সংকটে সাংবিধানিক সংস্কার প্রক্রিয়া: গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ ও বিএনপির শপথ বর্জন
একদিকে নবগঠিত মন্ত্রিসভার শপথের প্রস্তুতি, অন্যদিকে দেশের ভবিষ্যৎ শাসনতন্ত্র নির্ধারণী ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নিয়ে শুরু হয়েছে আইনি ও রাজনৈতিক জটিলতা। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিতর্কিত গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট দায়েরের পাশাপাশি নবনির্বাচিত ২০৯ জন বিএনপি সংসদ সদস্য সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। ফলে নির্বাচনের পরপরই রাষ্ট্র সংস্কারের যে রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়েছিল, তা বড় ধরনের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।মঙ্গলবার সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সদস্যরা শপথ নিলেও সেখানে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখা যায়। বিএনপি থেকে নির্বাচিত সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও তারা ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ থেকে বিরত থাকেন।
শপথ বর্জনের নেপথ্যে আইনি যুক্তিবিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ দলের এই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দিয়ে জানান, বর্তমান সংবিধানে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ নামে কোনো কাঠামোর অস্তিত্ব নেই। তিনি বলেন, "আমরা জনগণের ভোটে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছি। আগে সংসদে গিয়ে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করে এই পরিষদের আইনি ভিত্তি নিশ্চিত করতে হবে। তার আগে এমন কোনো পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া অসাংবিধানিক।"উল্লেখ্য, ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বা সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এই পরিষদ গঠন করে সংবিধানের আমূল পরিবর্তনের কথা ছিল। বিএনপি এই প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলায় পরিষদের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।আদালতে গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জরাজনৈতিক এই অচলাবস্থার মধ্যেই মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী এ বি এম আতাউল মজিদ তৌহিদ জনস্বার্থে হাইকোর্টে একটি রিট দায়ের করেন। রিটে ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে এবং ১৩ ফেব্রুয়ারি ঘোষিত ফলাফল বাতিল করার আবেদন জানানো হয়েছে।রিটকারী আইনজীবীর মতে, এই গণভোটের আইনি ভিত্তি এবং ভোটগ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে সংশয় রয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিচারপতি ফাতেমা নজীবের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এই আবেদনের ওপর শুনানি হতে পারে।সহযোগীদের অবস্থান ও রাজনৈতিক সমীকরণবিএনপির এই কঠোর অবস্থানের প্রভাব পড়েছে তাদের রাজনৈতিক মিত্রদের ওপরও। জামায়াতে ইসলামীর নবনির্বাচিত সাংসদরা প্রথমে জানিয়েছিলেন বিএনপি শপথ না নিলে তারাও নেবেন না। তবে শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড় নেয় ঘটনাটি; জামায়াত ও ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (NCP)-র সদস্যরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ—উভয় পদেই শপথ গ্রহণ করেছেন। শপথ গ্রহণ কক্ষে জামায়াত সদস্যরা যখন সংস্কার পরিষদের শপথ নিচ্ছিলেন, তখন বিএনপি সংসদ সদস্য ইশরাক হোসেন ও স্বতন্ত্র সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানাকে কক্ষ ত্যাগ করতে দেখা যায়।সামনে কী অপেক্ষা করছে?বিকালে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের কাছে ৪৯ সদস্যের মন্ত্রিসভার শপথ নেওয়ার কথা থাকলেও সংবিধান সংস্কারের মূল কাজটি এখন আইনি ও রাজনৈতিক বেড়াজালে আটকা পড়ল। নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি রাজপথের সংস্কারের দাবিকে সংসদের আইনি কাঠামোর ভেতর দিয়ে নিতে চায়, যা অন্তর্বর্তীকালীন সংস্কার প্রস্তাবের সাথে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
একনজরে বর্তমান পরিস্থিতিগণভোট: ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত; রিট দায়েরের মাধ্যমে ফলাফল চ্যালেঞ্জ।বিএনপির অবস্থান: ২০৯ সাংসদ সংস্কার পরিষদের শপথ বর্জন করেছেন।যুক্তি: পরিষদের সাংবিধানিক স্বীকৃতির অভাব।অন্যান্য দল: জামায়াত ও এনসিপি (NCP) উভয় শপথই গ্রহণ করেছে।রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, গণভোটের বৈধতা নিয়ে আদালতের রায় এবং সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিএনপির ভূমিকা বলে দেবে বাংলাদেশের পরবর্তী রাজনৈতিক গতিপথ কোন দিকে মোড় নেবে।