শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

ইউএপিএ আইনের মারপ্যাঁচে পিষ্ট তারুণ্য; তদন্তে গুরুতর গাফিলতি ও প্রমাণের অভাবে মুক্তি পেলেন জামশেদ ও পারভেজ

বিনাদোষে ৮ বছর জেল: দিল্লির আদালতে দুই কাশ্মীরি যুবক নির্দোষ সাব্যস্ত



বিনাদোষে ৮ বছর জেল: দিল্লির আদালতে দুই কাশ্মীরি যুবক নির্দোষ সাব্যস্ত

ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি বিশেষ আদালত দীর্ঘ আট বছর পর দুই কাশ্মীরি যুবক—জামশেদ জহুর পল এবং পারভেজ রশিদ লোনকে সন্ত্রাসবাদের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন। বিতর্কিত কঠোর আইন ইউএপিএ (UAPA)-এর অধীনে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই রায় প্রদান করেন। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস (APCR)-এর আইনি লড়াইয়ের ফলে এই মুক্তি আসলেও হারিয়ে যাওয়া আটটি বছরের ক্ষতিপূরণ নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

২০১৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দিল্লির লাল কেল্লার নিকটবর্তী এলাকা থেকে জামশেদ জহুর পল এবং পারভেজ রশিদ লোনকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ছিল, এই দুই যুবক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন 'আইএসআইএস'-এর সাথে সম্পৃক্ত এবং তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অস্ত্র সংগ্রহের ষড়যন্ত্র করছিল। পুলিশের চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-এর ধারা ১৮ ও ২০ এবং অস্ত্র আইনের ২৫ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি ছিল, উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনে থাকা চ্যাট স্ক্রিনশট এবং জব্দকৃত নথিপত্র তাদের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ। এমনকি ২০২৪ সাল পর্যন্ত দিল্লি হাইকোর্ট তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছিল এই যুক্তিতে যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের আটকে রাখা প্রয়োজন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালে হলেও অভিযোগ গঠন করতেই সময়ক্ষেপণ করা হয় চার বছর। ২০২২ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠিত হয়। দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক অমিত বানসাল মামলার পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণে জানান যে, পুলিশের পেশ করা তথ্যে চরম অসঙ্গতি রয়েছে।

জব্দ তালিকার মেমো এবং সাইট প্ল্যানে এফআইআর নম্বর লেখা ছিল, যা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব। বিচারক উল্লেখ করেন, অস্ত্র উদ্ধারের আগেই কীভাবে এফআইআর নম্বর নথিতে এল, তা পুলিশের দাবির সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অভিযুক্তদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোনগুলো সিলগালা না করেই প্রায় দুই মাস পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ফরেনসিক পরীক্ষার আগে এই দীর্ঘ সময় ফোনগুলো অনিরাপদ থাকায় উদ্ধারকৃত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা আদালত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এপিসিআর-এর ন্যাশনাল সেক্রেটারি নাদিম খান বলেন, "আজ তাদের ওপর থেকে 'সন্ত্রাসী' তকমা মুছে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের জীবনের সোনালী আটটি বছর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।" বিনাদোষে কারাবাসের ফলে এই দুই মুসলিম পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইউএপিএ-এর মতো কঠোর আইনগুলো অনেক সময় নিরেট প্রমাণের চেয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই মামলায় আট বছরের দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার 'প্রক্রিয়াগত অবিচার'-এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

আদালতের রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রসিকিউশন পক্ষ জামশেদ ও পারভেজের বিরুদ্ধে আইএসআইএস সদস্য হওয়া বা অস্ত্র সংগ্রহের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযানের কারণে যদি নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শনিবার, ২১ মার্চ ২০২৬


বিনাদোষে ৮ বছর জেল: দিল্লির আদালতে দুই কাশ্মীরি যুবক নির্দোষ সাব্যস্ত

প্রকাশের তারিখ : ২১ মার্চ ২০২৬

featured Image

ভারতের রাজধানী দিল্লির একটি বিশেষ আদালত দীর্ঘ আট বছর পর দুই কাশ্মীরি যুবক—জামশেদ জহুর পল এবং পারভেজ রশিদ লোনকে সন্ত্রাসবাদের দায় থেকে মুক্তি দিয়েছেন। বিতর্কিত কঠোর আইন ইউএপিএ (UAPA)-এর অধীনে আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন প্রমাণিত হওয়ায় আদালত এই রায় প্রদান করেন। অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ সিভিল রাইটস (APCR)-এর আইনি লড়াইয়ের ফলে এই মুক্তি আসলেও হারিয়ে যাওয়া আটটি বছরের ক্ষতিপূরণ নিয়ে উঠেছে বড় প্রশ্ন।

২০১৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর দিল্লির লাল কেল্লার নিকটবর্তী এলাকা থেকে জামশেদ জহুর পল এবং পারভেজ রশিদ লোনকে গ্রেপ্তার করে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। রাষ্ট্রপক্ষের দাবি ছিল, এই দুই যুবক আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন 'আইএসআইএস'-এর সাথে সম্পৃক্ত এবং তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্যে অস্ত্র সংগ্রহের ষড়যন্ত্র করছিল। পুলিশের চার্জশিটে তাদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-এর ধারা ১৮ ও ২০ এবং অস্ত্র আইনের ২৫ নম্বর ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছিল। সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি ছিল, উদ্ধারকৃত মোবাইল ফোনে থাকা চ্যাট স্ক্রিনশট এবং জব্দকৃত নথিপত্র তাদের অপরাধের অকাট্য প্রমাণ। এমনকি ২০২৪ সাল পর্যন্ত দিল্লি হাইকোর্ট তাদের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছিল এই যুক্তিতে যে, জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাদের আটকে রাখা প্রয়োজন।

ঘটনার সূত্রপাত ২০১৮ সালে হলেও অভিযোগ গঠন করতেই সময়ক্ষেপণ করা হয় চার বছর। ২০২২ সালের এপ্রিলে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠিত হয়। দিল্লির পাতিয়ালা হাউস কোর্টের অতিরিক্ত দায়রা বিচারক অমিত বানসাল মামলার পূর্ণাঙ্গ পর্যবেক্ষণে জানান যে, পুলিশের পেশ করা তথ্যে চরম অসঙ্গতি রয়েছে।

জব্দ তালিকার মেমো এবং সাইট প্ল্যানে এফআইআর নম্বর লেখা ছিল, যা পদ্ধতিগতভাবে অসম্ভব। বিচারক উল্লেখ করেন, অস্ত্র উদ্ধারের আগেই কীভাবে এফআইআর নম্বর নথিতে এল, তা পুলিশের দাবির সত্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।

অভিযুক্তদের কাছ থেকে জব্দ করা মোবাইল ফোনগুলো সিলগালা না করেই প্রায় দুই মাস পুলিশের হেফাজতে রাখা হয়েছিল। ফরেনসিক পরীক্ষার আগে এই দীর্ঘ সময় ফোনগুলো অনিরাপদ থাকায় উদ্ধারকৃত তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা আদালত প্রত্যাখ্যান করেছেন।

এপিসিআর-এর ন্যাশনাল সেক্রেটারি নাদিম খান বলেন, "আজ তাদের ওপর থেকে 'সন্ত্রাসী' তকমা মুছে গেছে ঠিকই, কিন্তু তাদের জীবনের সোনালী আটটি বছর কেউ ফিরিয়ে দিতে পারবে না।" বিনাদোষে কারাবাসের ফলে এই দুই মুসলিম পরিবারের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়েছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, ইউএপিএ-এর মতো কঠোর আইনগুলো অনেক সময় নিরেট প্রমাণের চেয়ে অনুমানের ভিত্তিতে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতীয় সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের দ্রুত বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু এই মামলায় আট বছরের দীর্ঘসূত্রতা এবং দুর্বল প্রমাণের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার 'প্রক্রিয়াগত অবিচার'-এর এক জ্বলন্ত উদাহরণ।

আদালতের রায়ে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, প্রসিকিউশন পক্ষ জামশেদ ও পারভেজের বিরুদ্ধে আইএসআইএস সদস্য হওয়া বা অস্ত্র সংগ্রহের কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে। আইনি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তদন্তকারী কর্মকর্তাদের গাফিলতি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযানের কারণে যদি নিরপরাধ মানুষের জীবন নষ্ট হয়, তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা জরুরি।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত