বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৬ জুলাই ২০২৬
কওমী টাইমস

ভণ্ড নবী আল-মুকান্না: খোরাসানের সেই মায়াবী চাঁদ ও এক পাপিষ্ঠের করুণ পরিণতি

আব্বাসীয় খিলাফতের স্বর্ণযুগে মাওরাউন্নাহার অঞ্চলে এক ভয়াবহ ফিতনার আবির্ভাব ঘটেছিল। হাশিম বিন হাকিম নামের এক ব্যক্তি, যাকে ইতিহাস 'আল-মুকান্না' বা 'মুখোশধারী ভণ্ড নবী' হিসেবে চেনে, নিজেকে খোদা দাবি করে বসে। জাদুটোনা, রসায়নবিদ্যা (Alchemy) এবং উগ্র পারসিক জাতীয়তাবাদের অপব্যবহার করে সে তৎকালীন সরলমনা মানুষকে বিভ্রান্ত করেছিল। ইসলামের বিরুদ্ধে তার এই চরম ঔদ্ধত্য এবং পরবর্তীতে আব্বাসীয় খিলাফতের কঠোর অভিযানে তার পতন ও করুণ আত্মহননের ইতিহাস আজকের মুসলিম উম্মাহর জন্য এক বড় শিক্ষণীয় অধ্যায়।ষড়যন্ত্রের নেপথ্য ও উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষবাষ্পউমাইয়া এবং প্রাথমিক আব্বাসীয় যুগে আবূ মুসলিম খোরাসানীর আন্দোলনের পর কিছু উগ্রপন্থী দল ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের ওপর আঘাত হানার চেষ্টা করে। আল-মুকান্না মূলত আবূ মুসলিমের মৃত্যুর প্রতিশোধ এবং ইসলাম-পূর্ব মাজদাক ও জরথুস্ত্রীয় মতবাদকে পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে।সে তার অনুসারীদের শ্বেতশুভ্র পোশাক পরার নির্দেশ দেয়, যার কারণে তাদের 'মুবাইয়িজা' বা শ্বেতবসনধারী বলা হতো। আব্বাসীয়দের কালো পতাকার বিপরীতে তারা সাদা পোশাক বেছে নিয়েছিল রাজনৈতিক ও আদর্শিক বিরোধিতার প্রতীক হিসেবে। তার মূল এজেন্ডা ছিল আরবে গড়ে ওঠা খিলাফতের শাসন উপড়ে ফেলে মুসলিমদের মাওরাউন্নাহার থেকে বিতাড়িত করা।মায়াবী চাঁদ ও অলৌকিকত্বের জালিয়াতিআল-মুকান্না রসায়ন এবং পদার্থবিদ্যায় পারদর্শী ছিল। সে মানুষের ঈমান হরণ করতে জাদুটোনার আশ্রয় নেয়। তার সবচেয়ে বড় জালিয়াতি ছিল 'নাখশাব অঞ্চলের কুয়ায় চাঁদ তৈরি করা'।ঐতিহাসিক তথ্যমতে, সে পারদ এবং কিছু রাসায়নিক উপাদানের মিশ্রণে একটি কুয়ার ভেতর এমন এক প্রতিচ্ছবি তৈরি করে, যা প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূর থেকেও চাঁদের মতো উজ্জ্বল দেখাত। পারস্যের কবি নিজামী ও খাকানী তাদের কাব্যে এই ছদ্ম-চাঁদের রূপক ব্যবহার করেছেন।সে নিজেকে ঈশ্বরের অবতার দাবি করত এবং সবসময় মুখে একটা সোনার মুখোশ বা সবুজ কাপড়ের পর্দা পরে থাকত। সে তার অনুসারীদের বলত, "আমার আসল চেহারা যদি তোমরা দেখো, তবে সূর্যের তীব্রতায় যেমন চোখ অন্ধ হয়ে যায়, তেমনি তোমরাও ভস্ম হয়ে যাবে।" মূলত নিজের কুৎসিত চেহারা লুকাতে এবং মানুষের মনে কৃত্রিম ভয় ও ভক্তি তৈরি করতেই সে এই মুখোশ ব্যবহার করত।তুর্কি হাকানের জোট এবং মুসলিম জনপদে নৃশংসতানিজের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে আল-মুকান্না তুর্কি হাকান হালুক খানের সঙ্গে জোট বাঁধে। যুদ্ধের খরচ ও সমর্থনের বিনিময়ে সে তুর্কি সেনাদের মুসলিম গ্রামগুলোতে লুটপাট ও নৃশংসতা চালানোর অবাধ অনুমতি দেয়। সমরকন্দের মতো সমৃদ্ধ মুসলিম নগরীগুলোতে তার বাহিনী তাণ্ডব চালায়। এই নির্মম অত্যাচার দেখে স্থানীয় সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে যে, সে কোনো মুক্তিদাতা নয়, বরং এক চরম অত্যাচারী। ফলে ধীরে ধীরে তার অনুসারীরা তাকে ত্যাগ করতে শুরু করে।সীনাম দুর্গের পতন ও এক পাপিষ্ঠের করুণ বিদায়আব্বাসীয় খলিফা আল-মাহদীর নির্দেশে এক বিশাল মুসলিম বাহিনী আল-মুকান্নার মূল ঘাঁটি—হিসার পর্বতের সীনাম দুর্গে অবরোধ গড়ে তোলে। দীর্ঘ অবরোধের মুখে যখন পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে, তখন এই ভণ্ড খোদাদ্রোহী এক চরম নৃশংস পথ বেছে নেয়।ঐতিহাসিক তাবারী ও নেরশাহী (যিনি ওই অঞ্চলের প্রত্যক্ষদর্শীদের থেকে বর্ণনা সংগ্রহ করেছেন) উল্লেখ করেন যে, দুর্গের পতন নিশ্চিত দেখে আল-মুকান্না প্রথমে তার প্রাসাদের ১০০ জন দাসীকে বিষাক্ত মদ খাইয়ে হত্যা করে। এরপর তার একমাত্র বিশ্বস্ত গোলাম তাদরানকে গলা কেটে হত্যা করে। সবশেষে, নিজের অস্তিত্বের কোনো চিহ্ন যেন দুনিয়াতে না থাকে, সেজন্য সে অ্যাসিড ও রাসায়নিক উপাদানে পূর্ণ এক বিশাল জ্বলন্ত চুল্লির (তন্দুর) ভেতর ঝাঁপ দিয়ে আত্মহুতি দেয়। আগুনে পুড়ে ও অ্যাসিডে গলে তার পুরো শরীর কয়লা হয়ে যায়, কেবল চুল্লির ওপর ভেসে ছিল তার কিছু চুল।তার এই অদৃশ্য হয়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে তার অন্ধ ভক্তরা প্রচার করতে থাকে যে সে আকাশে চলে গেছে এবং আবার ফিরে আসবে। কিন্তু ইসলামের সত্যের আলোর সামনে এই ভণ্ড নবীর মায়াবী চাঁদ চিরতরে হারিয়ে যায়। আজকের দিনেও ইসলামের ছদ্মবেশে আসা যেকোনো ফিতনা ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে এই ইতিহাস মুসলিম উম্মাহকে সতর্ক থাকার শিক্ষা দেয়।

ভণ্ড নবী আল-মুকান্না: খোরাসানের সেই মায়াবী চাঁদ ও এক পাপিষ্ঠের করুণ পরিণতি