সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

অনলাইন প্রপাগান্ডা ও ইমারত বিধিমালার অজুহাতে মুসলিমদের লক্ষ্যবস্তু করছে উগ্রপন্থীরা; তিনটি পৃথক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা

জাপানে মুসলিমবিদ্বেষী অনলাইন প্রচারণার জেরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ



জাপানে মুসলিমবিদ্বেষী অনলাইন প্রচারণার জেরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ

জাপানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা শুরু হয়। সমালোচক ও কট্টরপন্থী পক্ষগুলোর দাবি, ইবেতসু শহরের তথাকথিত ‘পাকিস্তান পাড়া’ ইমারত বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ৭৬টি স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

অনলাইন ফোরামগুলোতে আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট এই অঞ্চলটি ‘সন্ত্রাসবাদের প্রজনন ক্ষেত্রে’ পরিণত হতে পারে। কিছু ব্যবহারকারী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে বলেন, "জাপানে একটি ইসলামি অঞ্চল গড়ে উঠতে দেওয়া ভুল ছিল, এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।" এমনকি উগ্রপন্থী কিছু গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে যে, জন সহানুভূতি পাওয়ার জন্য মুসলিমরাই নিজেদের স্থাপনায় আগুন দিচ্ছে। ইবেতসু পৌরসভায় এই সংক্রান্ত প্রায় ৫০০টি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে যেখানে মুসলিমদের দেশান্তরের দাবিও তোলা হয়েছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে ইবেতসু শহরে তিনটি রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে স্থানীয় ইবেতসু মসজিদ এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের মালিকানাধীন বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এই শহরে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭০০ মুসলিম বসবাস করছেন, যারা এখন চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন।

ইবেতসু মসজিদের সভাপতি মুহাম্মদ ইমরান, যিনি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন, গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "আমি দুই দশকের বেশি সময় ধরে এখানে আছি, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। আমরা সবসময় জাপানি প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছি। কেন আমাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।" তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো, ইবেতসু পৌর কর্তৃপক্ষ যখন অবৈধ স্থাপনার অভিযোগ তদন্ত করে, তখন দেখা যায় অভিযুক্ত স্থাপনাগুলোর অধিকাংশেরই মালিক মূলত জাপানি নাগরিক, মুসলিমরা নয়। তা সত্ত্বেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মুসলিমবিদ্বেষী উস্কানি থামেনি, যা শেষ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতায় রূপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও জাপানের সংবিধান অনুযায়ী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। ইবেতসুতে যা ঘটছে, তা কেবল অগ্নিকাণ্ড নয় বরং ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণা প্রসূত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রশাসনের তদন্তে এটি স্পষ্ট যে, ইমারত বিধিমালার অভিযোগটি ছিল একটি অজুহাত মাত্র, কারণ মূল লঙ্ঘনের সাথে স্থানীয় জাপানিরাই বেশি জড়িত ছিল। আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন লঙ্ঘন করলে তার বিচার প্রচলিত আইনে হবে, কিন্তু সেই অজুহাতে পুরো একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাদের উপাসনালয়ে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

জাপান সরকারের উচিত এই পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মূল হোতাদের চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা, যাতে উদীয়মান এই ইসলামভীতি (Islamophobia) জাপানের শান্তিপ্রিয় সমাজে স্থায়ী রূপ নিতে না পারে।

বিষয় : জাপান

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


জাপানে মুসলিমবিদ্বেষী অনলাইন প্রচারণার জেরে মসজিদে অগ্নিসংযোগ

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

জাপানের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন ফোরামে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত প্রচারণা শুরু হয়। সমালোচক ও কট্টরপন্থী পক্ষগুলোর দাবি, ইবেতসু শহরের তথাকথিত ‘পাকিস্তান পাড়া’ ইমারত বিধি লঙ্ঘন করে অবৈধভাবে ৭৬টি স্থাপনা নির্মাণ করেছে।

অনলাইন ফোরামগুলোতে আন্দোলনকারীদের দাবি, নির্দিষ্ট এই অঞ্চলটি ‘সন্ত্রাসবাদের প্রজনন ক্ষেত্রে’ পরিণত হতে পারে। কিছু ব্যবহারকারী অত্যন্ত কঠোর ভাষায় মন্তব্য করে বলেন, "জাপানে একটি ইসলামি অঞ্চল গড়ে উঠতে দেওয়া ভুল ছিল, এটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে।" এমনকি উগ্রপন্থী কিছু গোষ্ঠী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছে যে, জন সহানুভূতি পাওয়ার জন্য মুসলিমরাই নিজেদের স্থাপনায় আগুন দিচ্ছে। ইবেতসু পৌরসভায় এই সংক্রান্ত প্রায় ৫০০টি অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে যেখানে মুসলিমদের দেশান্তরের দাবিও তোলা হয়েছে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত তিন সপ্তাহে ইবেতসু শহরে তিনটি রহস্যজনক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে স্থানীয় ইবেতসু মসজিদ এবং পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত মুসলিমদের মালিকানাধীন বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বর্তমানে এই শহরে পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ৭০০ মুসলিম বসবাস করছেন, যারা এখন চরম নিরাপত্তা হীনতায় ভুগছেন।

ইবেতসু মসজিদের সভাপতি মুহাম্মদ ইমরান, যিনি দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে জাপানে বসবাস করছেন, গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "আমি দুই দশকের বেশি সময় ধরে এখানে আছি, এমন পরিস্থিতি আগে কখনো দেখিনি। আমরা সবসময় জাপানি প্রতিবেশীদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলার চেষ্টা করেছি। কেন আমাদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে, তা বোধগম্য নয়।" তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হলো, ইবেতসু পৌর কর্তৃপক্ষ যখন অবৈধ স্থাপনার অভিযোগ তদন্ত করে, তখন দেখা যায় অভিযুক্ত স্থাপনাগুলোর অধিকাংশেরই মালিক মূলত জাপানি নাগরিক, মুসলিমরা নয়। তা সত্ত্বেও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে মুসলিমবিদ্বেষী উস্কানি থামেনি, যা শেষ পর্যন্ত অগ্নিসংযোগের মতো নাশকতায় রূপ নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড ও জাপানের সংবিধান অনুযায়ী, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রত্যেক নাগরিকের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে। ইবেতসুতে যা ঘটছে, তা কেবল অগ্নিকাণ্ড নয় বরং ‘হেইট ক্রাইম’ বা ঘৃণা প্রসূত অপরাধের পর্যায়ে পড়ে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

প্রশাসনের তদন্তে এটি স্পষ্ট যে, ইমারত বিধিমালার অভিযোগটি ছিল একটি অজুহাত মাত্র, কারণ মূল লঙ্ঘনের সাথে স্থানীয় জাপানিরাই বেশি জড়িত ছিল। আইনগতভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আইন লঙ্ঘন করলে তার বিচার প্রচলিত আইনে হবে, কিন্তু সেই অজুহাতে পুরো একটি ধর্মীয় জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু করা এবং তাদের উপাসনালয়ে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের পরিপন্থী।

জাপান সরকারের উচিত এই পরিকল্পিত বিদ্বেষমূলক প্রচারণার মূল হোতাদের চিহ্নিত করা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মুসলিমদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাগুলোর একটি স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান করা, যাতে উদীয়মান এই ইসলামভীতি (Islamophobia) জাপানের শান্তিপ্রিয় সমাজে স্থায়ী রূপ নিতে না পারে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত