সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
কওমী টাইমস

বিয়েসহ সব সামাজিক অনুষ্ঠানে গানবাজনা নিষিদ্ধের নোটিশ; প্রশাসনের ডাকে মসজিদ কমিটির ভুল স্বীকার

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘গানবাজনা হারাম’ ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া



চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘গানবাজনা হারাম’ ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া
গানবাজনা হারাম ঘোষণা করে মসজিদ কমিটির জারি করা নোটিশ

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামের জামে মসজিদ কমিটি ‘সমাজ সংস্কার’-এর যুক্তি দেখিয়ে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হারাম ঘোষণা করায় এলাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে জারি করা ওই নোটিশে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে গানবাজনা নিষিদ্ধ করা হয়। বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে এবং মসজিদ কমিটিকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে একটি জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে গ্রামবাসীর এক সভায় ‘গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে একটি নোটিশ জারি করা হয়।

নোটিশে বলা হয়, গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে গণসম্মতির ভিত্তিতে প্রকাশ্যে উচ্চশব্দে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক, বিদ’আত ও অপসংস্কৃতি হিসেবে বিবেচিত এসব কার্যক্রম থেকে গ্রামবাসীকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

নোটিশে মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষে মোট ৩৪ জন স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে এ বিষয়ে ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়। নোটিশ জারির পর থেকে গ্রামটিতে সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গানবাজনা বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

গ্রামবাসীর একাংশের দাবি, নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালাদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এমনকি কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা হলে সেখানে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়াতে স্থানীয় আলেমরা যাবেন না—এমন সিদ্ধান্তও প্রচার করা হয়।

এতে গ্রামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গ্রামের প্রবীণদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও তরুণ ও নারীদের একটি অংশ এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কয়েকজন নারী জানান, বিয়েবাড়িতে গীত গাওয়া বা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক আনন্দ–উৎসবের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, তার দোকানে টেলিভিশন থাকলেও এখন আর গান বাজানো হয় না; শুধু খবর বা ধর্মীয় আলোচনা শোনা হয়। অন্যদিকে গ্রামের কিছু কিশোর–তরুণের অভিযোগ, আগে তারা পিকনিক বা ছোটখাটো আয়োজনে গান বাজিয়ে আনন্দ করত, কিন্তু বর্তমানে সেটিও বন্ধ রয়েছে।

এদিকে বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। স্থানীয় পুলিশ গ্রামে গিয়ে ‘গানবাজনা হারাম’ বা নিষিদ্ধ লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিশ জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা Maruf Afzal Rajon জানান, ঘটনাটি জানার পর মসজিদ কমিটির সদস্যদের তার দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে কয়েকজন প্রতিনিধি এসে জানান, তারা বিষয়টি না বুঝে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তারা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

ইউএনও আরও জানান, মসজিদ কমিটি সভা করে লিখিতভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পাশাপাশি তাদের ভুল স্বীকার করে তা উপজেলা প্রশাসনের দপ্তরে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে ওই মসজিদের ইমাম আবদুল মালিক বিন খালেদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সরাসরি তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একবার ফোনে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানালেও পরবর্তীতে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

গ্রামের কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জানান, বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান মানুষের আনন্দ–উৎসবের অংশ। তাই এসব বিষয়ে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বৃহত্তর সামাজিক মতামত ও আইনগত দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা সামাজিক সম্প্রীতিতে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।

বিষয় : যুবসমাজ প্রশাসন ধর্মীয় বিষয় চাঁপাইনবাবগঞ্জ গ্রামসমাজ

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬


চাঁপাইনবাবগঞ্জে ‘গানবাজনা হারাম’ ঘোষণা ঘিরে বিতর্ক, প্রশাসনের হস্তক্ষেপে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের প্রক্রিয়া

প্রকাশের তারিখ : ০৭ মার্চ ২০২৬

featured Image

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার একটি গ্রামের জামে মসজিদ কমিটি ‘সমাজ সংস্কার’-এর যুক্তি দেখিয়ে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো হারাম ঘোষণা করায় এলাকায় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় দুই মাস আগে জারি করা ওই নোটিশে বিয়ের অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন সামাজিক আয়োজনে গানবাজনা নিষিদ্ধ করা হয়। বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন হস্তক্ষেপ করে এবং মসজিদ কমিটিকে সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের নির্দেশ দেয়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার ইসলামপুর ইউনিয়নের তেররশিয়া পোড়াগ্রামে একটি জামে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র নিষিদ্ধ ঘোষণা করা নিয়ে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা ও মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে গ্রামবাসীর এক সভায় ‘গানবাজনা বা বাদ্যযন্ত্রমুক্ত সমাজ গঠনের সিদ্ধান্ত’ শিরোনামে একটি নোটিশ জারি করা হয়।

নোটিশে বলা হয়, গ্রামের পরিবেশ, যুবসমাজের নৈতিকতা এবং পারিবারিক শান্তি রক্ষার স্বার্থে গণসম্মতির ভিত্তিতে প্রকাশ্যে উচ্চশব্দে গানবাজনা ও বাদ্যযন্ত্র বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। সেখানে আরও উল্লেখ করা হয়, ইসলামের দৃষ্টিতে শিরক, বিদ’আত ও অপসংস্কৃতি হিসেবে বিবেচিত এসব কার্যক্রম থেকে গ্রামবাসীকে বিরত থাকার আহ্বান জানানো হচ্ছে।

নোটিশে মসজিদ কমিটির সদস্য ও গ্রামবাসীর পক্ষে মোট ৩৪ জন স্বাক্ষর করেন। পাশাপাশি গ্রামের বিভিন্ন মোড়ে এ বিষয়ে ব্যানার ও ফেস্টুন টানানো হয়। নোটিশ জারির পর থেকে গ্রামটিতে সামাজিক অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গানবাজনা বন্ধ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানান।

গ্রামবাসীর একাংশের দাবি, নিষেধাজ্ঞার আওতায় শুধু বিয়ের অনুষ্ঠান নয়, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এবং ভ্রাম্যমাণ ফেরিওয়ালাদের ক্ষেত্রেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। এমনকি কোনো বিয়ের অনুষ্ঠানে গানবাজনা হলে সেখানে ধর্মীয় রীতিতে বিয়ে পড়াতে স্থানীয় আলেমরা যাবেন না—এমন সিদ্ধান্তও প্রচার করা হয়।

এতে গ্রামে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। গ্রামের প্রবীণদের একটি অংশ এ সিদ্ধান্তকে সমর্থন জানালেও তরুণ ও নারীদের একটি অংশ এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেন। কয়েকজন নারী জানান, বিয়েবাড়িতে গীত গাওয়া বা সাউন্ডবক্সে গান বাজানো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে স্বাভাবিক আনন্দ–উৎসবের পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

স্থানীয় এক দোকানদার বলেন, তার দোকানে টেলিভিশন থাকলেও এখন আর গান বাজানো হয় না; শুধু খবর বা ধর্মীয় আলোচনা শোনা হয়। অন্যদিকে গ্রামের কিছু কিশোর–তরুণের অভিযোগ, আগে তারা পিকনিক বা ছোটখাটো আয়োজনে গান বাজিয়ে আনন্দ করত, কিন্তু বর্তমানে সেটিও বন্ধ রয়েছে।

এদিকে বিষয়টি সম্প্রতি প্রকাশ্যে এলে প্রশাসন নড়েচড়ে বসে। স্থানীয় পুলিশ গ্রামে গিয়ে ‘গানবাজনা হারাম’ বা নিষিদ্ধ লেখা ব্যানার, ফেস্টুন ও নোটিশ জব্দ করে থানায় নিয়ে যায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা Maruf Afzal Rajon জানান, ঘটনাটি জানার পর মসজিদ কমিটির সদস্যদের তার দপ্তরে ডেকে পাঠানো হয়। গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মসজিদের ইমামের নেতৃত্বে কয়েকজন প্রতিনিধি এসে জানান, তারা বিষয়টি না বুঝে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। পরে তারা ভুল স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।

ইউএনও আরও জানান, মসজিদ কমিটি সভা করে লিখিতভাবে গানবাজনা নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পাশাপাশি তাদের ভুল স্বীকার করে তা উপজেলা প্রশাসনের দপ্তরে জমা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।

অন্যদিকে ওই মসজিদের ইমাম আবদুল মালিক বিন খালেদুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সরাসরি তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একবার ফোনে তিনি পরে কথা বলবেন বলে জানালেও পরবর্তীতে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

গ্রামের কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি জানান, বিয়ে বা সামাজিক অনুষ্ঠান মানুষের আনন্দ–উৎসবের অংশ। তাই এসব বিষয়ে একতরফা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে তা সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। তাদের মতে, এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে বৃহত্তর সামাজিক মতামত ও আইনগত দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।

স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো সিদ্ধান্ত যাতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বা সামাজিক সম্প্রীতিতে প্রভাব না ফেলে, সে বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত