মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মঙ্গলবার, ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
কওমী টাইমস

ইসরায়েলের ‘ব্ল্যাক বক্স’: গুপ্তচরবৃত্তি কীভাবে প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে

প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিরাপত্তা ব্যর্থতা সাধারণত প্রকাশ্যে আসে না। কোনো অভিযান ব্যর্থ হলে, কোনো নেটওয়ার্ক ধরা পড়লে কিংবা বহু বছরের আস্থার সম্পর্ক শত্রুপক্ষের কাছে পৌঁছে গেলে এর প্রকৃত কারণ স্পষ্ট হতে শুরু করে। ফিলিস্তিনি ও লেবাননি সূত্র এবং বিভিন্ন প্রকাশিত নথি থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে অর্থ, ব্ল্যাকমেইল, ব্যক্তিগত দুর্বলতা, ভ্রমণ, চিকিৎসা ও সামাজিক যোগাযোগের মতো বিভিন্ন পথ ব্যবহার করে প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে আসছে।প্রতিটি প্রতিরোধ আন্দোলনের কাছেই এমন কিছু সংবেদনশীল নথি থাকে, যা জনসমক্ষে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। ফিলিস্তিনি ও লেবাননি আর্কাইভগুলোতে এজেন্ট, ব্যর্থ অভিযান এবং নিরাপত্তা ভাঙনের নানা ঘটনা সংরক্ষিত রয়েছে। এসব ঘটনার পূর্ণ বিবরণ হয়তো কখনোই প্রকাশ পাবে না। কারণ কিছু তথ্য সংগঠনকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলতে পারে, কিছু তথ্য প্রকাশ করলে নিরাপত্তা পদ্ধতি বা সক্রিয় নেটওয়ার্ক উন্মোচিত হতে পারে। আবার কোনো বিচ্ছিন্ন সহযোগিতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পুরো প্রতিরোধ কাঠামোর দুর্বলতার ধারণাও তৈরি হতে পারে।প্রতিরোধের অপ্রকাশিত গোপন তথ্যইসরায়েলি কর্মকর্তারা অবসর নেওয়ার পর স্মৃতিকথা প্রকাশ করেন, সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং পুরোনো হত্যাকাণ্ডের বিবরণ বই ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের উপাদান হয়ে ওঠে। সাবেক মোসাদ প্রধান ইয়োসি কোহেনের ২০২৫ সালের স্মৃতিকথা The Sword of Freedom এর সাম্প্রতিক উদাহরণ। রোনেন বার্গম্যানের Rise and Kill First বইটি প্রায় এক হাজার সাক্ষাৎকার ও হাজার হাজার নথির ওপর ভিত্তি করে ইসরায়েলের দীর্ঘ হত্যাকাণ্ডের অভিযান পুনর্গঠনের চেষ্টা করেছে।তবে এসব বিবরণে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ হিসাব-নিকাশও প্রভাব ফেলতে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাবেক এক মোসাদ প্রধান রাজনৈতিক বিরোধের কারণে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে বিশ্লেষক ও লেখকদের কাছে অতীত অভিযানের বিস্তৃত তথ্য সরবরাহ করেছিলেন। এর কিছু তথ্য পরে বার্গম্যানের বইয়েও স্থান পায়।কিছু বইয়ের উদ্দেশ্য আরও স্পষ্টভাবে প্রচারণামূলক বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশেষ করে কোনো অভিযান সাম্প্রতিক হলে, ঘটনাটিকে নির্দিষ্ট একটি ব্যাখ্যার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা এবং সংবেদনশীল বিষয়টি দ্রুত বন্ধ করে দেওয়ার উদ্দেশ্য থাকতে পারে।