ভারতে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় এবার গরুকে জাতীয় পশু ঘোষণার দাবি মুসলমানদের
ভারতে গো-রক্ষা ও গরু জবাই নিয়ে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বিতর্ক, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা এবং তথাকথিত গো-রক্ষকদের হামলায় একাধিক মৃত্যুর ঘটনার মাঝে এক অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করেছে মুসলিম সম্প্রদায়। সমাজের দক্ষিণপন্থী গোষ্ঠীর বিরোধিতা, সামাজিক হেনস্থা ও সহিংসতা রুখতে এবং সাম্প্রদায়িক সৌহার্দ্য বজায় রাখতে পশ্চিমবঙ্গ, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, রাজস্থানের পর এবার উত্তরপ্রদেশের মুসলমানরা সরাসরি রাস্তায় নেমে কঠোর গো-রক্ষা আইনের দাবি জানিয়েছেন।ভারতের তাজমহলের শহর আগ্রা থেকে সম্প্রীতির এই নতুন বার্তার সূচনা হয়েছে, যা চলমান বিতর্ককে সম্পূর্ণ নতুন এক মোড় এনে দিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরে যেখানে গরুর মাংস বা কোরবানিকে কেন্দ্র করে হিংসার বাতাবরণ তৈরি হতো, সেখানে এবার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেরাই গো-বংশের সম্মান ও সুরক্ষার দাবিতে রাজপথে সোচ্চার হয়েছেন।গরু এটি ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশআগ্রায় 'মুসলিম মহাপঞ্চায়ত'-এর ব্যানারে বিপুল সংখ্যক মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ জেলা সদর দফতরে জড়ো হয়ে এক বিশাল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন। তাদের হাতে ছিল বিভিন্ন দাবি সংবলিত প্ল্যাকার্ড ও ব্যানার, এবং মুখভর্তি ছিল 'গো-মাতার' সম্মানের পক্ষে স্লোগান। আন্দোলনকারীদের স্পষ্ট বক্তব্য:"গরু কেবল কোনো একটি নির্দিষ্ট ধর্মের বিশ্বাসের বিষয় নয়, বরং এটি সমগ্র ভারতীয় সংস্কৃতি, গ্রামীণ ঐতিহ্য এবং আমাদের কৃষি অর্থনীতির এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি।"বিক্ষোভ প্রদর্শনকালে মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিরা গরুকে ভারতের ‘জাতীয় পশু’ হিসেবে ঘোষণা করার জোরালো দাবি জানান। একই সঙ্গে দেশজুড়ে গো-হত্যা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে এবং গো-রক্ষার জন্য একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও কঠোর আইন প্রণয়নের আহ্বান জানান। মুসলিম মহাপঞ্চায়তের নেতৃবৃন্দ ভারতের মহামান্য রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে লেখা একটি স্মারকলিপি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে হস্তান্তর করেন।প্রকৃত গো-সেবাআন্দোলনকারীদের অভিযোগ, কিছু মানুষ গো-রক্ষার নাম করে কেবল নিজেদের স্বার্থের রাজনীতি মেটাচ্ছে। অথচ আজ প্রকৃত সততার সাথে গো-বংশের রক্ষণাবেক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। মুসলিম নেতৃবৃন্দ স্পষ্ট ভাষায় জানান যে, যারা অবৈধভাবে গো-হত্যা বা গবাদি পশু পাচারের সাথে জড়িত, তাদের বিরুদ্ধে যেন কঠোরতম আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়—তা সে যেকোনো ধর্ম বা সম্প্রদায়ের মানুষই হোক না কেন। কারণ, আইন সবার জন্য সমান হওয়া উচিত।ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে সম্প্রীতি সোচ্চারউত্তরপ্রদেশের এই আন্দোলনের পটভূমি তৈরি হয়েছিল ভারতের অন্যান্য রাজ্যে নেওয়া মুসলিম সমাজের কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের মাধ্যমে:পশ্চিমবঙ্গ: সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা, মগরাহাট এবং কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় মুসলিমদের উদ্যোগে আহত গরুদের উদ্ধার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করার ঘটনা বেশ সাড়া ফেলেছে। বহু স্থানীয় মুসলিম সংগঠন গোশালাগুলোতে গো-খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ করছে। এমনকি আসন্ন ঈদুল আজহায় (বকরী ঈদ) সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখতে গরুসহ যেকোনো ধরনের আইনিভাবে নিষিদ্ধ পশু কোরবানি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থানীয় মুসলিম সমাজ। নিখিল ভারত সুন্নাত অল জামায়াতের নেতা সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরীর মতো ব্যক্তিত্বদের বক্তব্যও এই সামাজিক সচেতনতায় ভূমিকা রেখেছে। দেশের ঐতিহ্যবাহী 'আলা হযরত দরগাহ' থেকেও মুসলিমদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যেন দেশের আইন মেনে নিষিদ্ধ পশুর কোরবানি থেকে বিরত থাকা হয়।হরিয়ানা ও মেওয়াত: একসময় গো-হিংসার জন্য কুখ্যাত হরিয়ানার মেওয়াত ও নুহের বেশ কিছু গ্রামে এখন হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ যৌথভাবে গোশালা পরিচালনা করছেন। গ্রামীণ জীবনে কৃষির গুরুত্ব অনুধাবন করে তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে অসহায় ও ভবঘুরে গরুর খাবার ও পানির ব্যবস্থা করছেন।মহারাষ্ট্র: মুম্বাই এবং মালেগাঁওয়ের মুসলিম ধর্মীয় স্কলার বা উলামাগণ এক যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ইসলাম শান্তি ও মানবতার কথা বলে। তাই এমন কোনো কাজ করা উচিত নয় যা অন্য কোনো ধর্মের মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানে। তারা অবৈধ পশু পাচারের বিরুদ্ধে প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগও দায়ের করেছেন।রাজস্থান ও কাশ্মীর: আজমির ও টোঙ্কের সুফি মতাদর্শী মুসলিম সমাজ স্থানীয় গোশালাগুলোতে বড় অঙ্কের আর্থিক অনুদান প্রদান করেছে। অন্যদিকে, জম্মু-কাশ্মীরের মুসলিম ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো সীমান্ত এলাকায় গবাদি পশুর অবৈধ পাচার এবং পশুদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধে প্রশাসনের প্রতি কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে।ভারতে গত কয়েক বছরে কথিত গো-রক্ষকদের হামলায় একাধিক মুসলিম পিটিয়ে হত্যার শিকার হয়েছেন, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর রিপোর্টেও উদ্বেগের কারণ হিসেবে এসেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মুসলিম সমাজের এই স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ মূলত সেই সামাজিক ভীতি, প্রতাড়না ও সহিংসতা দূর করার একটি কৌশলগত ও আন্তরিক প্রয়াস।ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ আইনি কাঠামো এবং নাগরিকদের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগকে একটি মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে এটি একই সাথে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের জবাবদিহিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে—যদি সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নিজেই গো-রক্ষার পক্ষে দাঁড়ায়, তবে কথিত গো-রক্ষকদের নামে যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসন কতটা কঠোর পদক্ষেপ নেবে?ভারতে দীর্ঘ সময় ধরে গো-মাংস এবং গো-রক্ষা নিয়ে রাজনীতি চলছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ এবং বিভিন্ন দরগাহর পীর-মাশায়েখরা বারবার ভারতের মিশ্র সংস্কৃতি (গঙ্গা-যমুনা তাহজিব) এবং আইন শৃঙ্খলার স্বার্থে গো-কোরবানি থেকে বিরত থাকার সামাজিক ও ধর্মীয় পরামর্শ দিয়ে আসছেন।মুসলিম সম্প্রদায়ের এই পদক্ষেপ ভারতের বহুত্ববাদী ও বৈচিত্র্যময় সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে একটি দায়িত্বশীল ও পরিপক্ক উদাহরণ। এটি একদিকে যেমন উগ্রপন্থী রাজনীতিকে কোণঠাসা করবে, অন্যদিকে তেমনি দীর্ঘদিনের সামাজিক দূরত্বের অবসান ঘটাতে সাহায্য করতে পারে।