বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

মহিমান্বিত শাবান ও শবে বরাত: করণীয় ও বর্জনীয়

মাহে শাবান আসন্ন। বরকতপূর্ণ মাস সমূহের মধ্যে এটিও অন্তর্ভুক্ত। স্বয়ং নবীজি সা. এই মাসে আল্লাহর কাছে বরকতের দোয়া করেছিলেন। তাই এই মাসের আগমন আমাদের জন্য অনেক মুবারক।   ইমাম আবু বকর বলখী রহ. বলেন, রজব মাস হল, বীজ বপণের মাস। আর শাবান মাস হল, ফসলে পানি সেচ দেওয়ার মাস। এবং রমজান মাস হল, ফসল কাটার মাস। উক্ত উক্তি দ্বারা শাবান মাসে একজন মুমিনের জন্য এবাদতের ব্যাপক প্রস্তুতির প্রতি ইঙ্গিত প্রদান করা হয়। এ মাসে বনী আদমের আমলগুলোকে আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। তাই নবীজী (সা:) চাইতেন, যেন তার আমলগুলো এমন ভাবে আল্লাহর দরবারে উপস্থাপিত হয়, যখন তিনি রোজাদার ( নাসায়ী শরীফ, হাদিস নং: ২৩৫৭) তিরমীজি শরীফের বর্ণনা। হযরত উম্মে সালমা রাজি. বলেন, আমি নবীজী সা. কে কেবল শাবান ও রমজান মাসে লাগাতার রোজা রাখতে দেখেছি। (তিরমিজি শরীফ: ৭৩৬) এই মাস বরকতপূর্ণ হওয়ার আরেকটি কারণ হলো,  শবে বরাত। সহজ ভাষায় বলতে গেলে শাবানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাত্র। হাদিসের ভাষায় এই রজনীকে ليلة النصف من شعبان বা অর্ধ শাবানের রাত হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়। এই রাতকে ঘিরে আমাদের সমাজে নানা রকমের কুসংস্কার রয়েছে। কেউ অতি বাড়াবাড়ির পর্যায়ে এটিকে নিয়ে যায় আবার কেউবা ছাড়াছাড়ি। নানা রকমের বিভ্রান্ত সমূহ থেকে বাঁচতে হাদিসের আলোকে এই রাতের করণীয় বর্জনীয় বিষয়গুলোকে সহজ ভাষায় আপনাদের খেদমতে পেশ করছি।বিখ্যাত ইমাম শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রাহ. বলেন, ১৫ শাবানের রাতের ফজিলত সম্পর্কে একাধিক "মারফু" হাদিস ও আসারে সাহাবা বর্ণিত রয়েছে। এগুলো দ্বারা ঐ রাতের ফজিলত মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এই রাতের নফল নামাজের ব্যাপারে যত্নবান হতেন। আর শাবানের রোজার ব্যাপারে তো সহি হাদিস সমূহই রয়েছে। কোন কোন আলেম যদিও এ রাতের ফজিলত অস্বীকার করেছেন; কিন্তু হাম্বলি ও গাইরে হাম্বলি অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফজিলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ( ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকিম- ২/৬৩১-৬৩২) শবে বরাআতের ফযীলত সম্পর্কে কতিপয় হাদীস▪ হযরত মু‘আয ইবনে জাবাল রা. হতে বর্ণিত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তা‘আলা অর্ধ শা‘বানের রাতে (শা‘বানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) মাখলূকের প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত আর সবাইকে ক্ষমা করে দেন। -সহীহ ইবনে হিব্বান হাদীস নং- ৫৬৬৫, আলজামেউস সগীর পৃ: ৪৪৪, মুসনাদে বাযযার হাদীস নং- ২০৪৮,ইবনে খুযাইমা