শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

গুজরাটের হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় মুসলিমদের প্রবেশ ও ব্যবসায় নিষেধাজ্ঞার ভিডিও ভাইরাল; নাগরিক অধিকার নিয়ে গভীর উদ্বেগ

আহমেদাবাদে মুসলিম হকারকে উচ্ছেদ: ধর্মীয় পরিচয়ে কর্মসংস্থান রুদ্ধ করার অভিযোগ



আহমেদাবাদে মুসলিম হকারকে উচ্ছেদ: ধর্মীয় পরিচয়ে কর্মসংস্থান রুদ্ধ করার অভিযোগ

ভারতের গুজরাট অঙ্গরাজ্যের আহমেদাবাদে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এক মুসলিম হকারকে লাঞ্ছিত ও উচ্ছেদ করার ঘটনা ঘটেছে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কর্মীরা জনসমক্ষে ওই হকারের নাগরিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে এবং হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় কোনো মুসলিম কাজ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দেয়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ও নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্তরা এবং তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো এই কার্যক্রমকে এলাকার 'নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ' হিসেবে দাবি করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, গেরুয়া স্কার্ফ পরিহিত ব্যক্তিরা হকারদের পরিচয়পত্র দাবি করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, হিন্দু প্রধান এলাকায় বহিরাগত মুসলিমদের উপস্থিতি "অনিরাপদ" এবং "পুলিশ ভেরিফিকেশন" ছাড়া তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। রাজস্থানের অনুরূপ এক ঘটনায় এক উগ্রপন্থী ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, "তোমাদের যদি পরিচয়পত্র না থাকে, তবে আমরা জানব কীভাবে তোমরা কোথায় থাকো? কোনো সমস্যা হলে তোমাদের শনাক্ত করব কীভাবে?" তারা দাবি করছে, স্থানীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় হিন্দুদেরই ব্যবসা করা উচিত এবং এটি তাদের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

গত ৮ এপ্রিল গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের একটি হিন্দু-অধ্যুষিত কলোনিতে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শাহজাহান নামক এক মুসলিম রাস্তার হকার সেখানে ব্যবসা করার সময় বজরং দলের সাথে সংশ্লিষ্ট একদল উগ্রপন্থী ব্যক্তির বাধার সম্মুখীন হন। তারা তাকে ঘিরে ধরে আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) দেখতে চায়। যখন তিনি নিজের নাম 'শাহজাহান' বলে প্রকাশ করেন, তখন অভিযুক্তরা তাকে প্রশ্ন করে, "হিন্দু মহল্লায় তুমি কী করছ?"

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও ভাইরাল ভিডিও অনুসারে, শাহজাহানকে সাথে সাথে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয় যে, হিন্দু এলাকায় কোনো মুসলিম কাজ করতে পারবে না। শুধু শাহজাহান নন, ওই দলটি আরও কয়েকজন মুসলিম হকারকে একইভাবে হেনস্তা করে এলাকা ছাড়া করে। এই ধরনের ঘটনা ভারতে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। সম্প্রতি পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় এক মুসলিম ব্যান্ড বাদক এবং রাজস্থানে সালিম নামে এক শ্রমিককেও একই কায়দায় পরিচয়পত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও লাঞ্ছিত করার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে প্রান্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

ভারতের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের যেকোনো স্থানে যেকোনো বৈধ পেশা বা ব্যবসা পরিচালনা করার মৌলিক অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। আহমেদাবাদের এই ঘটনায় সংবিধানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস সংক্রান্ত প্রোটোকল অনুযায়ী, একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করা বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পূর্বেও ভারতের বিভিন্ন স্থানে 'মব রেগুলেশন' বা উগ্র জনতার আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ধরনের ঘটনা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


