নেপালের দক্ষিণাঞ্চলীয় সীমান্ত শহর বীরগঞ্জে একটি মসজিদে ভাঙচুরের ঘটনার পর হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্থানীয় প্রশাসন অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেছে। সেনা ও সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে পুরো শহরজুড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও থেকেই এই অস্থিরতার সূত্রপাত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।নেপালের ভারত সীমান্তসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক শহর বীরগঞ্জে মসজিদ ভাঙচুর ও ধর্মীয় গ্রন্থ অবমাননার ঘটনার পর নিরাপত্তা পরিস্থিতি মারাত্মকভাবে অবনতি ঘটে। পার্সা জেলা প্রশাসনের জারি করা কারফিউ আদেশ অনুযায়ী সব ধরনের চলাচল, সভা, সমাবেশ ও বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্দেশ অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের সতর্কতাও দেওয়া হয়েছে।বীরগঞ্জ কাঠমান্ডু থেকে প্রায় ১৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত এবং ভারত থেকে নেপালে তেল, পণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রবেশের প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত। শহরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সশস্ত্র সেনা ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার তথ্যমতে, একটি টিকটক ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়। ভিডিওটিতে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানার মতো বক্তব্য ছিল বলে অভিযোগ ওঠে। স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ ওই ভিডিও তৈরির অভিযোগে দুই যুবককে আটক করে। পরিস্থিতি শান্ত করার চেষ্টা চললেও, এর মধ্যেই একটি মসজিদে হামলা ও ধর্মীয় গ্রন্থ অবমাননার ঘটনা ঘটে, যা মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দেয়।রোববার মুসলিম সংগঠনগুলো বিক্ষোভ শুরু করে। তারা সড়ক অবরোধ করে, টায়ার জ্বালায় এবং বিভিন্ন স্লোগান দেয়। একই দিনে হিন্দু সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও আলাদা কর্মসূচি পালিত হয়। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে এবং বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে আটক করে। পুলিশের কয়েকজন সদস্য আহত হওয়ার কথাও নিশ্চিত করা হয়েছে।পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রশাসন মুসলিম ও হিন্দু ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং সবাইকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে। তবে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত না হওয়ায় কারফিউর সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে, যদিও সীমিত সময়ের জন্য কিছুটা শিথিলতা দেওয়া হয়েছে।উল্লেখযোগ্যভাবে, সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু অধ্যুষিত নেপালে হিন্দু–মুসলিম সংঘর্ষ তুলনামূলকভাবে বিরল। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর বড় অংশ দক্ষিণ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতেই বসবাস করে।প্রসঙ্গত, এর আগে নেপালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সাময়িক নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে যে বিক্ষোভ শুরু হয়েছিল, তা সহিংস রূপ নেয়। পুলিশি অভিযানে প্রাণহানির পর দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে এবং দ্বিতীয় দিনে ২ হাজার ৫০০–এর বেশি স্থাপনা পুড়িয়ে দেওয়া, লুট বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণে গঠিত একটি কমিটি তাদের প্রতিবেদন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী সুশিলা কার্কির কাছে জমা দেয়। প্রতিবেদনে জানানো হয়, ওই আন্দোলনে মোট ৭৭ জন নিহত হন—৮ সেপ্টেম্বর ২০ জন, পরদিন ৩৭ জন এবং পরবর্তী সময়ে আরও ২০ জন। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ধরা হয় ৮৪ আরব ৪৫ কোটি ৭৭ লাখ নেপালি রুপি, যা প্রায় ৫৮৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।