সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

আঞ্চলিক উত্তজনাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সামরিক উপস্থিতি ‘স্বাভাবিকীকরণ’ ও গণগ্রেপ্তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা চালাচ্ছে তেল আবিব

ইরান যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব সংহত করার নীলনকশা



ইরান যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব সংহত করার নীলনকশা

গাজা ও ইরান সংঘাতের বৈশ্বিক মনোযোগকে কাজে লাগিয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে আগ্রাসনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইসরায়েল। গত কয়েক দিনে ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে সাঁজোয়া যান ও ভারী সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কেবল নিরাপত্তা অভিযান নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ভূখণ্ড দখলের অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও সরকারি নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে পশ্চিম তীরের এই সাম্প্রতিক অভিযানগুলোকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আগাম পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। তেল আবিবের দাবি, ইরান ও তার মিত্রদের সাথে চলমান উত্তজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা সশস্ত্র প্রতিরোধ যাতে দানা বাঁধতে না পারে, সে জন্য এই কঠোর অবস্থান অনিবার্য।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, "নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য হামলা নস্যাৎ করতেই এই সুনির্দিষ্ট অভিযান ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।" তারা দাবি করে থাকে যে, বিশেষ করে জেনিন ও নাবলুসের মতো এলাকাগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে, যা নিরসন করা তাদের আইনি ও নিরাপত্তা অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই অভিযানে বেসামরিক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বা পদ্ধতিগত দখলের অভিযোগগুলোকে তারা বরাবরই ‘অতিরঞ্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সংঘাতের সুযোগে পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযানের তীব্রতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই ইসরায়েলি বাহিনী কমপক্ষে ২৩০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। পর্দার আড়ালের বাস্তবতা:

  • গণগ্রেপ্তার ও তল্লাশি: ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের মিডিয়া কর্মকর্তা আমানি সারাহনেহ জানান, ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ২৩০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং শত শত মানুষকে ‘মাঠ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হয়েছে।
  • বসতবাড়ি দখল: উত্তর পশ্চিম তীরের জেনিনসহ বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি দখল করে সেগুলোকে অস্থায়ী সামরিক ব্যারাকে পরিণত করছে ইসরায়েলি সেনারা।
  • সামরিকায়ন: রাস্তায় সাঁজোয়া যান ও ভারী গোলন্দাজ বাহিনীর নিয়মিত টহল এখন প্রাত্যহিক দৃশ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আহমেদ রফিক আওয়াদ একে ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ (Normalize) করার একটি কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ফাতাহ আন্দোলনের মুখপাত্র ইয়াদ আবু জেনিথ জানিয়েছেন, একদিকে সামরিক বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা ও সম্পদ ধ্বংসের মহোৎসব মেতেছে। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১১২৫ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৭০০ জন।

বিশেষ করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সি-জোনের জমিকে 'রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি' হিসেবে ঘোষণা করা—আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধের ডামাডোলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এই চেষ্টা স্পষ্টত আইনের পরিপন্থী। ফিলিস্তিনিদের নাগরিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার আজ চরম হুমকির মুখে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নীরবতা ইসরায়েলকে দায়মুক্তির  সুযোগ করে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভেতর বসতি স্থাপন অবৈধ। এমতাবস্থায়, একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের স্বীকৃতি ও দখলদারিত্বের অবসানই হচ্ছে একমাত্র টেকসই সমাধান।

বিষয় : ফিলিস্তিন পশ্চিম তীর

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


ইরান যুদ্ধের আড়ালে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি দখলদারিত্ব সংহত করার নীলনকশা

প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬

featured Image

গাজা ও ইরান সংঘাতের বৈশ্বিক মনোযোগকে কাজে লাগিয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে আগ্রাসনের নতুন মাত্রা যোগ করেছে ইসরায়েল। গত কয়েক দিনে ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে সাঁজোয়া যান ও ভারী সামরিক সরঞ্জামের উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কেবল নিরাপত্তা অভিযান নয় বরং দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক ভূখণ্ড দখলের অংশ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) ও সরকারি নীতি নির্ধারকদের পক্ষ থেকে পশ্চিম তীরের এই সাম্প্রতিক অভিযানগুলোকে ‘সন্ত্রাসবিরোধী আগাম পদক্ষেপ’ হিসেবে দাবি করা হচ্ছে। তেল আবিবের দাবি, ইরান ও তার মিত্রদের সাথে চলমান উত্তজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে পশ্চিম তীরে কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা বা সশস্ত্র প্রতিরোধ যাতে দানা বাঁধতে না পারে, সে জন্য এই কঠোর অবস্থান অনিবার্য।