তারপরও এসব বিবরণ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু তথ্য পাওয়া যায়। উদাহরণ হিসেবে বার্গম্যানের বইয়ের সূচিতে ইমাদ মুগনিয়েহ হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে ইসরায়েলি অপারেশনাল কর্মকর্তা নোয়াম এরেজের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে বইটিতে দাবি করা হয়েছে, ইয়াহইয়া আয়াশ মারজ আল-জুহুরে হিজবুল্লাহ নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৯২ সালে সেখানে নির্বাসিত ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আয়াশ ছিলেন না। এসব অসঙ্গতি দুর্বল তথ্যসূত্র কিংবা ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তির ফল হতে পারে। তাই ইসরায়েলি বিবরণগুলোতে প্রকাশ্য দাবির পাশাপাশি অনিচ্ছাকৃতভাবে প্রকাশিত তথ্যের দিকেও নজর দেওয়া প্রয়োজন।প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর নিজেদেরও এমন একটি রেকর্ড প্রয়োজন, যেখানে নাম ও দেশ গোপন রাখা হলেও প্রতিটি অনুপ্রবেশ কী পরিবর্তন এনেছে, কীভাবে তা টিকে ছিল এবং কোন প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা কার্যকর হয়েছিল, তা নথিবদ্ধ থাকবে। নিরাপত্তা রক্ষা ও ভবিষ্যৎ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ প্রতিরোধ আন্দোলনের কার্যক্রমেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।হ্যান্ডলার ছাড়াই নিয়োগের নতুন পদ্ধতিগত আট দশকেরও বেশি সময়ে ইসরায়েলি নিয়োগ পদ্ধতিতে পরিবর্তন এসেছে। ফিলিস্তিন দখলের আগেও এজেন্ট তৈরি করা হতো। তবে গত ৩০ বছরের যোগাযোগ বিপ্লব সম্ভাব্য অনুপ্রবেশের পথ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এখন কোনো নিয়োগকারীকে বারবার সরাসরি দেখা করার প্রয়োজন হয় না। আর্থিক সংকট, ব্যক্তিগত যোগাযোগ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত তথ্য, ভ্রমণের ইতিহাস এবং ব্যক্তিগত সম্পর্ক দূর থেকেই পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। লক্ষ্য ব্যক্তি বুঝতে পারার আগেই তার সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি হতে পারে।সাম্প্রতিক যুদ্ধগুলোতে চাপ প্রয়োগের আরও কঠোর পদ্ধতিও দেখা গেছে। গাজায় ইসরায়েল পরিবারগুলোর টিকে থাকা, ত্রাণ পাওয়া কিংবা নিজ এলাকায় থাকার অনুমতিকে সহযোগিতার সঙ্গে যুক্ত করে স্থানীয় সহযোগী তৈরির চেষ্টা করেছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে The Cradle জানায়, সিনাই ও বকর পরিবারের সদস্যরা শিন বেতের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করার পর নিহত হন। আরবি সংবাদমাধ্যমে ইউরোমেড হিউম্যান রাইটস মনিটর ও পরিবারের সদস্যদের বরাতে বলা হয়, ইয়াসের আবু শাবাবের মিলিশিয়ার আদলে সশস্ত্র গোষ্ঠী গঠনের বিনিময়ে অর্থ, অস্ত্র ও সুরক্ষার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।বকর পরিবারের মুখতার মারওয়ান বকর জানান, দখলদার বাহিনী সহযোগিতা করলে তাদের এলাকায় থাকার অনুমতি দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। তারা তা প্রত্যাখ্যান করেন। পরিবারের কাউন্সিলের প্রধান নিজার দোগমুশও বিশ্বাস করতেন, বিশ্বাসঘাতকতার কলঙ্কের চেয়ে মৃত্যুই সহজ। এসব অবস্থান সম্মিলিত দৃঢ়তার উদাহরণ হলেও প্রতিটি প্রত্যাখ্যানেরও মূল্য রয়েছে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুটি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল গাজায় হামাসের বিকল্প হিসেবে সশস্ত্র ফিলিস্তিনি গোষ্ঠী তৈরির এবং ত্রাণ সরবরাহের পথ নিয়ন্ত্রণের বৃহত্তর ইসরায়েলি প্রচেষ্টার অংশ। এই প্রক্সি কৌশলে স্থানীয় গোত্রীয় বিরোধ, অপরাধী নেটওয়ার্ক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে দখলদারিত্বের উপকরণে পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে।ইরানে প্রবেশের ক্ষেত্রে ভিন্ন পদ্ধতি দেখা গেছে। ২৬ জুন ২০২৫-এ নিজেকে ‘Mossad Farsi’ পরিচয় দেওয়া একটি X অ্যাকাউন্ট হোয়াটসঅ্যাপ, টেলিগ্রাম ও সিগন্যালের মাধ্যমে ইরানিদের জন্য টেলিমেডিসিন সেবা দেওয়ার বিজ্ঞাপন দেয়। সেখানে ফারসি ভাষাভাষী হৃদরোগ, ডায়াবেটিস, সংক্রামক রোগ, ক্যানসার, স্ত্রীরোগ ও মনোবিজ্ঞানের বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে যোগাযোগের প্রস্তাব দেওয়া হয় এবং VPN ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। ইসরায়েলি গণমাধ্যম এটিকে মোসাদের উদ্যোগ হিসেবে প্রচার করলেও ইসরায়েল হায়োমের প্রশ্নের জবাবে মোসাদ অ্যাকাউন্টটির সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নিশ্চিত করেনি।তবে অ্যাকাউন্টটি আনুষ্ঠানিকভাবে মোসাদ পরিচালিত ছিল কি না, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো এর মাধ্যমে কী ধরনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। একটি চিকিৎসা পরামর্শের মাধ্যমে কারও নাম, অবস্থান, পারিবারিক সম্পর্ক, স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য, ব্যক্তিগত দুর্বলতা এবং ব্যক্তিগত যোগাযোগের পথ জানা সম্ভব। একই সঙ্গে এমন উদ্যোগ ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাকে ইরানি নাগরিকদের কাছে তাদের নিজস্ব সরকারের তুলনায় বেশি সহানুভূতিশীল হিসেবে উপস্থাপনের প্রচারণামূলক সুযোগও দিতে পারে।বৃত্তি, শিক্ষার্থী বিনিময়, পেশাগত সম্মেলন, ক্যাফে ও প্রবাসী সংগঠনও একই ধরনের যোগাযোগের ক্ষেত্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে সংবেদনশীল প্রযুক্তিগত বিষয়ে পড়াশোনা করা শিক্ষার্থীরা বিদেশে থাকাকালে নিয়োগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হতে পারে। এমন নিয়োগ শুরুতেই গুপ্তচরবৃত্তির প্রস্তাব দিয়ে করতে হয় না। উপকার, মর্যাদা, ভ্রমণের সুযোগ এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছাকাছি যাওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে যোগাযোগ তৈরি করা যায়।অনুপ্রবেশের পর তৈরি হয় নতুন নিরাপত্তা প্রটোকলThe Cradle-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে লেবাননের এক নিরাপত্তা সূত্র পরিস্থিতিটিকে গুরুতর বলে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, বিদেশে নিয়োগ পাওয়া কাউকে শনাক্ত করা অনেক কঠিন। এ কারণে প্রতিরোধ সংগঠনগুলোর মধ্যে নির্দিষ্ট কিছু দেশের দূতাবাসে প্রবেশ কিংবা ওই দেশ দিয়ে ট্রানজিট করাকেও সাময়িক বরখাস্তের কারণ হিসেবে বিবেচনা করার মতো কঠোর নিরাপত্তা বিধি তৈরি হয়েছে।