ইস্পাতকঠিন মনোবল আর স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকলে যে কোনো অসম্ভবকে জয় করা সম্ভব, তার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্প্যানিশ নাগরিক রাফায়েল হার্নান্দেজ মাঞ্চা। দীর্ঘ ৩৮ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করা এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ঘোড়ায় চড়ে স্পেনের আন্দালুসিয়া থেকে সৌদি আরবের মক্কা পর্যন্ত ৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে তার জীবনের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও অঙ্গীকার পূরণ করেছেন।
স্পেনের ইসলামি সম্প্রদায়ের ইউনিয়ন (UCIDE)-এর তথ্যমতে, গত কয়েক দশকে দেশটিতে ইসলাম গ্রহণ করা প্রায় ৪০ হাজার স্প্যানিশের মধ্যে রাফায়েল হার্নান্দেজ অন্যতম। ২৪ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন পাঠের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া রাফায়েল বর্তমানে ‘আবদুল্লাহ’ নামে পরিচিত। তার এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর, স্পেনের আলমোনাস্টার লা রিয়াল নামক একটি প্রাচীন মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে।
৫৩৩ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
রাফায়েল জানান, ১৪৯১ সালে মোহাম্মদ ডেল কোরাল এবং ওমর পাতন নামক দুই ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে স্পেন থেকে মক্কায় গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৫৩৩ বছর পর সেই একই পথ অনুসরণ করে তিনি এই দুঃসাহসিক অভিযানে নামেন। ১২টি দেশ অতিক্রম করে ৮ মাস দীর্ঘ এই যাত্রাকে তিনি ‘অলৌকিক ও আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
অর্থকষ্ট ও মানবিকতার জয়গান
যাত্রার শুরুতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়ে যায়। মাত্র ১৫০০ ইউরো নিয়ে তিন বন্ধু যাত্রা শুরু করলেও স্পেনের জারাগোজা পৌঁছাতেই তাদের অর্থ ফুরিয়ে যায়। রাফায়েল আবেগপ্লুত হয়ে স্মরণ করেন:
"মরক্কোর প্রবাসী শ্রমিক থেকে শুরু করে ফ্রান্স, ইতালি, বসনিয়া, সার্বিয়া, তুরস্ক এবং জর্ডানের সাধারণ মানুষ আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তুরস্কের আদানায় এক বৃদ্ধ কৃষক আমাদের দেখে গাড়ি থামিয়ে তার সবুজ গমের ক্ষেত উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন আমাদের ঘোড়াগুলোর খাবারের জন্য। এসবই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অলৌকিক সাহায্য।"
তুরস্ক ও বসনিয়ার আতিথেয়তা
রাফায়েল তার অভিজ্ঞতায় বসনিয়াকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দেশ এবং সেখানকার মানুষকে অসাধারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তুরস্কের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার মানুষের ভালোবাসা এবং আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করেছে। ৫ সপ্তাহ তুরস্ক ভ্রমনের পর সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে অবশেষে তিনি সৌদি আরবে পৌঁছান এবং পবিত্র কাবা স্পর্শ করেন।
শিকড়ের সন্ধানে আন্দালুসিয়া
স্পেনের মুসলিম ঐতিহ্য বা আন্দালুসীয় সভ্যতার প্রভাব রাফায়েলের জীবনে গভীর। তিনি বিশ্বাস করেন, অনেক স্প্যানিশের মূলে ইসলামি ঐতিহ্য মিশে আছে যা সময়ের বিবর্তনে আড়াল হয়ে গেছে। তার মতে, এই যাত্রা ছিল কেবল একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার এক সংগ্রাম।
বর্তমানে স্পেনে ফিরে আসা রাফায়েল বলেন, "আমি আল্লাহর কাছে দেওয়া আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। এখন আমি নিজের ভেতরে পূর্ণ প্রশান্তি অনুভব করছি। এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব।" আগামী ১০ মার্চ তিনি তার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প শোনাতে ইস্তাম্বুল সফরে যাবেন।
বিষয় : স্পেন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মার্চ ২০২৬
ইস্পাতকঠিন মনোবল আর স্রষ্টার প্রতি অগাধ বিশ্বাস থাকলে যে কোনো অসম্ভবকে জয় করা সম্ভব, তার এক জীবন্ত উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন স্প্যানিশ নাগরিক রাফায়েল হার্নান্দেজ মাঞ্চা। দীর্ঘ ৩৮ বছর আগে ইসলাম গ্রহণ করা এই অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ঘোড়ায় চড়ে স্পেনের আন্দালুসিয়া থেকে সৌদি আরবের মক্কা পর্যন্ত ৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে তার জীবনের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও অঙ্গীকার পূরণ করেছেন।
স্পেনের ইসলামি সম্প্রদায়ের ইউনিয়ন (UCIDE)-এর তথ্যমতে, গত কয়েক দশকে দেশটিতে ইসলাম গ্রহণ করা প্রায় ৪০ হাজার স্প্যানিশের মধ্যে রাফায়েল হার্নান্দেজ অন্যতম। ২৪ বছর বয়সে পবিত্র কুরআন পাঠের মাধ্যমে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হওয়া রাফায়েল বর্তমানে ‘আবদুল্লাহ’ নামে পরিচিত। তার এই ঐতিহাসিক যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০২৪ সালের ১৩ অক্টোবর, স্পেনের আলমোনাস্টার লা রিয়াল নামক একটি প্রাচীন মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে।
৫৩৩ বছর পর ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
রাফায়েল জানান, ১৪৯১ সালে মোহাম্মদ ডেল কোরাল এবং ওমর পাতন নামক দুই ব্যক্তি ঘোড়ায় চড়ে স্পেন থেকে মক্কায় গিয়েছিলেন। দীর্ঘ ৫৩৩ বছর পর সেই একই পথ অনুসরণ করে তিনি এই দুঃসাহসিক অভিযানে নামেন। ১২টি দেশ অতিক্রম করে ৮ মাস দীর্ঘ এই যাত্রাকে তিনি ‘অলৌকিক ও আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ’ বলে অভিহিত করেছেন।
অর্থকষ্ট ও মানবিকতার জয়গান
যাত্রার শুরুতে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি থাকলেও শেষ মুহূর্তে তা বাতিল হয়ে যায়। মাত্র ১৫০০ ইউরো নিয়ে তিন বন্ধু যাত্রা শুরু করলেও স্পেনের জারাগোজা পৌঁছাতেই তাদের অর্থ ফুরিয়ে যায়। রাফায়েল আবেগপ্লুত হয়ে স্মরণ করেন:
"মরক্কোর প্রবাসী শ্রমিক থেকে শুরু করে ফ্রান্স, ইতালি, বসনিয়া, সার্বিয়া, তুরস্ক এবং জর্ডানের সাধারণ মানুষ আমাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন। তুরস্কের আদানায় এক বৃদ্ধ কৃষক আমাদের দেখে গাড়ি থামিয়ে তার সবুজ গমের ক্ষেত উম্মুক্ত করে দিয়েছিলেন আমাদের ঘোড়াগুলোর খাবারের জন্য। এসবই ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা অলৌকিক সাহায্য।"
তুরস্ক ও বসনিয়ার আতিথেয়তা
রাফায়েল তার অভিজ্ঞতায় বসনিয়াকে বিশ্বের অন্যতম সুন্দর দেশ এবং সেখানকার মানুষকে অসাধারণ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তুরস্কের মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় সেখানকার মানুষের ভালোবাসা এবং আতিথেয়তা তাকে মুগ্ধ করেছে। ৫ সপ্তাহ তুরস্ক ভ্রমনের পর সিরিয়া ও জর্ডান হয়ে অবশেষে তিনি সৌদি আরবে পৌঁছান এবং পবিত্র কাবা স্পর্শ করেন।
শিকড়ের সন্ধানে আন্দালুসিয়া
স্পেনের মুসলিম ঐতিহ্য বা আন্দালুসীয় সভ্যতার প্রভাব রাফায়েলের জীবনে গভীর। তিনি বিশ্বাস করেন, অনেক স্প্যানিশের মূলে ইসলামি ঐতিহ্য মিশে আছে যা সময়ের বিবর্তনে আড়াল হয়ে গেছে। তার মতে, এই যাত্রা ছিল কেবল একটি ধর্মীয় সফর নয়, বরং নিজের শিকড়কে খুঁজে পাওয়ার এক সংগ্রাম।
বর্তমানে স্পেনে ফিরে আসা রাফায়েল বলেন, "আমি আল্লাহর কাছে দেওয়া আমার প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছি। এখন আমি নিজের ভেতরে পূর্ণ প্রশান্তি অনুভব করছি। এখন আমি শান্তিতে মরতে পারব।" আগামী ১০ মার্চ তিনি তার এই রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতার গল্প শোনাতে ইস্তাম্বুল সফরে যাবেন।

আপনার মতামত লিখুন