সংসদে নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে সরকারি দলের এমপির আপত্তিকর মন্তব্য, তীব্র ক্ষোভ ও বক্তব্য এক্সপাঞ্জ
জাতীয় সংসদে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর সংরক্ষিত আসনের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক এবং বিরোধীদলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে বিএনপি সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরীর আপত্তিকর ও কটাক্ষমূলক বক্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র উত্তেজনা ও হইচই সৃষ্টি হয়েছে। আজ রোববার (১৪ জুন) বিকেলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অধিবেশন চলাকালে এ ঘটনা ঘটে। বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে পরে বিতর্কিত বক্তব্যটি সংসদীয় রেকর্ড থেকে এক্সপাঞ্জ (প্রত্যাহার) করা হয় এবং ডেপুটি স্পিকার ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত না হানার বিষয়ে কড়া রুলিং জারি করেন।জাতীয় সংসদে ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনা চলাকালে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নারী সংসদ সদস্যদের ধর্মীয় পোশাক (হিজাব/নিকাব) এবং দলটির নেতা ও বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রীকে নিয়ে সরকারি দল বিএনপির জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য মনিরুল নুরুল হক চৌধুরীর (কুমিল্লা-৬) করা কিছু মন্তব্যকে কেন্দ্র করে এই হট্টগোল শুরু হয়।বক্তব্যের একপর্যায়ে মনিরুল হক চৌধুরী ২০০১ সালের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করে বলেন, তৎকালীন মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেনের দেওয়া এক দাওয়াতে বিরোধীদলীয় উপনেতা আবদুল্লাহ মো. তাহের তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে এসেছিলেন। মনিরুল হক কিছুটা হাস্যরস ও উপহাসের ছলে বলেন, “ঢোকার পর দেখি একটা কিছু হাঁটতেছে। আমি বললাম—তাহের ভাই ভাবী কই? উনি বলেন এই যে.. তখন বলি আপনি যে বদলায়ে আনেন নাই এটা কেমনে বুঝবো।” তাঁর এই মন্তব্যে সংসদের একাংশে হাসির রোল পড়লেও বিরোধী দল জামায়াতের সদস্যরা তাত্ক্ষণিকভাবে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।এরপরই মনিরুল হক চৌধুরী সংসদের নারী সদস্যদের ইঙ্গিত করে বিতর্কিত মন্তব্যটি করেন। তিনি বলেন, “আমাদের হাউজে বোনেরা এমপি হয়ে এসেছেন... সবাই মেধাবী। দুইজনের বক্তৃতা শুনেছি, আগামীতে কিছু করতে পারবেন, লেখাপড়া জানা। কিন্তু বুঝলাম না তো কারা আপনারা?” এ সময় তিনি হাত দিয়ে ইশারা করে বলেন, “আপনারা এদিকে দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে (জামায়াতের মহিলা এমপিদের দিকে) দেখলে… কি আছে বুঝবো না, এটা ঠিক না।”এই বক্তব্য দেওয়ার সাথে সাথেই বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যসহ সকল সদস্য আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে তীব্র ক্ষোভ ও হইচই শুরু করেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ করে বলেন, “মাননীয় সংসদ সদস্য, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলা উচিত না।” তবে বিরোধী দলের এমপিদের প্রতিবাদ ও স্লোগানের মুখে সংসদের কার্যক্রম কয়েক মিনিটের জন্য স্থবির হয়ে পড়ে।তুমুল প্রতিবাদের মুখে মনিরুল হক চৌধুরী আত্মপক্ষ সমর্থন করে বলেন, তিনি কাউকে ছোট করতে চাননি, কেবল অতীতের একটি গল্পের অবতারণা করেছেন। তিনি বলেন, “যদি কেউ ছোট হয়ে থাকেন তাহলে ক্ষমা চাইছি।” এরপর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল রুলিং দিয়ে বলেন, “আপনি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এই অংশটুকু এক্সপাঞ্জ করা হলো।” ডেপুটি স্পিকারের এই সিদ্ধান্তকে বিরোধী দলের সদস্যরা হাততালি দিয়ে স্বাগত জানান।