আহমেদাবাদে মুসলিম হকারকে উচ্ছেদ: ধর্মীয় পরিচয়ে কর্মসংস্থান রুদ্ধ করার অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ১৩ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের গুজরাট অঙ্গরাজ্যের আহমেদাবাদে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে এক মুসলিম হকারকে লাঞ্ছিত ও উচ্ছেদ করার ঘটনা ঘটেছে। উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর কর্মীরা জনসমক্ষে ওই হকারের নাগরিক পরিচয়পত্র পরীক্ষা করে এবং হিন্দু-অধ্যুষিত এলাকায় কোনো মুসলিম কাজ করতে পারবে না বলে হুঁশিয়ারি দেয়। এই ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশের ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামো ও নাগরিক সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ঘটনায় অভিযুক্তরা এবং তাদের সমর্থক গোষ্ঠীগুলো এই কার্যক্রমকে এলাকার 'নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ' হিসেবে দাবি করছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, গেরুয়া স্কার্ফ পরিহিত ব্যক্তিরা হকারদের পরিচয়পত্র দাবি করছেন। তাদের ভাষ্যমতে, হিন্দু প্রধান এলাকায় বহিরাগত মুসলিমদের উপস্থিতি "অনিরাপদ" এবং "পুলিশ ভেরিফিকেশন" ছাড়া তাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়া উচিত। রাজস্থানের অনুরূপ এক ঘটনায় এক উগ্রপন্থী ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, "তোমাদের যদি পরিচয়পত্র না থাকে, তবে আমরা জানব কীভাবে তোমরা কোথায় থাকো? কোনো সমস্যা হলে তোমাদের শনাক্ত করব কীভাবে?" তারা দাবি করছে, স্থানীয় নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা রক্ষার স্বার্থে শুধুমাত্র হিন্দুদের জন্য নির্দিষ্ট এলাকায় হিন্দুদেরই ব্যবসা করা উচিত এবং এটি তাদের অধিকারের অন্তর্ভুক্ত।

গত ৮ এপ্রিল গুজরাটের আহমেদাবাদ শহরের একটি হিন্দু-অধ্যুষিত কলোনিতে এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী শাহজাহান নামক এক মুসলিম রাস্তার হকার সেখানে ব্যবসা করার সময় বজরং দলের সাথে সংশ্লিষ্ট একদল উগ্রপন্থী ব্যক্তির বাধার সম্মুখীন হন। তারা তাকে ঘিরে ধরে আধার কার্ড (জাতীয় পরিচয়পত্র) দেখতে চায়। যখন তিনি নিজের নাম 'শাহজাহান' বলে প্রকাশ করেন, তখন অভিযুক্তরা তাকে প্রশ্ন করে, "হিন্দু মহল্লায় তুমি কী করছ?"

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য ও ভাইরাল ভিডিও অনুসারে, শাহজাহানকে সাথে সাথে এলাকা থেকে বের করে দেওয়া হয় এবং কঠোর সতর্কবার্তা দেওয়া হয় যে, হিন্দু এলাকায় কোনো মুসলিম কাজ করতে পারবে না। শুধু শাহজাহান নন, ওই দলটি আরও কয়েকজন মুসলিম হকারকে একইভাবে হেনস্তা করে এলাকা ছাড়া করে। এই ধরনের ঘটনা ভারতে বিচ্ছিন্ন কোনো বিষয় নয়। সম্প্রতি পাঞ্জাবের লুধিয়ানায় এক মুসলিম ব্যান্ড বাদক এবং রাজস্থানে সালিম নামে এক শ্রমিককেও একই কায়দায় পরিচয়পত্র নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ ও লাঞ্ছিত করার খবর পাওয়া গেছে। এর ফলে প্রান্তিক মুসলিম জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভীতি ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে দিনাতিপাত করছে।

ভারতের সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ধর্ম, বর্ণ বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের সাথে বৈষম্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ভারতের যেকোনো স্থানে যেকোনো বৈধ পেশা বা ব্যবসা পরিচালনা করার মৌলিক অধিকার প্রতিটি নাগরিকের রয়েছে। আহমেদাবাদের এই ঘটনায় সংবিধানের এই গুরুত্বপূর্ণ ধারাগুলো লঙ্ঘন করা হয়েছে বলে মনে করছেন মানবাধিকার কর্মীরা।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও জাতিসংঘের সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইটস সংক্রান্ত প্রোটোকল অনুযায়ী, একজন মানুষের ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে তার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বাধাগ্রস্ত করা বড় ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘন। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ও হিউম্যান রাইটস ওয়াচ পূর্বেও ভারতের বিভিন্ন স্থানে 'মব রেগুলেশন' বা উগ্র জনতার আইন হাতে তুলে নেওয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এই ধরনের ঘটনা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের নীরবতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত