সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
সোমবার, ১০ আগস্ট ২০২৬
কওমী টাইমস

মানবাধিকার

মহারাষ্ট্রে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদে কড়াকড়ির নীতি: প্রশাসনিক নজরদারির অজুহাতে সাংবিধানিক অধিকার হরণের আশঙ্কা

ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার স্কুল ও কলেজগুলোকে 'সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান' (Minority Educational Institution) হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রক্রিয়ায় আমূল পরিবর্তনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। একটি উচ্চপর্যায়ের সরকারি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এখন থেকে আবেদনের বহুধাপ যাচাইকরণ, একাধিক সরকারি দপ্তরের সরাসরি নজরদারি এবং অনুমোদন পাওয়ার পরও নিয়মিত পর্যালোচনার (Periodic Review) নিয়ম চালু করা হচ্ছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে সংক্ষিপ্ত সময়ে ৭৫টি প্রতিষ্ঠানকে সংখ্যালঘু মর্যাদা দেওয়া নিয়ে তৈরি হওয়া প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক বিতর্কের জের ধরে এই কড়াকড়ির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মানবাধিকার ও সংখ্যালঘু অধিকার রক্ষা কর্মীদের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতার অজুহাতে ভারতের সংবিধান প্রদত্ত ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘুদের শিক্ষা অধিকার এবং স্বায়ত্তশাসন সংকুচিত করার একটি অপচেষ্টা এতে দৃশ্যমান হচ্ছে।আবেদনের কড়াকড়ি ও নতুন এসওপি (SOP)মহারাষ্ট্রের তৎকালীন অতিরিক্ত মুখ্য সচিব বি. ভেণুগোপাল রেড্ডির নেতৃত্বে গঠিত পর্যালোচনা কমিটি বিদ্যমান সংখ্যালঘু মর্যাদা প্রদান ব্যবস্থার ফাঁকফোকর এবং সরকারের প্রশাসনিক তদারকির প্রয়োজনীয়তা পরীক্ষা করে একটি রিপোর্ট পেশ করে। সেই সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে রাজ্য সরকার একটি সংশোধিত 'স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর' (SOP) বা আদর্শ পরিচালন পদ্ধতি তৈরির জন্য আরেকটি বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করেছে।সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের শেষ নাগাদ এই নতুন নির্দেশিকা বা এসওপি আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করা হতে পারে। প্রস্তাবিত ব্যবস্থার অধীনে আবেদনকারীদের কেবল প্রাথমিক কাগজপত্র যাচাই করেই সনদ দেওয়া হবে না; বরং প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এটি পরিচালনাকারী ট্রাস্ট বা সোসাইটির আর্থিক ও প্রশাসনিক তথ্য আলাদাভাবে একাধিক সরকারি দপ্তর ও সিনিয়র আইএএস (IAS) পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দিয়ে পুনরায় যাচাই করানো হবে।প্রস্তাবিত ত্রি-স্তরীয় যাচাইকরণ প্রক্রিয়া: ১. আবেদন পূর্ববর্তী যাচাই (Pre-approval Scrutiny): একাধিক দপ্তরের মাধ্যমে মূল কাগজপত্র ও ট্রাস্টের সত্যতা নির্ধারণ। ২. অনুমোদন প্রক্রিয়া (Approval Stage): জ্যেষ্ঠ আইএএস কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ তদারকিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। ৩. অনুমোদন পরবর্তী নিয়মিত পর্যালোচনা (Post-approval Review): মর্যাদা পাওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি শর্তাবলী মেনে চলছে কিনা এবং তাদের মালিকানা বা ব্যবস্থাপনায় এমন কোনো পরিবর্তন এসেছে কিনা যা যোগ্যতা প্রভাবিত করে—তা সময় সময় পরিদর্শন করা।৭৫টি প্রতিষ্ঠানের দ্রুত অনুমোদন বিতর্কচলতি বছরের জানুয়ারি মাসে বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তড়িঘড়ি করে সংখ্যালঘু সনদ দেওয়াকে কেন্দ্র করে রাজ্যের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে বিতর্কের সৃষ্টি হয়, তার প্রেক্ষাপটেই নতুন এই ব্যবস্থার দাবি জোরদার হয়।গত ২৮ জানুয়ারি বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান মহারাষ্ট্রের তৎকালীন উপ-মুখ্যমন্ত্রী অজিত পাওয়ার, যিনি একই সাথে রাজ্যের সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রকের দায়িত্বেও ছিলেন। সরকারি রেকর্ড অনুযায়ী, অজিত পাওয়ারের মৃত্যুর পরপরই ২৮ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে রাজ্যের অন্তত ১৪টি জেলায় ৭৫টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে তড়িঘড়ি করে সংখ্যালঘু মর্যাদা প্রদান করা হয়।নথি পর্যালোচনা করে জানা যায়, ২৮ জানুয়ারি বিকেল ৩:০৯ মিনিটে প্রথম সার্টিফিকেটটিতে ডিজিটাল স্বাক্ষর করা হয়। ওই একই দিনে ৭টি প্রতিষ্ঠান এবং পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোকে সার্টিফিকেট দেওয়া হয়। মুম্বাই, পুনে, থানে, ইয়াভাতমাল, নাগপুর, চন্দ্রপুর, বুলদানা, লাতুরে, নাসিক, সাঙ্গলি ও রায়গড়সহ বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এসব প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনে প্রশাসনিক প্রটোকল লঙ্ঘিত হয়েছে কিনা—তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে বিরোধী দলগুলো। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একই ট্রাস্টের অধীনস্থ একাধিক স্কুলকে একটিমাত্র সনদের মাধ্যমেই সংখ্যালঘু স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল।বিষয়টি সামনে আসার পর মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবিস তাৎক্ষণিকভাবে সেই অনুমোদনগুলোর ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন এবং উচ্চপর্যায়ের তদন্তের নির্দেশ দেন। তদন্তে দেখা যায়, মন্ত্রালয় (রাজ্য সচিবালয়) পর্যায়ের একজনই নির্দিষ্ট কর্মকর্তার ডিজিটাল স্বাক্ষরে এই ৭৫টি অনুমোদন ইস্যু করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ওই বিভাগের ডেপুটি সেক্রেটারি মিলিন্দ পদ্মনাভ শেনয়কে পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। যদিও সংখ্যালঘু উন্নয়ন দপ্তর দাবি করেছে, পোর্টালের প্রযুক্তিগত জটিলতার কারণে ফাইল আটকে ছিল এবং পূর্বে সম্পাদিত অনুমোদনগুলো কেবল পোর্টাল থেকে একযোগে আপলোড করা হয়েছিল।সংবিধানে সংখ্যালঘু অধিকার ও শিক্ষার স্বাধীনতাভারতের সংবিধানের ৩০(১) অনুচ্ছেদ অনুসারে, ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়গুলোকে তাদের পছন্দ অনুযায়ী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনা করার মৌলিক অধিকার দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ন্যাশনাল কমিশন ফর মাইনরিটি এডুকেশনাল ইনস্টিটিউশনস অ্যাক্ট, ২০০৪-এর ২(জি) ধারা অনুযায়ী সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের আইনি কাঠামো সুরক্ষিত।সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদার কারণে এসব প্রতিষ্ঠান বেশ কিছু আইনি ও প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন ভোগ করে:ভর্তি প্রক্রিয়ায় স্বাধীনতা: তারা নিজেদের সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীদের অগ্রাধিকার দিতে পারে।শিক্ষক নিয়োগের নিজস্ব এখতিয়ার: সাধারণ সরকারি নিয়মের বাইরের কিছু প্রশাসনিক শিথিলতা পান তারা।আরটিই (RTE) কোটা থেকে অব্যাহতি: 'রাইট টু এডুকেশন' (RTE) আইনের অধীন সাধারণ বেসরকারি স্কুলগুলোর জন্য ২৫% আসন দরিদ্র ও পিছিয়ে পরা শিক্ষার্থীদের জন্য বিনামূল্যে বরাদ্দ রাখার যে বাধ্যবাধকতা থাকে, সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলো সেখান থেকে অব্যাহতি পায়।কিন্তু বিতর্ক দেখা দেওয়ার পর, ২০২৬ সালের মার্চ মাসে রাজ্য সরকার অন্তত ২০টি ট্রাস্টের অধীনস্থ স্কুলগুলোকে সাময়িকভাবে নির্দেশ দেয় যাতে তদন্ত চলাকালীন তারা নিজেদের শিশুদের আরটিই (RTE) ভর্তি ব্যবস্থার আওতায় আনে। ফলে তারা ২৫ শতাংশ আসনে সাধারণ পিছিয়ে পড়া শিশুদের ভর্তি নিতে বাধ্য হয়, যা সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানের আইনি সুরক্ষাকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল।পর্যবেক্ষণ ও সংখ্যালঘু অধিকারের ঝুঁকিমহারাষ্ট্র সরকারের দাবি—তারা সার্বিকভাবে সংখ্যালঘু ক্যাটাগরিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং শুধুমাত্র প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অপব্যবহার রোধে পদ্ধতিগত সংস্কার আনছে। তবে ভারতের বর্তমান সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, বিশেষ করে হিন্দুত্ববাদী সরকারের অধীনে এই ধরণের প্রশাসনিক কড়াকড়ির ফলে প্রকৃত সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলো ভয়াবহ হয়রানির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।সংবিধানের ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্যই ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রভাব থেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে রক্ষা করা। নতুন এসওপি-তে সরকারি কর্মকর্তাদের অবাধ পরিদর্শন ও তদারকির যে ক্ষমতা দেওয়া হচ্ছে, তা অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে স্বাধীন সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোনঠাসা করা এবং তাদের প্রশাসনিক স্বায়ত্তশাসন খর্ব করার পথ উন্মুক্ত করতে পারে। সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হবে কেবল ভুয়া অনিয়ম প্রতিরোধ করা নয়, বরং ভারতের সংবিধানসম্মত উপায়ে প্রকৃত সংখ্যালঘু প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকার অক্ষুণ্ণ রাখা।

মহারাষ্ট্রে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সনদে কড়াকড়ির নীতি: প্রশাসনিক নজরদারির অজুহাতে সাংবিধানিক অধিকার হরণের আশঙ্কা