বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

মুসলিম ও ইহুদি সেজে দাঙ্গা বাঁধানোর চাঞ্চল্যকর তথ্য ফাঁস

লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার: বীর নাকি ষড়যন্ত্রকারী, গোপন ফাইল প্রকাশ করল তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার: বীর নাকি ষড়যন্ত্রকারী, গোপন ফাইল প্রকাশ করল তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান খিলাফতের পতনে ভূমিকা রাখা ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স—যিনি ‘লরেন্স অব আরাবিয়া’ নামে পরিচিত—তাঁর গোপন কার্যকলাপ নিয়ে চাঞ্চল্যকর নথি প্রকাশ করেছে তুরস্ক।

তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (MIT) প্রকাশিত এই দলিল ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায় সামনে এনেছে।

নথিতে লরেন্সের একাধিক ছদ্মপরিচয়, ধর্মীয় ভান এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠে এসেছে।

এই প্রকাশনাকে গোয়েন্দা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা MIT প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক আর্কাইভ নথি প্রকাশ করেছে। ১৯২৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রস্তুত করা এই দলিলটি এতদিন গোপন ছিল এবং সম্প্রতি MIT-এর সরকারি ওয়েবসাইটে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

নথিটি মূলত তৎকালীন ন্যাশনাল সিকিউরিটি সার্ভিসের ডিরেক্টরেট প্রস্তুত করেছিল এবং তা তুরস্কের জেনারেল স্টাফ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল। এতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আরব অঞ্চলে লরেন্সের কর্মকাণ্ড বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

দলিল অনুযায়ী, লরেন্স নিয়মিতভাবে পোশাক, নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করতেন। তিনি কখনো নিজেকে মুসলিম, কখনো ইহুদি হিসেবে পরিচয় দিতেন—উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা।

রিপোর্টে বলা হয়, মিশরে তিনি “শেখ আবদুল্লাহ” ছদ্মনামে কিছু সময় অবস্থান করেন। পরে সিরিয়া ও ইরাক ঘুরে হঠাৎ করে জেরুজালেমে হাজির হন এবং শেষ পর্যন্ত সুদানের খার্তুমে চলে যান।

জেরুজালেমে অবস্থানকালে লরেন্স কখনো মুসলিম ধর্মীয় শিক্ষক, আবার কখনো ইহুদি রাব্বির ছদ্মবেশ নেন। ইহুদি পরিচয়ে তিনি “ইয়াকোস ইস্কিনাজি” নাম ব্যবহার করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তিনি মুসলিম ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ মহলে প্রবেশ করে আলাদা আলাদা বৈঠক করতেন।

নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়, লরেন্স জেরুজালেমের আল-বুরাক প্রাচীর (পশ্চিম প্রাচীর) কেন্দ্র করে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা উসকে দিতে “উসকানিমূলক বার্তা” পৌঁছে দিতেন। এই কর্মকাণ্ডকে অটোমান যুগের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছিল, যার প্রমাণ হিসেবে নথির সঙ্গে লরেন্সের সামরিক পোশাক পরিহিত একটি ছবিও সংযুক্ত রয়েছে।

ডকুমেন্টে অটোমান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণও অন্তর্ভুক্ত আছে, যেখানে মিশর, ফিলিস্তিন ও সুদানে ব্রিটিশ নীতিকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে সুদানকে মিশরের সঙ্গে সংযোগ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৮৮৮ সালে ওয়েলসে জন্ম নেওয়া লরেন্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরব বিদ্রোহ (১৯১৬–১৮)-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শরীফ হুসাইনের পুত্র এমির ফয়সাল (ফয়সাল প্রথম)-এর সঙ্গে কাজ করে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহে উৎসাহ দেন। যুদ্ধের পর মার্কিন সাংবাদিক লোয়েল থমাস তাঁর কর্মকাণ্ডকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করে তাঁকে বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তিতে পরিণত করেন।

পশ্চিমা বিশ্বে তিনি বীর ও কৌশলী চরিত্র হিসেবে প্রশংসিত হলেও, মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতে লরেন্স ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রতীক। বহু শতাব্দী ধরে অটোমান খিলাফতের অধীনে থাকা বিলাদুশ শাম, আরব উপদ্বীপ ও হিজাজ অঞ্চল প্রথমবারের মতো জাতীয় সীমান্ত ও বিভাজনের মুখোমুখি হয়—যার প্রভাব আজও মুসলিম বিশ্ব বহন করছে।

MIT জানিয়েছে, এই নথি প্রকাশ তাদের ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে নির্বাচিত ঐতিহাসিক গোয়েন্দা দলিল জনসম্মুখে আনার উদ্যোগের অংশ।

বিষয় : তুরস্ক ব্রিটিশ গোয়েন্দা MIT

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


লরেন্স অব অ্যারাবিয়ার: বীর নাকি ষড়যন্ত্রকারী, গোপন ফাইল প্রকাশ করল তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা

প্রকাশের তারিখ : ০৭ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অটোমান খিলাফতের পতনে ভূমিকা রাখা ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স—যিনি ‘লরেন্স অব আরাবিয়া’ নামে পরিচিত—তাঁর গোপন কার্যকলাপ নিয়ে চাঞ্চল্যকর নথি প্রকাশ করেছে তুরস্ক।

তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা (MIT) প্রকাশিত এই দলিল ইতিহাসের বহু অজানা অধ্যায় সামনে এনেছে।

নথিতে লরেন্সের একাধিক ছদ্মপরিচয়, ধর্মীয় ভান এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা সৃষ্টির অভিযোগ উঠে এসেছে।

এই প্রকাশনাকে গোয়েন্দা ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তুরস্কের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা MIT প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন ব্রিটিশ গোয়েন্দা কর্মকর্তা থমাস এডওয়ার্ড লরেন্স সংক্রান্ত একটি ঐতিহাসিক আর্কাইভ নথি প্রকাশ করেছে। ১৯২৯ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর তারিখে প্রস্তুত করা এই দলিলটি এতদিন গোপন ছিল এবং সম্প্রতি MIT-এর সরকারি ওয়েবসাইটে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়।

নথিটি মূলত তৎকালীন ন্যাশনাল সিকিউরিটি সার্ভিসের ডিরেক্টরেট প্রস্তুত করেছিল এবং তা তুরস্কের জেনারেল স্টাফ ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হয়েছিল। এতে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে আরব অঞ্চলে লরেন্সের কর্মকাণ্ড বিস্তারিতভাবে লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

দলিল অনুযায়ী, লরেন্স নিয়মিতভাবে পোশাক, নাম ও পরিচয় পরিবর্তন করতেন। তিনি কখনো নিজেকে মুসলিম, কখনো ইহুদি হিসেবে পরিচয় দিতেন—উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক গোষ্ঠীতে অনুপ্রবেশ করে উত্তেজনা সৃষ্টি করা।

রিপোর্টে বলা হয়, মিশরে তিনি “শেখ আবদুল্লাহ” ছদ্মনামে কিছু সময় অবস্থান করেন। পরে সিরিয়া ও ইরাক ঘুরে হঠাৎ করে জেরুজালেমে হাজির হন এবং শেষ পর্যন্ত সুদানের খার্তুমে চলে যান।

জেরুজালেমে অবস্থানকালে লরেন্স কখনো মুসলিম ধর্মীয় শিক্ষক, আবার কখনো ইহুদি রাব্বির ছদ্মবেশ নেন। ইহুদি পরিচয়ে তিনি “ইয়াকোস ইস্কিনাজি” নাম ব্যবহার করেন বলে নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তিনি মুসলিম ও ইহুদি—উভয় সম্প্রদায়ের অভ্যন্তরীণ মহলে প্রবেশ করে আলাদা আলাদা বৈঠক করতেন।

নথিতে আরও অভিযোগ করা হয়, লরেন্স জেরুজালেমের আল-বুরাক প্রাচীর (পশ্চিম প্রাচীর) কেন্দ্র করে উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে উত্তেজনা উসকে দিতে “উসকানিমূলক বার্তা” পৌঁছে দিতেন। এই কর্মকাণ্ডকে অটোমান যুগের নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখেছিল, যার প্রমাণ হিসেবে নথির সঙ্গে লরেন্সের সামরিক পোশাক পরিহিত একটি ছবিও সংযুক্ত রয়েছে।

ডকুমেন্টে অটোমান গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বিশ্লেষণও অন্তর্ভুক্ত আছে, যেখানে মিশর, ফিলিস্তিন ও সুদানে ব্রিটিশ নীতিকে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিশেষ করে সুদানকে মিশরের সঙ্গে সংযোগ এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কর্মকর্তাদের উপস্থিতির কারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

১৮৮৮ সালে ওয়েলসে জন্ম নেওয়া লরেন্স প্রথম বিশ্বযুদ্ধে আরব বিদ্রোহ (১৯১৬–১৮)-এ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি শরীফ হুসাইনের পুত্র এমির ফয়সাল (ফয়সাল প্রথম)-এর সঙ্গে কাজ করে অটোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহে উৎসাহ দেন। যুদ্ধের পর মার্কিন সাংবাদিক লোয়েল থমাস তাঁর কর্মকাণ্ডকে রোমান্টিকভাবে উপস্থাপন করে তাঁকে বিশ্বজুড়ে কিংবদন্তিতে পরিণত করেন।

পশ্চিমা বিশ্বে তিনি বীর ও কৌশলী চরিত্র হিসেবে প্রশংসিত হলেও, মুসলিম বিশ্বের দৃষ্টিতে লরেন্স ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের প্রতীক। বহু শতাব্দী ধরে অটোমান খিলাফতের অধীনে থাকা বিলাদুশ শাম, আরব উপদ্বীপ ও হিজাজ অঞ্চল প্রথমবারের মতো জাতীয় সীমান্ত ও বিভাজনের মুখোমুখি হয়—যার প্রভাব আজও মুসলিম বিশ্ব বহন করছে।

MIT জানিয়েছে, এই নথি প্রকাশ তাদের ডিজিটাল আর্কাইভের মাধ্যমে নির্বাচিত ঐতিহাসিক গোয়েন্দা দলিল জনসম্মুখে আনার উদ্যোগের অংশ।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত