গাজা থেকে মার্কিন সার্জন: ৫ বছরের শিশুর পা কাটতে হয়েছে, একটাই অ্যানেস্থেসিয়া ছিল—গান গাওয়া
অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি আগ্রাসনে চিকিৎসা ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। তীব্র চিকিৎসাসামগ্রী ও অ্যানেস্থেসিয়ার অভাবে চেতনানাশক ছাড়াই চরম যন্ত্রণার মধ্যে শিশুদের অঙ্গচ্ছেদ (অ্যাম্পুটেশন) করতে বাধ্য হচ্ছেন চিকিৎসকেরা। সম্প্রতি সুমুদ পডকাস্টে (Sumud Podcast) যুক্ত হয়ে নিজের চোখে দেখা এমন এক ভয়াবহ ঘটনার নির্মম বর্ণনা দিয়েছেন গাজায় স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে যাওয়া বিশ্ববিখ্যাত মার্কিন অর্থোপেডিক ও হ্যান্ড সার্জন ড. মার্ক পার্লমুটার।ড. মার্ক পার্লমুটার তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনে জন্মভূমি যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ৩০টিরও বেশি দেশে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে আহতদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। ২০০১ সালের নিউ ইয়র্কের ৯/১১ হামলা, ক্যাটরিনা সুপার সাইক্লোন এবং ২০১০ সালের হাইতি ভূমিকম্পের মতো ভয়াবহ দুর্যোগেও সামনের সারিতে থেকে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর। কিন্তু গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বর বোমাবর্ষণের পর যা দেখেছেন, তার জন্য তিনি মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।গাজায় নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে এই প্রবীণ সার্জন বলেন, “গাজায় আমাদের কাটানো প্রথম এক সপ্তাহের ভয়াবহতা আমার পুরো জীবনের সব দুর্যোগের অভিজ্ঞতার সমষ্টির চেয়েও করুণ ও ভয়াবহ ছিল।”অ্যানেস্থেসিয়া ও জরুরি ইনজেকশনের চরম সংকট থাকার পরও কীভাবে চরম প্রতিকূলতায় অস্ত্রোপচার চালাতে হয়েছে, তার এক গা শিউরে ওঠা বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, “যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ভোররাতে পাঁচ বছরের এক কন্যাসন্তানের পা কেটে বাদ দিতে (অ্যাম্পুটেশন) হয়েছিল। আমাদের হাতে কোনো অ্যানেস্থেসিয়া বা চেতনানাশক ছিল না। বাধ্য হয়ে আমাদের অ্যানেস্থেসিওলজিস্ট অস্ত্রোপচার চলাকালে শিশুটিকে শান্ত রাখতে এবং মনোযোগ সরাতে গান গেয়ে শুনিাচ্ছিলেন। এটাই ছিল আমাদের একমাত্র অ্যানেস্থেসিয়া।”ড. পার্লমুটার আরও যোগ করেন, “শিশুটি সম্পূর্ণ সজ্ঞান ছিল। পুরো অপারেশনের সময় সে প্রচণ্ড যন্ত্রণায় ছটফট করছিল। আমরা সবাই সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছিলাম যেন মেয়েটি অন্তত ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় তার জ্ঞান ছিল। এই ঘটনাটি ঘটেছিল যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার দিন ভোররাত ৩টায়।”অস্কার মনোনীত পরিচালক পো সি টেং-এর নির্মিত ‘আমেরিকান ডক্টর’ প্রামাণ্যচিত্রের অংশ হিসেবে ড. থায়ের আহমদ এবং ড. ফিরোজ সিধওয়ার সাথে নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করেন ড. পার্লমুটার। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানসহ বিভিন্ন প্রধান গণমাধ্যমে তাঁদের এই সাক্ষ্য প্রকাশিত হয়েছে, যা অবরুদ্ধ গাজায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো ধ্বংসের চূড়ান্ত ভয়াবহতা বিশ্ববাসীর সামনে উম্মোচিত করেছে।গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, অক্টোবর ২০২৫-এ তথাকথিত যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর থেকে এ পর্যন্ত ইসরায়েলি হামলায় ১,২৭৩ জন নিহত, ৪,২২৩ জন আহত এবং ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে ৮১৩ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই জেনোসাইডে মোট নিহতের সংখ্যা ৭৩,৪০৭ এবং আহত ১৭৪,৩৩৫ ছাড়িয়েছে। এখনো হাজার হাজার মরদেহ ধসে পড়া ভবনের নিচে চাপা পড়ে আছে।