জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের সীমান্তজুড়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। অপরাধ করে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বিদেশে পালানো, অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশ এবং জাল টাকার বিস্তার রোধে দেশের সীমান্তবর্তী ২৭টি জেলাকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়েছে ৭৮৭ জন ‘লাইনম্যানের’ তালিকা, যারা মূলত চোরাচালান ও অবৈধ পারাপারের মূল কারিগর হিসেবে কাজ করে।বাংলাদেশের সীমান্ত এখন জাতীয় নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান উদ্বেগের কেন্দ্রবিন্দু। সাম্প্রতিক কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা সভায় উঠে এসেছে যে, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে একদল অপরাধী সীমান্তকে ব্যবহার করে অস্থিতিশীলতা তৈরির চেষ্টা করছে। বিশেষ করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরিফ ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামিদের সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে।স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.) বিজিবি সদর দপ্তরে এক অনুষ্ঠানে স্পষ্ট হুশিয়ারি দিয়েছেন যে, কোনো অপরাধী যেন সীমান্ত দিয়ে পালাতে না পারে এবং চোরাকারবারিদের সহায়তা করা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।নজরদারিতে ৭৮৭ ‘লাইনম্যান’পুলিশ সদর দপ্তরের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের ২৭টি জেলায় অবৈধ পারাপারের জন্য একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট কাজ করছে। এদের স্থানীয়ভাবে ‘লাইনম্যান’ বলা হয়। তালিকায় দেখা যায়, সবথেকে বেশি লাইনম্যান রয়েছে বান্দরবানে (১১৬ জন), এরপর কক্সবাজারে (৯৯ জন) এবং সাতক্ষীরায় (৫২ জন)। এই ব্যক্তিরা স্থানীয় ভৌগোলিক অবস্থান সম্পর্কে সম্যক ধারণা রাখায় রাতের আঁধারে বা দুর্গম পাহাড়ি পথে অপরাধীদের পারাপারে সহায়তা করে।অবৈধ অস্ত্র ও জাল টাকার ঝুঁকিপুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) জানিয়েছে, সাম্প্রতিক কিছু অপরাধে ‘৭.৬৫ ক্যালিবারের’ বিদেশি অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে, যা দেশে প্রচলিত নয়। ধারণা করা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে সহিংসতা ছড়াতে এসব অবৈধ অস্ত্র সীমান্ত দিয়ে আনা হয়েছে। অন্যদিকে, বাজারে নতুন নকশার নোট আসায় সেই সুযোগে জাল টাকার কারবারিরাও সক্রিয় হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সীমান্তবর্তী গ্রামগুলোকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে এই চক্র।শীর্ষ সন্ত্রাসীদের আনাগোনাঅনুসন্ধানে জানা গেছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর অনেক শীর্ষ সন্ত্রাসী অবৈধ পথে দেশে ফিরেছে আবার কেউ কেউ পালিয়েছে। কুষ্টিয়া সীমান্ত থেকে অত্যাধুনিক অস্ত্র ও স্যাটেলাইট ফোনসহ শীর্ষ সন্ত্রাসী মোল্লা মাসুদের গ্রেফতার হওয়া এর বড় প্রমাণ। ইমিগ্রেশন পুলিশের কাছে তথ্য না থাকায় এটা নিশ্চিত যে, এরা দুর্গম সীমান্ত পথকেই নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।বিশেষজ্ঞ মতামতঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিশেষজ্ঞ তৌহিদুল হক বলেন, "অপরাধ করে পার পাওয়া যাবে—এই মানসিকতা বন্ধ করতে হলে সীমান্ত নজরদারি শুধু বাড়ানো নয়, বরং নিশ্ছিদ্র করতে হবে। লাইনম্যানদের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে না পারলে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি থেকেই যাবে।"বর্তমানে বিজিবি ও পুলিশের সমন্বিত অভিযানে সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়েছে এবং সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারে অভিযান জোরদার করা হয়েছে।