিক স্তম্ভগুলোর একটি। জাতীয় জাকাত ফাউন্ডেশনের গবেষণায় দেখা গেছে, জাকাতে দান করা প্রতি এক পাউন্ড স্থানীয় সরকারকে ৭৩ পাউন্ড সাশ্রয় করে।”

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জাতীয় জাকাত ফাউন্ডেশন এমন উচ্ছেদ (eviction) প্রতিরোধ করেছে, যা সরকারকে ২৮.৮ মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয় করতে হতো।

গবেষকরা সরকার ও মুসলিম দাতব্য সংস্থাগুলোর মধ্যে সহযোগিতামূলক কাঠামোর আহ্বান জানিয়েছেন। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • স্থানীয় সামাজিক সেবা উন্নয়নে যৌথ কর্মসূচি
  • ধর্ম-সচেতন নীতিনির্ধারণ
  • পৌরসভা ও মুসলিম সংস্থার মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ
  • মুসলিম সংস্থার ব্যাংক হিসাব বন্ধের বৈষম্যমূলক চর্চা বন্ধে সুস্পষ্ট নির্দেশনা

আল-ফাগিহ বলেন, মুসলিমদের দাতব্য কার্যক্রম জনসেবার ওপর চাপ কমিয়ে রাষ্ট্রীয় বাজেটের ওপর বোঝা হ্রাস করতে পারে এবং মানসিক স্বাস্থ্য, খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য সমস্যায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে।

বর্তমান বিশ্বে মুসলিমদের বিরুদ্ধে চাপ ও ইসলামোফোবিয়া বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের এই বাস্তবতা একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করা গেলে আরও ন্যায্য ও সমৃদ্ধ সমাজ গড়া সম্ভব।

প্রতিবেদনটি উপসংহারে উল্লেখ করেছে, যুক্তরাজ্যের মুসলিমরা শুধু দেশের ভেতরেই নয়, আন্তর্জাতিক মানবিক সহায়তা কার্যক্রমেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তাদের দান গৃহহীনতা, দারিদ্র্য ও শিশু কল্যাণসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের নাগালের বাইরে থাকা জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা পৌঁছে দিচ্ছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত