কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারে ২০৩০ সালের মধ্যে চরম বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) প্রযুক্তির কার্যক্ষমতা যত বাড়বে, পরিবেশের ওপর এর ক্ষতিকর প্রভাব তত কমবে—এমন প্রচলিত ধারণাকে সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণ করেছে জাতিসংঘের একটি নতুন পরিবেশগত প্রতিবেদন। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক এই রিপোর্টে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ও ডেটা সেন্টারগুলোর অতিরিক্ত সম্পদ ব্যবহারের ফলে বিশ্বজুড়ে এক ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয় নেমে আসতে পারে।জাতিসংঘের সর্বশেষ পরিবেশ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পরিবেশগত মূল্য দিন দিন আকাশচুম্বী হচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতিবিদ্যার বিখ্যাত "জেভনসের প্যারাডক্স" দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। এই নীতি অনুযায়ী, কোনো সম্পদের ব্যবহারিক দক্ষতা যত বাড়ে, তার উৎপাদন খরচ তত কমে; আর খরচ কমে যাওয়ার কারণে সম্পদটির ব্যবহার না কমে বরং বিশ্বব্যাপী এর চাহিদা ও সামগ্রিক ভোগ জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পায়। সহজ কথায়, এআই প্রযুক্তি যত সস্তা ও আকর্ষণীয় হচ্ছে, এর ব্যবহারের পরিধি তত বাড়ছে, যা প্রযুক্তির দক্ষতা থেকে অর্জিত সমস্ত পরিবেশগত সাশ্রয়কে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।২০৩০ সালের মধ্যে বিশাল সম্পদের অপচয়জাতিসংঘের এই প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নিকট ভবিষ্যতে বিশ্বের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর এআই ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করবে। প্রাপ্ত উপাত্ত অনুসারে, ২০৩০ সালের মধ্যে এআই-এর জ্বালানি বা বিদ্যুৎ ব্যবহার বর্তমানের চেয়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যা বিশ্বের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের প্রায় ৩ শতাংশ গ্রাস করবে।এই বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে যে কার্বন নিঃসরণ হবে, তা সমগ্র যুক্তরাজ্যের মোট কার্বন ইমিশনের সমান। আরও আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, এআই-এর মূল চালিকাশক্তি অর্থাৎ ডেটা সেন্টারগুলোকে ঠান্ডা রাখার জন্য যে পরিমাণ পানি ব্যবহার করা হবে, তা সমগ্র বিশ্ববাসীর বার্ষিক সুপেয় বা পানীয় জলের মোট চাহিদাকে ছাড়িয়ে যাবে।কেবল বিগত বছরের হিসাব টানলে দেখা যায়, বিশ্বের ডেটা সেন্টারগুলো এককভাবে সৌদি আরবের মোট উৎপাদিত বিদ্যুতের সমান বিদ্যুৎ ব্যবহার করেছে। ২০৩০ সালের এই সম্ভাব্য ক্ষতিকে পুষিয়ে নিতে অন্তত ১০ বছর ধরে বড় হওয়া ৬.৭ বিলিয়ন গাছের বনায়ন এবং পুরো মেক্সিকো দেশের চেয়ে প্রায় দশ গুণ বড় ভূমির প্রয়োজন হবে।বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও পরিবেশগত বৈষম্যরিপোর্টে এআই বিপ্লবের পেছনের কাঠামোগত ও পরিবেশগত বৈষম্যের তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বে মাত্র ৩২টি দেশের কাছে এআই পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষ ক্লাউড অবকাঠামো রয়েছে এবং এই ক্ষমতার প্রায় ৯০ শতাংশই এককভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের নিয়ন্ত্রণে।এর ফলে যারা এই এআই সিস্টেম তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করছে, আর যারা কেবল এর ভোক্তা—এই দুই পক্ষের মধ্যে ডিজিটাল ব্যবধান আরও প্রকট হচ্ছে। সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হলো, অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলো কেবল এই প্রযুক্তির ভোক্তা হওয়া সত্ত্বেও, এআই-এর জন্য প্রয়োজনীয় খনিজ নিষ্কাশন এবং ক্ষতিকর ইলেকট্রনিক বর্জ্যের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ও বিষাক্ত ধকলের সিংহভাগ এককভাবে বহন করতে বাধ্য হচ্ছে।টেকসই এআই গঠনে কৌশলী পরিবর্তনের তাগিদটেক্সট ও কোড জেনারেট করা থেকে শুরু করে জটিল ভিডিও প্রসেসিং পর্যন্ত প্রতিটি কাজ সম্পাদনে ভিন্ন ভিন্ন মাত্রার কম্পিউটিং পাওয়ারের প্রয়োজন হয়, যা ভিন্ন ভিন্ন মাত্রায় পরিবেশের ক্ষতি করে। এই বিপর্যয় রুখতে জাতিসংঘ খনিজ সম্পদ উত্তোলন থেকে শুরু করে বর্জ্য পুনর্ব্যবহার পর্যন্ত পুরো সাপ্লাই চেইনে একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসন কাঠামো গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছে। অস্ট্রেলিয়া বা নিউজিল্যান্ডের মতো দেশগুলো সরকারি সেবা তরান্বিত করতে এআই নীতিমালায় যে শিথিল তদারকি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে, তা পরিবেশের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতিকে আড়াল করছে বলে প্রতিবেদনে হুঁশিয়ার করা হয়। বিশেষজ্ঞরা তাই অবিলম্বে এআই উদ্ভাবন পরিকল্পনাগুলো পুনর্বিবেচনা করে জলবায়ু এবং বৈশ্বিক শক্তি পরিকল্পনার সঙ্গে একে অন্তর্ভুক্ত করার জরুরি তাগিদ দিয়েছেন।বিগত কয়েক বছরে চ্যাটজিপিটি, মিডজার্নি বা সোরার মতো টেক্সট, ইমেজ ও ভিডিও জেনারেটিভ এআই মডেলগুলোর জনপ্রিয়তা বিশ্বজুড়ে ডেটা সেন্টারের চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণ সার্চ ইঞ্জিনের তুলনায় এআই কোয়েরিতে কয়েক গুণ বেশি কম্পিউটিং পাওয়ার এবং পানি (শীতলীকরণের জন্য) প্রয়োজন হয়, যা পূর্ববর্তী জলবায়ু চুক্তির লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে হুমকির মুখে ফেলেছে।কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিঃসন্দেহে মানবসভ্যতার জন্য একটি বড় মাইলফলক, কিন্তু তার মূল্য যদি পৃথিবীর অস্তিত্ব দিয়ে শোধ করতে হয়, তবে তা হবে আত্মঘাতী। প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের পাশাপাশি পরিবেশগত টেকসই উন্নয়নকে প্রাধান্য দিয়ে বিশ্বনেতাদের এখনই কঠোর আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামো তৈরি করা উচিত।