ডাচ সাম্রাজ্যবাদের শোষণের বিপরীতে আলেমদের সংগ্রামেই আজ স্বাধীন ইন্দোনেশিয়া
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দ্বীপাঞ্চলীয় ও সর্ববৃহৎ মুসলিম জনসংখ্যার দেশ ইন্দোনেশিয়ায় শত শত বছর ধরে ঔপনিবেশিক আধিপত্য বজায় রেখেছিল নেদারল্যান্ডস। মসলার বাণিজ্য থেকে শুরু করে স্থানীয় সুলতানিয়াতগুলো দখল, খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতা এবং ইসলামি সংস্কৃতি ধ্বংসের মাধ্যমে এই শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। বিশেষ করে মুসলমানদের হজ পালন স্থগিত করা, ওরিয়েন্টালিস্টদের ছদ্মবেশে মেধা ও গবেষণাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা এবং আলেম ও স্থানীয় সমাজের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে ডাচ্রা যেভাবে এই অঞ্চলে শোষণ চালিয়েছিল, তা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মুসলিম ইতিহাসের এক কালো অধ্যায়।প্রায় ১৮,০০০ দ্বীপের সমন্বয়ে গঠিত ইন্দোনেশিয়া ভৌগোলিক ও কৌশলগতভাবে এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশের মাঝে এবং ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগরের সংযোগস্থলে অবস্থিত। ১৫৯৯ সালে ডাচরা প্রথম সুমাত্রা দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করলে আচেহ সুলতানিয়াত তাদের বিতাড়িত করে। তবে পরবর্তীতে ডাচরা পূর্বের অন্যান্য দ্বীপগুলো দখল করে এবং ১৬১৯ সালে বাতাবিয়া (বর্তমান জাকার্তা) শহর প্রতিষ্ঠা করে। ১৬০২ সালে গঠিত 'ডাচ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি' (VOC) পৃথিবীর প্রথম যৌথ মূলধনী মেগা-কোম্পানি হিসেবে যুদ্ধ ঘোষণা, মুদ্রা অঙ্কন ও উপনিবেশ স্থাপনের মতো অর্ধ-সরকারী ক্ষমতা লাভ করে ইন্দোনেশিয়ায় একচ্ছত্র বাণিজ্যিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার করে।খ্রিস্টান ধর্মান্তরকরণ ও মিশনারি কূটকৌশলপর্তুগিজ ও স্পেনীয়দের বিতাড়িত করার পর ডাচরা প্রোটেস্ট্যান্ট মতবাদ ছড়াতে শিক্ষা, বাইবেল অনুবাদ, চিকিৎসাসেবা ও নির্মাণ প্রকল্পকে হাতিয়ার করে। প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারি সংস্থাগুলোর মাধ্যমে অ্যানিমিস্ট ও অনুন্নত এলাকাগুলোতে ব্যাপ্টিজম বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে মুসলিম প্রতিরোধ ভেঙে দিতে তারা ইসলামের ইতিহাস ও স্থানীয় সংস্কৃতির ওপর গভীর গবেষণা শুরু করে।ইসলামি সংস্কৃতি ও হজ পালনে নিষেধাজ্ঞাডাচরা শুরুতে বাতাবিয়ায় মুসলমানদের প্রকাশ্যে ও গোপনে একত্রিত হওয়া, খাৎনা করা এবং দ্বীনি মাদ্রাসা পরিচালনা নিষিদ্ধ করে। তীব্র প্রতিবাদের মুখে ১৬৭৪ সালে কিছু নিয়ম শিথিল হলেও ১৭১৬ সালে মুসলমানদের জন্য পবিত্র হজ পালন নিষিদ্ধ করা হয়। কারণ, মক্কা থেকে ফিরে আসা হাজিরা সাধারণ জনগণকে ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে জাগ্রত করছিলেন। স্যার টমাস স্ট্যামফোর্ড র্যাফেলস উল্লেখ করেছিলেন যে, মক্কা ফেরত হাজিরা জনগণের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ছিলেন এবং তারা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে মূল ভূমিকা রাখতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় উসমানীয় খিলাফতের জিহাদ আহ্বানের ভয়ে ১৯১৫ সালে ডাচ্ সরকার পুনরায় হজ যাত্রা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়।ওরিয়েন্টালিস্ট স্নুক হুরগ্রোনজের চক্রান্তডাচ শাসনের সবচেয়ে ভয়ানক অধ্যায় পরিচালনা করেন ওরিয়েন্টালিস্ট খ্রিস্টান স্নুক হুরগ্রোনজে (Snouck Hurgronje)। তিনি মুসলিম সেজে মক্কায় গিয়ে অবস্থান করেন এবং সেখানকার ইন্দোনেশীয় আলেমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৮৮৯ সালে ইন্দোনেশিয়ায় ফিরে এসে তিনি ডাচ্ সরকারকে পরামর্শ দেন যে—হজের চেয়েও মক্কার ইসলামি শিক্ষা ও সুফি তরিকাগুলো ডাচ্ শাসনের জন্য বেশি বিপজ্জনক।হুরগ্রোনজে একটি কুখ্যাত কৌশল তৈরি করেন: ১. আলেম ও 'আদাত' (স্থানীয় প্রথা)-এর বিভাজন: তিনি স্থানীয় সংস্কৃতি ও প্রথাকে (আদাত) শরিয়াহ শাসনের মুখোমুখি দাঁড় করান। আচেহতে তিনি স্থানীয় অভিজাতদের (উলেবালাং) আলেমদের চেয়ে বেশি ক্ষমতা ও সরকারি ভাতা দেওয়ার পরামর্শ দেন, যাতে আলেমদের প্রতিরোধ আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়ে। ২. পেনঘুলু ও স্থানীয় এলিটদের ব্যবহার: আলেমদের একঘরে করে তিনি সরকারি বেতনভুক্ত 'পেনঘুলু' (ধর্মীয় কর্মকর্তা) নিয়োগ দেন এবং স্থানীয় আভিজাত্যকে (মেনাক) ডাচ প্রশাসনের অধীনে নিয়ে আসেন। ৩. ওরিয়েন্টালিজম ও আরবি হরফ বর্জন: কারেল ফ্রেডেরিক হোলে এবং হুরগ্রোনজে যৌথভাবে চেষ্টা করেন যাতে মুসলিমদের আরবি ও জাভানিজ হরফ থেকে দূরে সরিয়ে লাতিন হরফ ব্যবহারে বাধ্য করা যায়।গৃহপালিত আলেম ও প্রতিরোধ ধ্বংসডাচরা সৈয়দ ওসমান এবং সুদান বংশোদ্ভূত হাসান মুস্তফার মতো কিছু ব্যক্তিত্বকে ব্যবহার করে ঔপনিবেশিক শাসনের ধর্মীয় বৈধতা আদায়ের চেষ্টা করে। সৈয়দ ওসমানকে সরকারি উপদেষ্টা করা হয়, যিনি বাঙ্কেনের মুসলিমদের ওপর সংঘটিত ডাচ্ গণহত্যার বিরুদ্ধে আলেমদের জিহাদকে 'বিভ্রান্তি' বলে সমালোচনা করেছিলেন এবং ডাচ্ রানী উইলহেলমিনার প্রশংসায় কাব্য রচনা করেছিলেন।এত চক্রান্ত ও দমন-পীড়ন সত্ত্বেও ইন্দোনেশিয়ার আলেম, 'পেসানত্রেন' (মাদ্রাসা) ব্যবস্থা এবং সাধারণ মুসলিম জনগণ তাদের ঈমানি চেতনা ও সুফি প্রতিরোধ বজায় রেখেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিংশ শতাব্দীতে ইন্দোনেশিয়ার স্বাধীনতার মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়।