বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

ভারতীয় নাগরিক সত্ত্বেও ১৪ জন বাঙালি মুসলিমকে বাংলাদেশে পুশ-ইন

ভারতের ওডিশা রাজ্যে বসবাসকারী একটি বাঙালি মুসলিম পরিবারকে ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী (BSF)-এর বিরুদ্ধে। পরিবারগুলোর দাবি, বৈধ ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও ভাষা ও ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হয়েছে। ঘটনাটি ইতোমধ্যে দুই দেশের সীমান্তে কূটনৈতিক ও মানবাধিকার উদ্বেগ তৈরি করেছে।ওডিশার জগৎসিংহপুর জেলার এরসামা থানার আওতাধীন আম্বিকা গ্রামের একই পরিবারের ১৪ জন বাঙালি মুসলিমকে ২০২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর রাতে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার গেদে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছে পরিবারগুলো।সংবাদমাধ্যম Maktoob-এর সঙ্গে কথা বলে ভুক্তভোগীদের স্বজনরা জানান, স্থানীয় পুলিশ প্রথমে তাদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং ১৪ জনকে আটক করে। পরে তাদের BSF-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সব বৈধ কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও তাদের ‘বাংলাদেশি নাগরিক’ আখ্যা দিয়ে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়।ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে আধার কার্ড, ভোটার আইডি, রেশন কার্ড ও পুরোনো জমির দলিলসহ একাধিক সরকারি নথি রয়েছে। শেখ জব্বারের আত্মীয় সাইফুল আলী খান বলেন,“সব কাগজ দেখানোর পরও আমাদের কথা শোনা হয়নি। উল্টো পুলিশ হুমকি দিয়েছে।”ভুক্তভোগীদের মধ্যে রয়েছেন চার শিশু, পাঁচ নারী ও পাঁচ পুরুষ। তাদের মধ্যে আছেন ৯০ বছর বয়সী গুলশান বিবি, ৭০ বছর বয়সী শেখ জব্বার এবং তার চার ছেলে— শেখ হাকিম (৪৫), শেখ উকিল (৪০), শেখ রাজা (৩৮) ও শেখ বান্টি (২৮)।এছাড়া রয়েছেন শেখ উকিলের ১১ বছর বয়সী কন্যা শাকিলা খাতুন; শেখ রাজার তিন সন্তান— ১২ বছর বয়সী নাসরিন পারভিন, ১১ বছর বয়সী শেখ তৌহিদ এবং দুই বছর বয়সী শেখ রহিদ। পরিবারের অন্য সদস্যরা হলেন আলকুম বিবি (৬৫), সামসেরি বিবি (৪০), সাবেরা বিবি (৩৫) ও মেহেরুন বিবি (২৫)।পরিবারের দাবি, তারা প্রায় ৭০ বছর ধরে ওডিশায় বসবাস করছেন এবং সবাই সেখানকার নিবন্ধিত ভোটার। শেখ জব্বারের পূর্বপুরুষরা পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনার নামখানা এলাকা থেকে কাজের সন্ধানে ওডিশায় চলে এসেছিলেন। পরিবারের নতুন প্রজন্মের জন্ম ওডিশাতেই।আরেক আত্মীয় শেখ আকরাম জানান,“দেড় মাস ধরে আমরা জানতামই না তারা কোথায় আছে। গণমাধ্যমে খবর দেখে জানতে পারি, ২৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গেদে সীমান্ত দিয়ে তাদের বাংলাদেশে পাঠানো হয়েছে।”ঘটনাটি পরে নিশ্চিত করেন বাংলাদেশের ৬ নম্বর বিজিবি চুয়াডাঙ্গা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নজমুল হাসান। তিনি বলেন,“২৬ ডিসেম্বর গভীর রাতে কুয়াশার সুযোগ নিয়ে BSF দর্শনা নিমতলা সীমান্ত গেট খুলে শিশু ও বৃদ্ধসহ ১৪ জন ভারতীয় নাগরিককে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়।”তিনি আরও জানান, এই ১৪ জন বাংলাদেশি নন এবং বাংলাদেশে তাদের কোনো আত্মীয়স্বজন নেই। এর আগেও ২৩ ডিসেম্বর কুষ্টিয়া সীমান্ত দিয়ে তাদের ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, যা ব্যর্থ হয়। বিজিবি এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়েছে এবং দুই দেশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষে তাদের আবার ভারতে ফেরত পাঠানো হবে বলে জানান তিনি।এদিকে পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি শুভঙ্কর সরকার ঘটনাটি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে ও লোকসভায় বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে চিঠি দিয়ে জানান, বিজেপি-শাসিত রাজ্যগুলোতে বাঙালি ভাষাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর ধারাবাহিকভাবে নিপীড়ন চলছে।চিঠিতে তিনি ওডিশায় ১৪ সদস্যের এই পরিবারকে সীমান্তে ঠেলে দেওয়ার ঘটনার পাশাপাশি সাম্বলপুরে জুয়েল রানা নামের এক বাঙালি শ্রমিককে ‘বাংলাদেশি’ সন্দেহে হত্যা করার প্রসঙ্গও উল্লেখ করেন। তিনি অভিযোগ করেন, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার—কেউই এসব ঘটনার বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।মানবাধিকার সংগঠন Indian Justice Forum ঘটনাটিকে সংবিধানের চরম লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে। সংগঠনটির চেয়ারম্যান ও আইনজীবী আসফাক আহমেদ বলেন,“শুধু মুসলিম হওয়া ও বাংলা ভাষায় কথা বলার কারণে একজন বৈধ নাগরিককে অন্য দেশে ঠেলে দেওয়া কীভাবে সম্ভব? এটি সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশনার সম্পূর্ণ অবমাননা।”তিনি জানান, ইতোমধ্যে প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে এবং প্রয়োজন হলে ওডিশা হাইকোর্টে মামলা দায়ের করা হবে।ঘটনাটি ভারতের নাগরিক অধিকার, সংখ্যালঘু নিরাপত্তা এবং সীমান্তে মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে নতুন করে গুরুতর বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

ভারতীয় নাগরিক সত্ত্বেও ১৪ জন বাঙালি মুসলিমকে বাংলাদেশে পুশ-ইন