পর্তুগালে প্রকাশ্যে বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ: মুসলিম অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতায় নতুন আঘাত
ইউরোপে ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়া মুসলিমবিদ্বেষ ও ডানপন্থী রাজনৈতিক প্রভাবের অংশ হিসেবে পর্তুগালে প্রকাশ্যে বোরকা ও নিকাব পরা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো আইনটিতে চূড়ান্ত স্বাক্ষর করার পর আনুষ্ঠানিকভাবে এটি জারি করা হয়। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে সর্বনিম্ন ১৫০ থেকে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ইউরো পর্যন্ত কঠোর জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। মূলত মুসলিম নারীদের পোশাকের ওপর আঘাত হিসেবে দেখা এই সিদ্ধান্ত ইউরোপের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে।পর্তুগাল সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ্যে মুখ ঢেকে রাখা বা বোরকা পরা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট আন্তোনিও জোসে সেগুরো বিতর্কিত এই বিলে অনুমোদন দেওয়ার পর এটি আইনে পরিণত হয়। 'পরিচয় শনাক্তকরণ ও সামাজিক নিরাপত্তা'র অজুহাত দেখিয়ে পাস হওয়া এই আইনের মূল লক্ষ্য যে মুসলিম নারীরা, তা প্রকাশ পেয়েছে স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পর্যবেক্ষণে।নতুন এই আইনের অধীনে জনসমক্ষে এমন কোনো পোশাক, আবরণ বা পর্দা ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে যা ব্যক্তির মুখাবয়ব পুরোপুরি বা আংশিক ঢেকে রাখে এবং পরিচয় শনাক্তকরণে বাধা তৈরি করে। আইন অমান্যকারীর জন্য কঠোর আর্থিক শাস্তির বিধান নির্ধারণ করা হয়েছে, যার পরিমাণ ১৫০ ইউরো থেকে শুরু করে ৩,০০০ ইউরো (প্রায় ৩,৯০,০০০ টাকা) পর্যন্ত হতে পারে।তবে আইনটিতে কৌশলগত কিছু ছাড় রাখা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন (যেমন মাস্ক), পেশাগত বাধ্যবাধকতা, শিল্পকলা বা পারফর্ম্যান্স এবং বৈরী আবহাওয়া। এছাড়া উপাসনালয়, কূটনৈতিক মিশন এবং উড়োজাহাজের অভ্যন্তরে মুখ ঢেকে রাখার অনুমতি দেয়া হয়েছে। তবে সাধারণ রাস্তায় ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাক নিকাব ব্যবহারের অধিকার খর্ব করা হয়েছে।পর্তুগিজ গণমাধ্যমে ইতোমধ্যে এটি ‘বোরকা আইন’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। প্রেসিডেন্ট সেগুরো নিজের সিদ্ধান্তের পক্ষে যুক্তি দিয়ে দাবি করেছেন, ‘পর্তুগিজ সমাজে মুখ খোলা রাখা সামাজিক আস্থা ও পারস্পরিক যোগাযোগের অন্যতম ভিত্তি।’ সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে নিরাপত্তা ও সামাজিক মেলবন্ধনের বিষয় বলা হলেও সমালোচক ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এটি মূলত মুসলিম ধর্মীয় নীতি ও মুসলিম নারীদের স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আক্রমণ।আইনটি পাশের পেছনে কাজ করেছে পর্তুগালের উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক জোট। কট্টর ডানপন্থী 'চেগা পার্টি' (Chega) প্রথম এই বিলের প্রস্তাব উত্থাপন করে এবং মধ্য-ডানপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থন নিয়ে গত জুলাই মাসে পার্লামেন্টে তা পাস করিয়ে নেয়। দেশটির বামপন্থী দলগুলো, যেমন সোশ্যালিস্ট পার্টি, লিভরে এবং কমিউনিস্ট পার্টি এর তীব্র বিরোধিতা করেছে। তাদের মতে, এই ধরনের বৈষম্যমূলক আইন পর্তুগাল জুড়ে চরমপন্থী ইসলামবিদ্বেষ উসকে দেবে এবং সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করবে।পর্তুগিজ অ্যাসোসিয়েশন অব উইমেন ল’ইয়ার্স সহ একাধিক আইন বিশেষজ্ঞ ও অধিকার সংস্থা এই আইনের সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা মনে করেন, ব্যক্তি স্বাধীনতা ও ধর্মপালনের মৌলিক অধিকারকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাবলে লঙ্ঘন করা হয়েছে।পর্তুগালের এই চরমপন্থী পদক্ষেপ হঠাৎ কোনো ঘটনা নয়। ২০১১ সালে ফ্রান্স ও বেলজিয়াম প্রথম প্রকাশ্যে মুখ ঢাকা নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে ইউরোপে এই বিতর্কিত ধারা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৬ সালে বুলগেরিয়া, ২০১৭ সালে অস্ট্রিয়া, ২০১৮ সালে ডেনমার্ক ও লুক্সেমবার্গ এবং ২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডস একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে। পশ্চিমের তথাকথিত মানবাধিকার ও ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বুলি যে মুসলিমদের ক্ষেত্রে দ্বিমুখী নীতির শিকার, ইউরোপের একের পর এক দেশের এই জাতীয় পদক্ষেপ তা পুনরায় স্পষ্ট করে দিল।