ইসরায়েলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, "নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবং সম্ভাব্য হামলা নস্যাৎ করতেই এই সুনির্দিষ্ট অভিযান ও তল্লাশি চালানো হচ্ছে।" তারা দাবি করে থাকে যে, বিশেষ করে জেনিন ও নাবলুসের মতো এলাকাগুলো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অভয়ারণ্য হয়ে উঠছে, যা নিরসন করা তাদের আইনি ও নিরাপত্তা অধিকারের অন্তর্ভুক্ত। তবে এই অভিযানে বেসামরিক জানমালের ক্ষয়ক্ষতি বা পদ্ধতিগত দখলের অভিযোগগুলোকে তারা বরাবরই ‘অতিরঞ্জিত’ বলে প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুরু হওয়া সরাসরি সংঘাতের সুযোগে পশ্চিম তীরে সামরিক অভিযানের তীব্রতা কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ও স্থানীয় সূত্রগুলোর তথ্যমতে, এই অল্প সময়ের ব্যবধানেই ইসরায়েলি বাহিনী কমপক্ষে ২৩০ জন ফিলিস্তিনিকে গ্রেপ্তার করেছে। পর্দার আড়ালের বাস্তবতা:

  • গণগ্রেপ্তার ও তল্লাশি: ফিলিস্তিনি প্রিজনার্স ক্লাবের মিডিয়া কর্মকর্তা আমানি সারাহনেহ জানান, ইরান যুদ্ধের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত ২৩০ জনকে আটক করা হয়েছে এবং শত শত মানুষকে ‘মাঠ পর্যায়ে জিজ্ঞাসাবাদ’ করা হয়েছে।
  • বসতবাড়ি দখল: উত্তর পশ্চিম তীরের জেনিনসহ বিভিন্ন শহরে ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিগত ঘরবাড়ি দখল করে সেগুলোকে অস্থায়ী সামরিক ব্যারাকে পরিণত করছে ইসরায়েলি সেনারা।
  • সামরিকায়ন: রাস্তায় সাঁজোয়া যান ও ভারী গোলন্দাজ বাহিনীর নিয়মিত টহল এখন প্রাত্যহিক দৃশ্য। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আহমেদ রফিক আওয়াদ একে ফিলিস্তিনি শহরগুলোতে ইসরায়েলি সামরিক উপস্থিতিকে ‘স্বাভাবিকীকরণ’ (Normalize) করার একটি কৌশল হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

ফাতাহ আন্দোলনের মুখপাত্র ইয়াদ আবু জেনিথ জানিয়েছেন, একদিকে সামরিক বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে, অন্যদিকে উগ্রপন্থী বসতি স্থাপনকারীরা ফিলিস্তিনি গ্রামগুলোতে হামলা ও সম্পদ ধ্বংসের মহোৎসব মেতেছে। ২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই ধারাবাহিক সহিংসতায় এ পর্যন্ত ১১২৫ জন ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন প্রায় ১১ হাজার ৭০০ জন।

বিশেষ করে গত ৮ ফেব্রুয়ারি সি-জোনের জমিকে 'রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি' হিসেবে ঘোষণা করা—আন্তর্জাতিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যুদ্ধের ডামাডোলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক মানচিত্র বদলে দেওয়ার এই চেষ্টা স্পষ্টত আইনের পরিপন্থী। ফিলিস্তিনিদের নাগরিক সুরক্ষা ও মৌলিক অধিকার আজ চরম হুমকির মুখে। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর নীরবতা ইসরায়েলকে দায়মুক্তির  সুযোগ করে দিচ্ছে।

জাতিসংঘের প্রস্তাবনা অনুযায়ী, ১৯৬৭ সালের সীমানার ভেতর বসতি স্থাপন অবৈধ। এমতাবস্থায়, একটি স্বাধীন ও স্বচ্ছ আন্তর্জাতিক তদন্ত এবং ফিলিস্তিনি নাগরিকদের সুরক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি। ফিলিস্তিনিদের আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের স্বীকৃতি ও দখলদারিত্বের অবসানই হচ্ছে একমাত্র টেকসই সমাধান।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত