আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল: নেপথ্যে অস্ট্রেলিয়ার আওয়ামী-সংশ্লিষ্ট নেটওয়ার্কের নীল নকশা
অস্ট্রেলিয়ায় ‘লিগ্যাসি অব ফেইথ’ নামক দ্বীনি মাহফিলে যোগ দিতে যাওয়া বাংলাদেশের দুই শীর্ষস্থানীয় ইসলামি স্কলার শায়খ মিজানুর রহমান আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিলের ঘটনায় ঘনীভূত হচ্ছে রহস্য। বাহ্যিকভাবে একে আইনি প্রক্রিয়া বলা হলেও, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে এর পেছনে সক্রিয় ছিল বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্ক। মূলত রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করতে এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের হাতিয়ার হিসেবে এই দুই বক্তাকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।অস্ট্রেলিয়ার ইমিগ্রেশন বিভাগ এবং দেশটির লিবারেল সিনেটর জোনাথন ডুনিয়ামের ভাষ্য অনুযায়ী, মিজানুর রহমান আজহারী ও শায়খ আহমাদুল্লাহর বিরুদ্ধে ‘চরমপন্থী মতাদর্শ প্রচার’ এবং ‘ইহুদিবিদ্বেষী’ বক্তব্যের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী সংগঠন 'অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন ফর এথনিক অ্যান্ড রিলিজিয়াস মাইনরিটিজ ইন বাংলাদেশ' (AFERMB) অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে দাবি করে যে, এই দুই বক্তা ভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে হেয় করে বক্তব্য প্রদান করেন। সিনেটর ডুনিয়াম পার্লামেন্টে আজহারীকে ‘যুক্তরাজ্যে নিষিদ্ধ’ এবং ‘নিজ দেশে নজরদারিতে থাকা’ ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করে তার ভিসা অনুমোদনের বিষয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেন। তাদের দাবি, সামাজিক সংহতি বজায় রাখতেই এই ভিসা বাতিল করা হয়েছে।গত ৩১ মার্চ মিজানুর রহমান আজহারীকে অস্ট্রেলিয়া থেকে ফেরত পাঠানো হয় এবং ৬ এপ্রিল শায়খ আহমাদুল্লাহর ভিসা বাতিল করে তাঁর সফর আটকে দেওয়া হয়। 'ইসলামিক প্র্যাকটিস অ্যান্ড দাওয়াহ সার্কেল' (IPDC)-এর আমন্ত্রণে এই সফরটি ছিল প্রবাসীদের দ্বীনি পিপাসা মেটানোর একটি বড় আয়োজন।অভিযোগকারী সংগঠন AFERMB ৫ আগস্ট ২০২৪—বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দিনেই সিডনিতে নিবন্ধিত হয়।সংগঠনটির শীর্ষে রয়েছেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও অস্ট্রেলিয়া আওয়ামী লীগের বর্তমান সহ-সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু কাউন্সিলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ।তারা বাংলাদেশের ‘হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ’-এর বিতর্কিত ও অতিরঞ্জিত পরিসংখ্যান ব্যবহার করে অস্ট্রেলীয় পার্লামেন্ট ও জাতিসংঘে বিভ্রান্তিকর রিপোর্ট সরবরাহ করে আসছে।বক্তাদের বহু পুরোনো বক্তব্যকে প্রেক্ষাপটহীনভাবে এবং বিকৃত অনুবাদ করে ‘চরমপন্থা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।শায়খ আহমাদুল্লাহ জানান, ভিসা বাতিলের ইমেইলে কোনো স্পষ্ট কারণ উল্লেখ করা হয়নি। এই ঘটনার ফলে অস্ট্রেলিয়ার হাজার হাজার প্রবাসী মুসলিম তাদের প্রিয় বক্তাদের সরাসরি শোনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যা বুদ্ধিবৃত্তিক ও দাওয়াহ কর্মকাণ্ডে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিয়েছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, AFERMB এবং এর সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা সুনির্দিষ্ট ফৌজদারি অপরাধের বিচারকেও ‘সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন’ হিসেবে প্রচার করছে। উদাহরণস্বরূপ, ২৯৭ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াত আবুল বারকাত বা হত্যা মামলার আসামি কুশল বরণ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপকে তারা ‘সংখ্যালঘুবিরোধী’ কর্মকাণ্ড হিসেবে আন্তর্জাতিক মহলে তুলে ধরছে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে খণ্ডিতভাবে উপস্থাপন করে তাঁর চলাচলের অধিকার হরণ করা অন্যায্য। আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠীর এই ‘সিস্টেমেটিক অপপ্রচার’ আজ স্পষ্ট। গণতান্ত্রিক দেশে তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই না করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। এই অপশক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক মোকাবিলাই এখন সময়ের দাবি। প্রয়োজনীয় আইনি লড়াই ও বৈশ্বিক জনমত গঠন অপরিহার্য।