দারুণ উলুম দেওবন্দে 'শিবলিঙ্গ' দাবির অযুহাতে উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর অভিযানের হুমকি
ভারতের ঐতিহাসিক ও বিশ্বখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুণ উলুম দেওবন্দের চত্বরের নিচে 'শিবলিঙ্গ' রয়েছে—এমন কোনো তথ্যপ্রমাণহীন দাবি তুলে আগামী ১১ আগস্ট মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে গঙ্গাজল ঢালার হুমকি দিয়েছে চরমপন্থী সংগঠন 'হিন্দু রক্ষা দল'। সংগঠনটির উত্তরাখণ্ড রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মার এক উসকানিমূলক ভিডিও বার্তার পর দেওবন্দ ও আশপাশের এলাকায় ব্যাপক শঙ্কা ও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন জানিয়েছে, এলাকায় শান্তি ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় কোনো ধরণের উসকানি বা বিশৃঙ্খলা সহ্য করা হবে না।ভারতের উত্তর প্রদেশের সাহারানপুর জেলায় অবস্থিত উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ ইসলামিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দারুণ উলুম দেওবন্দকে কেন্দ্র করে নতুন করে চরমপন্থী তৎপরতা ও বিতর্ক তৈরির অপচেষ্টা চলছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠন 'হিন্দু রক্ষা দল'-এর পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে, আগামী ১১ আগস্ট তারা সংগঠনটির জাতীয় সভাপতি পিংকি চৌধুরীর নেতৃত্বে হরিদ্বার থেকে গঙ্গাজল নিয়ে দেওবন্দ অভিমুখে যাত্রা করবে এবং মাদ্রাসা চত্বরে তা ছিটিয়ে দেবে।সংগঠনটির উত্তরাখণ্ড শাখা প্রধান ললিত শর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এক ভিডিও বার্তায় ভিত্তিহীন দাবি করে বলেন, দারুণ উলুম দেওবন্দের নিচে প্রাচীন শিব মন্দির বা 'শিবলিঙ্গ' চাপা পড়ে আছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, এর আগে তারা সাহারানপুর জেলা প্রশাসনের কাছে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানালেও কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, যার কারণে তারা নিজেরাই সরাসরি গিয়ে এই কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।তবে তাদের এই দাবির স্বপক্ষে আদালত বা নির্ভরযোগ্য কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানের সামান্যতম কোনো ভিত্তি নেই। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে উত্তর প্রদেশ জুড়ে সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থান, মসজিদ ও মাদ্রাসার ধর্মীয় পরিচয় ও ইতিহাস বিনষ্ট করার যে পরিকল্পিত চক্রান্ত চলছে, এটি তারই ধারাবাহিক অংশ।পুলিশ প্রশাসনের কড়া অবস্থানহিন্দু রক্ষা দলের এই উসকানিমূলক ঘোষণার পর দেওবন্দ ও সমগ্র সাহারানপুর জেলায় নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। দেওবন্দের সার্কেল অফিসার (সিও) অমিত কুমার সিং স্পষ্ট জানিয়েছেন, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর যেকোনো চেষ্টা কঠোরভাবে দমন করা হবে।তিনি বলেন, "কাউকেই আইন নিজের হাতে তুলে নিতে বা স্থানীয় পরিবেশ বিনষ্ট করতে দেওয়া হবে না। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার চেষ্টা করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"দারুণ উলুম দেওবন্দ ও মুসলিম সম্প্রদায়ের উদ্বেগ১৮৬৬ সালে প্রতিষ্ঠিত দারুণ উলুম দেওবন্দ কেবল ভারতের নয়, পুরো বিশ্বজুড়ে ইসলামী শিক্ষার অন্যতম শীর্ষ কেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত। প্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরেই শান্তি, ধর্মীয় সম্প্রীতি এবং ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে ঐতিহাসিক অবদান রেখে আসছে। কাঁওয়ার যাত্রাসহ বিভিন্ন স্থানীয় ধর্মীয় শোভাযাত্রার সময় সংঘাত এড়াতে প্রতিষ্ঠানটি সর্বদাই নিজ শিক্ষার্থীদের সতর্ক করে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে থাকে।উগ্র হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর এই অযাচিত ও ষড়যন্ত্রমূলক উসকানিতে স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় ও মানবাধিকার কর্মীরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কোনো প্রকার প্রমাণ ছাড়াই ভারতের অন্যতম শীর্ষ ইসলামী বিদ্যাপীঠের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন গুজোব ছড়িয়ে উত্তেজনা তৈরি করাই এসব উগ্রপন্থী সংগঠনের প্রধান লক্ষ্য।