কিতাবুত তাওহীদ পৃ: ১৩৬, ইবনে মাযা হাদীস নং- ১৩৯০▪ আল্লাহ তা‘আলা এ রাতে বিদ্বেষ পোষণকারী ও নিরপরাধ মানুষকে হত্যাকারী ছাড়া সকল বান্দাকে ক্ষমা করে দেন। মুসনাদে আহমদ ৪/১৭৬▪ এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা মুশরিক ও ব্যভিচারিনী মহিলা ব্যতীত সকলেরই চাওয়া পূরণ করে থাকেন। শু‘আবুল ঈমান ৩/৩৮৩ ▪ যখন অর্ধ শা‘বানের রাত্রি আসে তখন আল্লাহ তা‘আলা মাখলূকের প্রতি রহমতের দৃষ্টিতে তাকান। অত:পর মুমিনকে ক্ষমা করে দেন, কাফেরদেরকে (ফিরে আসার) সুযোগ দেন এবং হিংসুকদেরকে হিংসা পরিত্যাগ ব্যতীত ক্ষমা করেন না। শু‘আবুল ঈমান ৩/৩৮২▪ এটা হল অর্ধ শা‘বানের রাত। আল্লাহ তা‘আলা এ রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন। ক্ষমা প্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করে দেন, অনুগ্রহপ্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের তাদের অবস্থাতেই ছেড়ে দেন। শু‘আবুল ঈমান ৩/৩৮২▪ নবীজী সা. এ রাতে জান্নাতুল বাকীতে এসে মৃতদের জন্য দু‘আ ও ইস্তিগফার করেছেন। এরপর হযরত আয়েশা রা.কে বললেন, এ রাতে আল্লাহ তা‘আলা কালব গোত্রের বকরীর পশমের চেয়েও বেশি লোককে ক্ষমা করে দেন। তিরমিযী হাদীস নং- ৭৩৯▪ ১৫ শা‘বানের রাতে নামায পড় এবং দিনে রোযা রাখ। ইবনে মাযাহ হাদীস নং- ১৩৮৪এ রাতে  আমাদের বর্জনীয়মনগড়া সকল রসম-রেওয়াজ , ইবাদত মনে করে হালুয়া-রুটি, শিরনী-তবারক তৈরি ও বিতরণ করা, আতশবাজি, পটকাবাজি, ঘর-বাড়িতে আলোকসজ্জা করা, মাজারে মোমবাতি জালানো।মাইকে মিলাদ পড়ে অন্যদের ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটানো, মসজিদে দৌড়াদৌড়ি করা, গল্প করা, দলবেধে সারা রাত হৈহুল্লোর ও আনন্দ উল্লাস করা।নফল নামাযের নির্দিষ্ট রাকাআত সংখ্যা, নির্দিষ্ট সূরা, নামাযের বিশেষ পদ্ধতিকে আবশ্যক মনে করা ও মনগড়া ফযীলত বর্ণনা করা ইত্যাদি সকল অন্যায় কাজ থেকে বিরত থাকা।এ রাতে  আমাদের করণীয়এ রাতে আল্লাহ তা‘আলার যিকরে মশগুল থাকা, একনিষ্ট মনে কৃত পাপাচারের জন্য তাওবা-ইস্তিগফার করা, নফল নামায, কুরআন তিলাওয়াত, দরূদ শরীফ পাঠ করাসহ বিভিন্ন নফল ‘আমলে মশগুল থাকা এবং সকল পেরেশানী, রোগ, বিপদাপদ থেকে মুক্তি, হালাল রুজি-রুজগার ও সকল প্রকার প্রয়োজনের জন্য আল্লাহ তা‘আলার দরবারে বিশেষভাবে দু‘আ করা। ঐসকল গুনাহ থেকে তাওবা করা এবং বেঁচে থাকা যা এই বরকতময় রাতের ক্ষমা পাওয়ার সুযোগ ও দু‘আ কবূলের সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত রাখে। সকল মুমিন-মুসলমান একে-অপরের জন্য দু‘আ করা। মৃতদের জন্য দু‘আ করা।নফল ইবাদত ঘরে করা উত্তম। তবে অলসতা বা ঘুমের আশংকা হলে মসজিদেও ইবাদত করা যাবে। হাক্কানী উলামায়ে কিরামের ওয়াজ-নসীহত শুনা। ১৫ শা‘বান নফল রোযা রাখা।