ওই সূত্র আরও জানান, কোনো ক্যাডার অনুমতি ছাড়া বিদেশে গেলে, এমনকি দেশটি শত্রুভাবাপন্ন বা সন্দেহজনক না হলেও, তাকে কয়েক বছরের জন্য দায়িত্ব থেকে সরিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হতে পারে। এতে কোনো সম্ভাব্য হ্যান্ডলার ওই ব্যক্তিকে ব্যবহার করার সুযোগ হারাতে পারে।তবে সব সংগঠন শুরু থেকেই এমন নিয়ম গ্রহণ করেনি। এক ফিলিস্তিনি সূত্র এশিয়ার একটি দেশে মধ্যম পর্যায়ের এক ক্যাডার অপহরণের ঘটনা উল্লেখ করেন। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ তাকে হত্যার আগে উদ্ধার করলেও, এর আগে তিনি নিজের কাছে থাকা তথ্য দিয়ে ফেলেছিলেন বলে সূত্রটির দাবি। ঘটনার পর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগ করা ব্যক্তিদেরও পদত্যাগের তিন বছর পর্যন্ত বিদেশ ভ্রমণ নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে তিনি জানান। এ সময় সংশ্লিষ্ট সব ব্যবস্থা দ্রুত পরিবর্তন করার দায়িত্ব সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ওপর থাকে।নিয়োগের পেছনে শুধু অর্থ, ব্ল্যাকমেইল বা আদর্শগত কারণ কাজ করে না। কিছু আটক এজেন্ট নিজেদের গুরুত্বপূর্ণ মনে করার আকাঙ্ক্ষা, বিদেশি নাগরিকত্ব পাওয়ার ইচ্ছা কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে যাওয়ার আকর্ষণের কথাও জানিয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থা অনেক সময় লক্ষ্য ব্যক্তির নিজের সম্পর্কে যে গল্পটি বিশ্বাস করতে ভালো লাগে, সেটিকেই কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে তাকে প্রস্তুত করতে পারে।লেবাননে এই ঝুঁকির ব্যাপকতা বিভিন্ন ঘটনায় দেখা গেছে। দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী ও হিজবুল্লাহ বারবার বিভিন্ন সম্প্রদায় ও জাতীয়তার সদস্যদের নিয়ে গঠিত ইসরায়েলি নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার দাবি করেছে। ২০২২ সালে কর্তৃপক্ষ লেবাননে শনাক্ত হওয়া সবচেয়ে বড় ইসরায়েলি গুপ্তচর নেটওয়ার্কগুলোর একটি ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেয়।২০২৫ সালের জুনের যুদ্ধের পর ইরানে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিদের ঘটনাও দেখিয়েছে, নিয়োগ শুধু সরকারি কর্মকর্তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। লজিস্টিকস, পরিবহন, যোগাযোগ এবং সাধারণ বেসামরিক কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও এমন নেটওয়ার্কে যুক্ত হতে পারেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণও একটি বিশেষ ঝুঁকি তৈরি করে। রোগী ও তার স্বজনদের হাসপাতাল, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, বীমা সংস্থা, ভিসা অফিস ও মধ্যস্থতাকারীদের কাছে নথি, রোগ নির্ণয়ের তথ্য, যোগাযোগের বিবরণ এবং ভ্রমণ পরিকল্পনা দিতে হয়। এসব প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশ বৈধ হলেও একটি মাত্র যোগাযোগের জায়গা শত্রুপক্ষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলেই কোনো দুর্বল ব্যক্তিকে শনাক্ত করা বা তার কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। জরুরি চিকিৎসার ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বাড়ে, কারণ রোগী তখন দ্রুত অ্যাপয়েন্টমেন্ট, ভিসা বা চিকিৎসার খরচের ব্যবস্থা করে দিতে সক্ষম ব্যক্তির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।