বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের অবসান ও ইরান-উপসাগরীয় দেশগুলোর গোপন সমঝোতা

মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘ কয়েক দশকের মার্কিন সামরিক ও রাজনৈতিক সমীকরণ আমূল বদলে যাওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছেন সাবেক মার্কিন শীর্ষ কূটনীতিক চাস ফ্রিম্যান। তার মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘নিরাপত্তা প্রদানে অক্ষমতা’ আঁচ করতে পেরে সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সঙ্গে গোপনে একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে, যার চূড়ান্ত পরিণতি হতে পারে এই অঞ্চল থেকে মার্কিন সামরিক ঘাঁটির অপসারণ।যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রিয়াদ রাষ্ট্রদূত এবং অভিজ্ঞ কূটনীতিক চাস ফ্রিম্যান এক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছেন, সংযুক্ত আরব আমিরাত বাদে প্রায় সব উপসাগরীয় দেশ ইরানের সাথে যুদ্ধ-পরবর্তী একটি আঞ্চলিক শৃঙ্খলার বিষয়ে নিভৃতে আলোচনা চালাচ্ছে। ফ্রিম্যানের মতে:ওয়াশিংটন তার মিত্রদের ইরানের বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিতে যেমন অক্ষম, তেমনি অনিচ্ছুক বলে প্রমাণিত হয়েছে।উপসাগরীয় দেশগুলো এখন তাদের মাটিতে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে ‘সুরক্ষা কবচ’ নয়, বরং যুদ্ধের সময় ইরানের ‘সহজ লক্ষ্যবস্তু’ হিসেবে বিবেচনা করছে।আঞ্চলিক এই পরিবর্তনের পেছনে প্রধান কারণ হিসেবে হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।চীন, রাশিয়া, ভারত এবং পাকিস্তান—প্রত্যেকটি দেশই জ্বালানি ও সারের জন্য পারস্য উপসাগরের ওপর নির্ভরশীল। ফ্রিম্যান উল্লেখ করেন, এই দেশগুলো বুঝতে পেরেছে যে হরমুজ প্রণালী সচল রাখার একমাত্র পথ ইরানের সাথে আলোচনা, আমেরিকার যুদ্ধজাহাজ নয়।এই ঘনিষ্ঠতা কোনো আবেগের জায়গা থেকে নয়, বরং কৌশলগত বাধ্যবাধকতা থেকে তৈরি হচ্ছে। ইসরায়েলি হুমকির মুখে ইরান যেমন প্রতিবেশী বন্ধু খুঁজছে, তেমনি মার্কিন অনির্ভরযোগ্যতার কারণে আরব দেশগুলোও তেহরানের সাথে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।মার্কিন প্রভাব বলয় সংকুচিত হওয়ার ফলে মধ্যপ্রাচ্যে ওয়াশিংটনের কয়েক দশকের একাধিপত্য হুমকির মুখে পড়েছে।যদিও চাস ফ্রিম্যানের এই বক্তব্য একজন অভিজ্ঞ কূটনীতিকের বিশ্লেষণ হিসেবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, তবে উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইরানের সঙ্গে "মার্কিন-মুক্ত" কোনো চুক্তির কথা এখনও স্বীকার করা হয়নি।বর্তমানেও কাতার, বাহরাইন এবং সৌদি আরবে বড় ধরনের মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বিদ্যমান। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি-ইরান সম্পর্ক পুনঃস্থাপন ফ্রিম্যানের দাবিকে জোরালো ভিত্তি দান করে।যদি এই ‘ব্যাক-ডোর’ কূটনীতি সফল হয়, তবে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা কাঠামোতে পশ্চিমা বিশ্বের আর কোনো ভূমিকা থাকবে কি না, সেই প্রশ্নটিই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।২০২৩ সালে বেইজিংয়ের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন প্রভাব হ্রাসের আলোচনা শুরু হয়। সাম্প্রতিক গাজা সংকট এবং ইরান-ইসরায়েল সরাসরি সংঘাত এই মেরুকরণকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন আর বাইরের কোনো শক্তির ওপর ভরসা না করে নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিবাদ মিটিয়ে ফেলার পথে হাঁটছে। চাস ফ্রিম্যানের পর্যবেক্ষণ সঠিক হলে, আগামী কয়েক বছরে আমরা একটি "আমেরিকা-মুক্ত" নতুন পারস্য উপসাগর দেখতে পেতে পারি।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্যের অবসান ও ইরান-উপসাগরীয় দেশগুলোর গোপন সমঝোতা