এরপর ডেপুটি স্পিকার সংসদ সদস্যদের সতর্ক করে বলেন, “আপনারা-আমরা সকলেই জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য। আমরা যদি আমাদের শালীনতা, আমাদের সম্মান-মর্যাদা না রাখি, জাতির কাছে, যারা আমাদের ভোট দিয়ে সংসদে পাঠিয়েছেন, তাঁদের কাছে লজ্জিত হব। এই মহান সংসদ গণতান্ত্রিক কার্যক্রম পরিচালনার চারণক্ষেত্র, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে কেউ কোনো কথা ভবিষ্যতে বলবেন না।”তবে আসরের নামাজের বিরতির ঠিক আগে মনিরুল হক চৌধুরী বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে নিয়ে এবং জামায়াতের একটি লিফলেট প্রদর্শন করে আবারও আক্রমণাত্মক বক্তব্য দিলে সংসদে দ্বিতীয় দফায় উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর ডেপুটি স্পিকার ৩০ মিনিটের জন্য অধিবেশন মুলতবি করেন।আসরের নামাজের বিরতি শেষে অধিবেশন পুনরায় শুরু হলে পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে ক্ষোভ উগরে দেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে ‘হীন ও বর্ণবাদী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, “উনার বক্তব্য সংসদীয় রীতিনীতি এবং আমাদের সাংবিধানিক অধিকারের সকল সীমা অতিক্রম করেছে। প্রথমত, উনি সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতার স্ত্রীকে নিয়ে সংসদে এনে যেভাবে কটাক্ষ করেছেন, তা অমার্জনীয় অপরাধ। দ্বিতীয়ত, উনি বিরোধী দলের মহিলা এমপিদের পোশাক নিয়ে যে ধরনের কথা বললেন, তাদের ধর্মীয় স্বাধীনতাকে হরণ সম্পর্কিত যে ধরনের বক্তব্য দিলেন, এটাও একটি অমার্জনীয় অপরাধ। প্রত্যেকটা ব্যক্তির গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে তার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পোশাকের স্বাধীনতা রয়েছে। উনি একজন সংসদ সদস্য হিসেবে সেই স্বাধীনতাকে লঙ্ঘন করে বর্ণবাদী আচরণের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।”পরে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল চিফ হুইপের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে তাঁর আগের রুলিং পুনর্ব্যক্ত করেন এবং সংসদীয় রীতিনীতির বাইরের সমস্ত আপত্তিকর শব্দ ও বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করার চূড়ান্ত নির্দেশনা দেন।বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের চিন্তা, বিবেক ও বাক-স্বাধীনতার অধিকার রয়েছে এবং ৪১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ধর্মীয় স্বাধীনতা ও ধর্মীয় আচার পালনের অধিকার সুরক্ষিত। সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী, সংসদের ভেতরে কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত জীবন, পোশাক বা ধর্মীয় বিশ্বাস নিয়ে অবমাননাকর মন্তব্য করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।সংসদীয় গণতন্ত্রে পরমতসহিষ্ণুতা এবং প্রতিটি সদস্যের ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধা বজায় রাখা অন্যতম প্রধান শর্ত। জাতীয় সংসদের মতো সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী সংস্থায় নারী জনপ্রতিনিধিদের পোশাক বা ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কটাক্ষ সুস্থ সংসদীয় চর্চার পরিপন্থী। ডেপুটি স্পিকারের তাৎক্ষণিক রুলিং এবং বক্তব্য এক্সপাঞ্জের সিদ্ধান্ত সংসদের মর্যাদা রক্ষা করলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের আচরণ রোধে সব পক্ষের সংযম ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা আবশ্যক।