কিছু বিশেষ আমল ও তার পদ্ধতি ১. সালাতুত তাসবিহ: সংক্ষিপ্ত ফযিলত ও পদ্ধতি তিরমিজি শরীফের বর্ণনা। হযরত আবু রাফে রা. বলেন, একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর চাচা আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুর উদ্দেশ্যে বললেন, হে আমার চাচা! আমি কি আপনাকে উপঢৌকন দিব না! তিনি বললেন,কেন নয় হে আল্লাহর রাসূল, অবশ্যই! তখন নবীজি বললেন হে আমার চাচা! আপনি চার রাকাত নামাজ পড়ুন। নবীজী এরপর নামাজের পদ্ধতি বর্ণনা করেন। এরপর বললেন, আপনি যদি এভাবে নামাজ পড়েন, আল্লাহ তাআলা বালির স্তুপ সমপরিমাণ গুনাহ মাফ করে দিবেন। তখন তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল!  প্রতিদিন এই নামাজ পড়ার সাধ্য কার আছে! তখন নবীজি বললেন, তুমি যদি পারো তাহলে প্রতি জুমায় একবার পড়বে।  আর যদি না পারো, তাহলে প্রতি মাসে একবার পড়বে । আর যদি তখনও না পারো, তাহলে কমপক্ষে প্রতি বছরে  একবার পড়বে। ( হাদিস নং: ৪৮২) অন্য বর্ণনায় রয়েছে প্রতি বৎসরও যদি না পারো কমপক্ষে জীবনে একবার হলেও এই নামাজটি আদায় করবে। উক্ত নামাজের পদ্ধতি: প্রথমে উত্তমরূপে অজু করবে। এরপর চার রাকাত নামাজের নিয়ত করবে। যথারীতি সূরা ফাতেহার পর সূরা কেরাত পাঠ করবে। তারপর রুকুর পূর্বেই তাসবীহটি পড়বে,سبحان الله والحمد لله ولا اله الا الله والله اكبر বাংলা উচ্চারণ: সুবহানাল্লাহি ওয়াল হামদুলিল্লাহি ওয়ালা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াল্লাহু আকবার। ১৫ বার পড়বে। তারপর রুকুতে গিয়ে রুকুর তাসবীহ পড়ার পর উক্ত তাসবিহ দশবার পড়বে। তারপর রুকু থেকে উঠে "রাব্বানা লাকাল হামদ" বলার পর উক্ত তাসবি ১০ বার, প্রথম সেজদায় তাসবীহ পড়ার পর দশবার, সেজদা থেকে উঠে দুই সেজদার মাঝখানে বসে দোয়া পড়ার পর দশবার পড়বে। তারপর দ্বিতীয় সেজদায় অনুরূপ ১০ বার, দ্বিতীয় সেজদা থেকে উঠে দাঁড়ানোর পূর্বে বসে 10 বার পড়বে। এভাবে প্রত্যেক রাকাতে ৭৫ বার পড়বে। এবং চার রাকাতে তিনশতবার। এই পদ্ধতিতে দ্বিতীয় রাকাতে এবং তৃতীয় ও চতুর্থ রাকাতে এভাবে পড়বে।২. বেশি বেশি ইস্তেগফার استغفر الله استغفر الله استغفر اللهবাংলা উচ্চারণ: আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ, আস্তাগফিরুল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,  যে ব্যক্তি ইস্তেগফার কে নিজের জীবনে আবশ্যক  করবে;  আল্লাহ তাআলা তাকে তিনটা পুরস্কার দান করবেন। ১. পেরেশানি থেকে মুক্তি ২. সংকটময় অবস্থা থেকে মুক্তি ৩. অকল্পনীয় স্থান থেকে রিজিকের ব্যবস্থা। ৩. বেশি বেশি পড়বো, لا حول ولا قوة الا بالله বাংলা উচ্চারণ: লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাই সালাম বলেন, এই তাসবিহটি হল জান্নাতের খনিসমূহ থেকে একটি খনি। মানুষের জীবনের যা যা প্রয়োজন আছে ও হতে পারে, সবকিছুর সমাধান এই তাসবিহে নিহিত রয়েছে।আল্লাহ তা'আলা আমাদের প্রত্যেককে আমল করার তৌফিক দান করুন।

মহিমান্বিত শাবান ও শবে বরাত: করণীয় ও বর্জনীয়