২০২৫ সালে ভারতে মুসলিম নির্যাতন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে
২০২৫ সালে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের—বিশেষত মুসলিমদের—মানবাধিকার পরিস্থিতির অবনতি নজিরবিহীন পর্যায়ে পৌঁছেছে। রাষ্ট্রীয় বাহিনী ও উগ্র-হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর সহিংসতায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, নির্বিচার গ্রেপ্তার, গণউচ্ছেদ ও সীমান্ত পুশব্যাক একটি কাঠামোগত দমননীতিতে রূপ নিয়েছে। India Persecution Tracker 2025 প্রতিবেদনে এই ভয়াবহ বাস্তবতা বিস্তারিতভাবে নথিভুক্ত করা হয়েছে।South Asia Justice Campaign প্রকাশিত India Persecution Tracker | 2025 | Annual Overview প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ ডিসেম্বর ২০২৫ পর্যন্ত সময়ে ভারতে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের মাত্রা আগের সব বছরের তুলনায় আরও ভয়াবহ হয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও উগ্র-হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সম্মিলিত সহিংসতায় মুসলিম জনগোষ্ঠী ক্রমাগত নিরাপত্তাহীনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যের শিকার হয়েছে।বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড: রাষ্ট্রীয় সহিংসতার বিস্তার২০২৫ সালে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে অন্তত ২৩ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন। এই সংখ্যা ২০২৪ সালে ২১ এবং ২০২৩ সালে ২০ ছিল।জম্মু ও কাশ্মীরে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে কমপক্ষে ৮ জন মুসলিম বেসামরিক নাগরিক নিহতউত্তর প্রদেশে পুলিশের তথাকথিত ‘এনকাউন্টার’-এ ৬ জন মুসলিম নিহত, যা রাজ্যটির ইতিহাসে সর্বোচ্চআসামে উচ্ছেদ অভিযানের সময় ১ জন মুসলিম গুলিতে নিহত, ২০১৭ সালের পর এটি অষ্টম ঘটনাএছাড়া উত্তর প্রদেশে ধারাবাহিক ‘হাফ এনকাউন্টার’ অভিযানে ডজনখানেক মুসলিম স্থায়ীভাবে পঙ্গু হয়েছেন।উগ্র-হিন্দুত্ববাদী সহিংসতা: পরিকল্পিত ধর্মীয় বিদ্বেষ২০২৫ সালে উগ্র-হিন্দুত্ববাদীদের হাতে ধর্মীয় বিদ্বেষপ্রসূত হামলায় অন্তত ২৭ জন মুসলিম ও ১ জন দলিত নিহত হয়েছেন।উত্তর প্রদেশে সর্বোচ্চ ৬ জনবিহারে ৪ জনত্রিপুরায় ৪ জননিহতদের মধ্যে—৯ জন মুসলিম নিহত হয়েছেন গোরক্ষা সহিংসতার প্রেক্ষাপটে৫ জন (৪ মুসলিম ও ১ দলিত) ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়সহিংসতা ও লাগাতার হুমকির ফলে ২ জন মুসলিম আত্মহত্যা করেছেন।২০২৫ সালে ১৩টি রাজ্যে অন্তত ২৬টি লক্ষ্যভিত্তিক গণহামলা সংঘটিত হয়েছে, যেখানে উগ্র-হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের সংগঠিত অংশগ্রহণ ছিল।গণগ্রেপ্তার ও নির্বিচার আটক: মুসলিম জীবনের অপরাধীকরণপ্রতিবেদন অনুযায়ী, মুসলিমদের বিরুদ্ধে নির্বিচার গ্রেপ্তার একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে—পাহালগাম হামলার পর কাশ্মীরে ৩,০০০+ মুসলিম আটক, দিল্লি বোমা হামলার পর আরও ১,০০০+গুজরাটে ৬,৫০০+ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম শ্রমিক আটকআসামে ২,৫০০+ মুসলিম গ্রেপ্তার ও বিতাড়ন, গোরক্ষা আইনে আরও ৩০০+ গ্রেপ্তার‘I Love Muhammad’ শান্তিপূর্ণ স্লোগানের কারণে ২৬৫+ মুসলিম গ্রেপ্তার, অধিকাংশ উত্তর প্রদেশেএই ধরনের গ্রেপ্তার এতটাই স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে যে বহু ঘটনা গণমাধ্যমের নজর এড়িয়ে যাচ্ছে।জোরপূর্বক উচ্ছেদ ও সীমান্ত পুশব্যাক২০২৫ সালের মে মাস থেকে—৪,০০০+ বাংলা ভাষাভাষী মুসলিম একতরফাভাবে বিতাড়িত১,৮৮০+ মুসলিমকে বাংলাদেশে পুশব্যাক, যাদের মধ্যে ২০০+ ভারতীয় নাগরিকআসাম থেকে অক্টোবর–ডিসেম্বরে ২,০০০+ মুসলিম বিতাড়িত১৪০+ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে জোরপূর্বক মিয়ানমারে ফেরত, যার মধ্যে ৪০ জনকে সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হয়রাজনৈতিক ভাষ্য ও উসকানিপ্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শীর্ষ বিজেপি নেতারা নিয়মিত মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’, ‘অপরাধী’ ও ‘জনসংখ্যাগত হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।উগ্র-হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (VHP) ও বজরং দল (BD) দেশজুড়ে অস্ত্র প্রশিক্ষণ, ঘৃণামূলক সমাবেশ ও মুসলিমবিরোধী প্রচার জোরদার করেছে।আন্তর্জাতিক উদ্বেগ২০২৫ সালে একাধিক আন্তর্জাতিক সংস্থা ভারতের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে—জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার রোহিঙ্গা বিতাড়নের নিন্দা জানানCERD আসামে মুসলিম নিপীড়ন নিয়ে জরুরি সতর্কতা জারি করেUN Special Rapporteurs মুসলিম উচ্ছেদ ও কাশ্মীর পরিস্থিতিকে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে আখ্যা দেনUSCIRF পুনরায় ভারতকে Country of Particular Concern ঘোষণার সুপারিশ করেপ্রতিবেদনটি সতর্ক করেছে—২০২৬ সালে প্রবেশের সময় ভারতে মুসলিম নির্যাতন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং রাষ্ট্রীয় নীতি ও উগ্র-হিন্দুত্ববাদী সহিংসতার মাধ্যমে এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বাভাবিক দমনব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। আসন্ন নির্বাচন পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তুলতে পারে।