একজন এজেন্ট কীভাবে পুরো অভিযানকে বিপর্যস্ত করতে পারেনসবচেয়ে ধ্বংসাত্মক এজেন্ট শুধু নাম বা অবস্থান সরবরাহ করেন না। আগাম সতর্কতা পেলে ইসরায়েল কোনো অভিযান বাতিল করতে, লক্ষ্য পরিবর্তন করতে কিংবা পরিকল্পনাটিকে এগোতে দিয়ে সেটিকে ফাঁদে পরিণত করতে পারে। এর ক্ষতি শুধু প্রাণহানিতে সীমাবদ্ধ নয়। একটি ব্যর্থ অভিযান সংগঠনের মধ্যে স্থবিরতা, পারস্পরিক অভিযোগ এবং বহু বছরের নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করতে পারে।ইসরায়েলি কর্মকর্তারা ও তাদের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিকদের একটি দাবি হলো, বহু বছর ধরে হামাসের শীর্ষ সামরিক নেতৃত্বে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো এজেন্ট ছিল না। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এ কারণেই ৭ অক্টোবরের আল-আকসা প্লাবন অভিযান সম্পর্কে ইসরায়েল আগাম গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়নি।তবে ফিলিস্তিন মুক্তি সংস্থা বা পিএলওর প্রথম দিকের অভিযান থেকেই ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের চেষ্টা চলে আসছে বলে ফিলিস্তিনি বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে এজেন্টরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে পৌঁছেছিল এবং কখনো কখনো কমান্ড কক্ষ পর্যন্ত প্রবেশ করেছিল বলে দাবি করা হয়েছে। মিসর ও সিরিয়ার ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রচেষ্টা ছিল। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধকে ঘিরে পরস্পরবিরোধী বিবরণগুলো দেখায়, প্রকৃত মানব গোয়েন্দা উৎস, উপেক্ষিত সতর্কবার্তা, রাজনৈতিক ব্যাখ্যা ও পরবর্তী সময়ের গল্পের মধ্যে পার্থক্য করা কতটা কঠিন।প্রতিবেদনটি বলছে, ইসরায়েল কৌশলগত আগাম সতর্কতা না পেলেও হামাসের ভেতরে অনুপ্রবেশ ঘটে থাকতে পারে। The Cradle ৭ অক্টোবরের অভিযানের আগে হামাসে প্রবেশাধিকার পাওয়া একটি ঘটনা নথিবদ্ধ করেছে। তবে ৭ অক্টোবরের আকস্মিকতা থেকে ধারণা করা যায়, কোনো উৎস থাকলেও সে হয়তো খুব নিচু পর্যায়ে ছিল, তাকে অভিযান থেকে দূরে রাখা হয়েছিল অথবা প্রয়োজনীয় তথ্য তার কাছে পৌঁছায়নি। পরবর্তীতে লেবানন ও ইরানে ইসরায়েলের সাফল্য এই পার্থক্যকে আরও স্পষ্ট করেছে।লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতিরোধ সূত্রগুলো ২০০৫ সালের ঘাজার অভিযান এবং ২০১৪ সালের প্রথম জিকিম নৌ-অভিযানসহ কয়েকটি ব্যর্থ বা আপসকৃত অভিযানের পেছনে অভ্যন্তরীণ অনুপ্রবেশের কথা উল্লেখ করেছে। জিকিম অভিযান সংঘটিত হয়েছিল এবং পরবর্তী ফুটেজে কাসসাম যোদ্ধাদের একটি ইসরায়েলি সামরিক অবস্থানে পৌঁছাতে দেখা যায়। তবে অভিযানের প্রথম ধাপে কোনো এজেন্ট নাশকতা করেছিল কি না, সে দাবি প্রকাশ্য নথিতে প্রতিষ্ঠিত নয় এবং তাই এটিকে সূত্রের বক্তব্য হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত।