সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

ভারত থেকে ২৪০ জন ‘বনি মেনাশে’ ইহুদিকে ইসরায়েলে স্থানান্তর

ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য মণিপুর ও মিজোরামে বসবাসরত ইহুদি সম্প্রদায়ের ২৪০ জন সদস্যকে ‘আলীয়াহ’ বা অভিবাসন প্রক্রিয়ার অধীনে ইসরায়েলে নিয়ে আসা হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার তারা তেল আবিবের বেন গুরিওন বিমানবন্দরে অবতরণ করেন। ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে ভারতের এই বিশেষ নৃগোষ্ঠীর সকল সদস্যকে অধিকৃত ভূখণ্ডে স্থায়ীভাবে পুনর্বাসন করা হবে।ইসরায়েলি সরকার এবং কট্টরপন্থী ইহুদি সংগঠনগুলোর দাবি, ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম রাজ্যে চলমান জাতিগত সহিংসতা ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে সেখানে বসবাসরত ‘বনি মেনাশে’ (Bney Menaşe) সম্প্রদায় চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। ইসরায়েলের ‘অভিবাসন ও একীকরণ মন্ত্রণালয়’ এবং ‘ইহুদি এজেন্সি’ (Jewish Agency)-র পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হয়েছে যে, এই জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করা তাদের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট-এর তথ্যমতে, গত নভেম্বর ২০২৫-এ তেল আবিব প্রশাসন আনুষ্ঠানিকভাবে এই অভিবাসন পরিকল্পনা অনুমোদন করে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এটি কেবল একটি স্থানান্তর নয়, বরং “হারিয়ে যাওয়া ইহুদি সন্তানদের নিজ ভূমিতে ফিরিয়ে আনা।” তারা মনে করে, ভারতের বর্তমান উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় অস্থিরতা থেকে এই জনগোষ্ঠীকে সরিয়ে আনাই একমাত্র টেকসই সমাধান।গত ২৩ এপ্রিল বৃহস্পতিবার ভারতের মণিপুর ও মিজোরাম থেকে ২৪০ জন বনি মেনাশে ইহুদি বেন গুরিওন বিমানবন্দরে পৌঁছান। এদের অধিকাংশকে ইসরায়েলের উত্তরাঞ্চলীয় শহর নোফ হাগালিল এবং কিরিয়াত ইয়াম-এর মতো এলাকাগুলোতে পুনর্বাসন করা হচ্ছে।পরিকল্পিত অভিবাসন: ইসরায়েল আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আরও তিনটি ধাপে প্রায় ৬০০ জন ইহুদিকে নিয়ে আসার পরিকল্পনা করেছে। ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ এই সংখ্যা ১২০০-তে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য: ২০৩০ সালের মধ্যে ভারতে বসবাসরত আনুমানিক ৬ হাজার বনি মেনাশে ইহুদির সবাইকে ইসরায়েলে নিয়ে আসা হবে।আঞ্চলিক প্রভাব: এই পুনর্বাসন প্রক্রিয়া এমন এক সময়ে ঘটছে যখন ফিলিস্তিনের অধিকৃত ভূখণ্ডে স্থানীয় মুসলিম জনসংখ্যাকে উচ্ছেদ করে নতুন নতুন বসতি নির্মাণের মাধ্যমে জনতাত্ত্বিক কাঠামো পরিবর্তনের অভিযোগ রয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই নতুন অভিবাসীদের অনেককেই বিতর্কিত বা স্পর্শকাতর সীমান্ত এলাকাগুলোতে বসতি স্থাপন করানো হতে পারে, যা পরোক্ষভাবে ফিলিস্তিনিদের ভূমি অধিকারকে আরও সংকুচিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা এবং ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, ইসরায়েলের এই ‘নিরাপত্তার অজুহাত’ আসলে তাদের দীর্ঘমেয়াদী জনতাত্ত্বিক কৌশলের অংশ। ইসরায়েলি আইন ‘ল অফ রিটার্ন’ ব্যবহার করে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইহুদিদের নিয়ে আসা হলেও, কয়েক প্রজন্ম ধরে বাস করা ফিলিস্তিনি উদ্বাস্তুদের নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার (Right of Return) আন্তর্জাতিক আইন স্বীকৃত হওয়া সত্ত্বেও ইসরায়েল তা ধারাবাহিকভাবে অস্বীকার করে আসছে।জাতিসংঘের বিভিন্ন রেজুলেশন ও জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী, অধিকৃত বা বিতর্কিত অঞ্চলে বিদেশি নাগরিকদের পুনর্বাসন করে স্থানীয় জনতাত্ত্বিক ভারসাম্য নষ্ট করা অবৈধ। ভারতের মণিপুরের সংকটকে পুঁজি করে এই দ্রুত অভিবাসন প্রক্রিয়াটি ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলি দখলদারিত্বকে আরও শক্তিশালী করবে কিনা, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। ন্যায়ের দাবি হলো—একদিকে যখন কোনো গোষ্ঠীর নিরাপত্তার কথা বলে হাজার মাইল দূর থেকে সরিয়ে আনা হচ্ছে, তখন নিজ ভূমিতে থাকা ফিলিস্তিনি মুসলিমদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা কেন পদদলিত হবে? এই বৈষম্যমূলক নীতি আন্তর্জাতিক আইনি কাঠামোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। মুসলিম উম্মাহ ও বিশ্ব সম্প্রদায়ের উচিত এই জনতাত্ত্বিক পরিবর্তনের নেপথ্য উদ্দেশ্যগুলো খতিয়ে দেখা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় সোচ্চার হওয়া।

ভারত থেকে ২৪০ জন ‘বনি মেনাশে’ ইহুদিকে ইসরায়েলে স্থানান্তর