পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন প্রকল্পের চূড়ান্ত নোটিশ: হুমকির মুখে ফিলিস্তিনিদের অস্তিত্ব
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুজালেমে একটি নতুন বসতি প্রকল্প বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দিয়েছে। ‘নেসিগ আল-হায়াত’ (জীবনের বুনন) নামের এই প্রকল্পটি কার্যকর হলে পশ্চিম তীরের ভৌগোলিক সংযোগ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ একে কার্যত দখল ও সংযুক্তিকরণের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখছে।ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীন জেরুজালেম গভর্নরেট বৃহস্পতিবার জানায়, ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ পূর্ব জেরুজালেমের বেদুইন জনগোষ্ঠীর আইনজীবী ও আল-ইযারিয়া পৌরসভাকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে যে, নোটিশ প্রদানের ৪৫ দিন পর ‘নেসিগ আল-হায়াত’ বসতি প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু করা হবে।গভর্নরেটের বিবৃতিতে বলা হয়, এই প্রকল্পটি ইসরায়েলের বিতর্কিত E1 অঞ্চল সংযুক্তিকরণ পরিকল্পনার বাস্তব রূপ। এর লক্ষ্য হলো মাআলে আদুমিম বসতি ও জেরুজালেম শহরের মধ্যে পূর্ণ ভৌগোলিক সংযোগ স্থাপন করা। এর ফলে পশ্চিম তীরের উত্তর ও দক্ষিণ অংশ কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এবং প্রায় ৩ শতাংশ পশ্চিম তীর এলাকা তথাকথিত ‘গ্রেটার জেরুজালেম’ পরিকল্পনার আওতায় সংযুক্ত হয়ে যাবে।বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রকল্পটি একটি বর্ণবাদী ও বৈষম্যমূলক পরিবহন ব্যবস্থা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ফিলিস্তিনিদের প্রধান সড়ক নম্বর ‘১’ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে এবং তাদের জাইয়িম চেকপয়েন্টের কাছে ভূগর্ভস্থ একটি টানেল দিয়ে চলাচলে বাধ্য করা হবে। বিপরীতে, সড়কের উপরিভাগ শুধুমাত্র ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের জন্য বরাদ্দ থাকবে।জেরুজালেম গভর্নরেট সতর্ক করে জানায়, এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে জাবাল আল-বাবা, ওয়াদি আল-জামাল বেদুইন বসতি ও আল-ইযারিয়া শহর কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। পাশাপাশি, প্রকল্প সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে সম্প্রতি অন্তত ৪৩টি স্থাপনায় উচ্ছেদ ও ভাঙার পূর্ব নোটিশ দেওয়া হয়েছে, যা ডজনের বেশি ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলেছে।প্রকল্পের আর্থিক দিক তুলে ধরে বিবৃতিতে বলা হয়, প্রায় ৯৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিতব্য এই সড়কটির অর্থায়ন করা হচ্ছে ইসরায়েলের অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোত্রিচের সিদ্ধান্তে আটকে রাখা ফিলিস্তিনি রাজস্ব তহবিল (ক্লিয়ারেন্স ফান্ড) থেকে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অভিযোগ, আন্তর্জাতিক মহলে প্রকল্পটিকে ‘ফিলিস্তিনিদের উপকারে আসবে’—এমনভাবে উপস্থাপন করা হলেও প্রকৌশল নকশা স্পষ্ট করে যে এর মূল উদ্দেশ্য বসতি স্থাপনকারীদের চলাচল সহজ করা।জেরুজালেম গভর্নরেট এই প্রকল্পকে “ভৌগোলিকভাবে সংযুক্ত একটি স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনার ওপর মারাত্মক আঘাত” বলে উল্লেখ করেছে এবং কেবল নিন্দা বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।উল্লেখ্য, ইসরায়েলি সরকার ২০১২ সালে ‘নেসিগ আল-হায়াত’ প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়। এতে সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি শিল্প এলাকা, পুলিশ কেন্দ্র, বর্জ্য ফেলার স্থান, বসতি ইউনিট, হোটেল কক্ষ, একটি ধর্মীয় উদ্যান ও একটি জনসাধারণের পার্ক নির্মাণের পরিকল্পনাও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।প্রকল্পটির একটি অংশ ইতোমধ্যে আনাতা শহরের পূর্বে পৃথকীকরণ দেয়ালের কাছে, জাইয়িম গ্রাম পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। বাকি অংশটি জাইয়িম থেকে আল-ইযারিয়া পর্যন্ত নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে।গত কয়েক বছরে এই এলাকায় বসতি নির্মাণ নিয়ে ইসরায়েলি সরকার একাধিক সিদ্ধান্ত নেয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে সেখানে ৩,৫০০ বসতি ইউনিট নির্মাণের ঘোষণা দেওয়া হলেও আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তা সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হয়।