একই সতর্কতা প্রয়োজন ২০০৮ সালে মুগনিয়েহ হত্যার প্রতিশোধ নিতে ৩০টিরও বেশি চেষ্টা ব্যর্থ করার দাবি এবং ‘N.N.’ নামে পরিচিত এক এজেন্ট ২৫ বছর ধরে গাজার একটি সশস্ত্র শাখার ভেতরে অবস্থান করেছিলেন এমন দাবির ক্ষেত্রেও। এগুলো প্রতিবেদনে সূত্রের দাবি হিসেবে এসেছে, স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে নয়।আরেক ফিলিস্তিনি বিবরণে ১৫ বছরেরও বেশি আগে এক নারী সাবেক বন্দিকে বোমা হামলার মিশনে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে। তার মুক্তির কয়েক দিন আগে তাকে পাঠানো কমান্ডারকে ইসরায়েল হত্যা করে বলে তিনি দাবি করেছেন। কমান্ডারের মৃত্যু হলে দুজনের পক্ষে নিজেদের জানা তথ্য মিলিয়ে দেখা বা সন্দেহভাজন এজেন্ট শনাক্ত করা আর সম্ভব হয়নি। ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত হোক বা পরিস্থিতির ফল, এতে গোয়েন্দা কার্যক্রমের এমন একটি পদ্ধতির প্রতিফলন দেখা যায়, যেখানে পূর্ণ চিত্র একত্র করার মতো ব্যক্তিদের একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ থাকে না।পশ্চিম তীরে অনুপ্রবেশের একটি তুলনামূলকভাবে যাচাইযোগ্য ধরনঅবসরপ্রাপ্ত এক নিরাপত্তা সূত্র পশ্চিম তীরে ২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের একটি ঘটনার কথা বলেছেন। তার দাবি, ইসরায়েল একটি গড়ে ওঠা সশস্ত্র কাঠামোকে বিস্তৃত হতে দেয় এবং বিদেশে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলো পর্যবেক্ষণ করে। সদস্যরা নিজ নিজ শহরে ফিরে আসার পর তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের নেটওয়ার্ক শনাক্ত করার সুযোগ নেওয়া হয়েছিল। সূত্রটি এ পরিস্থিতিকে একটি পচা টমেটো দিয়ে অনেক টমেটো নষ্ট হওয়ার সঙ্গে তুলনা করেন।তার মতে, ইসরায়েল তখন কাঠামোটিকে বিকশিত হতে দিয়েছিল এবং বিদেশে অনুষ্ঠিত প্রতিটি বৈঠক পর্যবেক্ষণ করেছিল। সবাই নিজ নিজ শহরে ফিরে যাওয়ার পরও অপেক্ষা করা হয়। এমনকি দখলকৃত ভূখণ্ডে সক্রিয় অর্থায়ন ও অস্ত্র সরবরাহকারী কোষগুলোর তথ্য উন্মোচিত হওয়ার পর বড় ধরনের গ্রেপ্তার অভিযান চালানো হয়।ওই সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এ ধরনের আঘাত একটি সংগঠনের মধ্যে স্থবিরতা ও পারস্পরিক অভিযোগ তৈরি করে। মাঠপর্যায়ের সদস্যদের মধ্যে হতাশা ও ভয় ছড়িয়ে পড়ে এবং এর প্রভাব কাটিয়ে উঠতে বছরের পর বছর বা প্রজন্মগত পরিবর্তন পর্যন্ত প্রয়োজন হতে পারে। তার মতে, একটি বড় গোয়েন্দা সাফল্য হাজারটি সাধারণ আঘাতের চেয়েও বেশি কার্যকর হতে পারে। এ কারণেই ৭ অক্টোবরের আল-আকসা প্লাবনের শুরুতে পশ্চিম তীরে বড় ধরনের গণঅভ্যুত্থান দেখা যায়নি বলে তিনি মনে করেন।ইসরায়েলি অনুপ্রবেশের প্রভাব তাই কোনো এজেন্ট গ্রেপ্তার হওয়ার পরও শেষ হয়ে যায় না। কোনো পরিকল্পনা, যোগাযোগের পথ কিংবা ব্যক্তির ওপর আস্থা আপসকৃত হলে সংগঠনের নেতৃত্বকে নিজেদের মধ্যেই প্রশ্ন তুলতে হয়। ততক্ষণে দখলদার পক্ষ হয়তো সংগঠনের ভেতরে সন্দেহের বীজ বপন করে ফেলেছে। যে আস্থা একটি প্রতিরোধ সংগঠনকে একত্রে ধরে রাখে, অনুপ্রবেশের সবচেয়ে গভীর ক্ষতি সেখানেই।

ইসরায়েলের ‘ব্ল্যাক বক্স’: গুপ্তচরবৃত্তি কীভাবে প্রতিরোধ সংগঠনগুলোকে ভেতর থেকে দুর্বল করে