মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে মিশরের অন্তর্ভুক্তি মুসলিম বিশ্বের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করবে: প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান
তুর্কিয়ে, সৌদি আরব এবং পাকিস্তানের মধ্যে সদ্য স্বাক্ষরিত 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'-তে চতুর্থ প্রভাবশালী সদস্য হিসেবে মিশরের অন্তর্ভুক্তির জোরালো সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকারে তুর্কিয়ের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী রাজনৈতিক অস্থিরতা, গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার হুমকি মোকাবেলায় মুসলিম বিশ্বের চার প্রধান সামরিক শক্তিকে এক ছাতার নিচে আনার এই উদ্যোগ একটি ঐতিহাসিক বাঁক পরিবর্তন বলে মনে করা হচ্ছে।মুসলিম বিশ্বের ঐক্য ও 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'সৌদি আরবের পবিত্র মক্কা নগরীতে তুর্কিয়ের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের উপস্থিতিতে স্বাক্ষরিত হয় 'মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি'। এই চুক্তির মূল রূপরেখা অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটি যদি কোনো বহিরাগত শত্রুর দ্বারা আক্রান্ত হয়, তবে তা তিন দেশের ওপরই যৌথ আক্রমণ হিসেবে বিবেচিত হবে এবং সমন্বিত সামরিক জবাব দেওয়া হবে। ন্যাটোর 'অনুচ্ছেদ ৫'-এর আদলে গঠিত এই ঐতিহাসিক প্রতিরক্ষা জোট আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক বিরাট সংকেত পাঠিয়েছে। এবার এই জোটে মিশরের যোগদানের ইঙ্গিত দিয়ে এরদোয়ান স্পষ্ট করেছেন যে, এই চুক্তি কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে নয়, বরং মুসলিম বিশ্বের সম্মিলিত নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থেই প্রসারিত করা হচ্ছে।গাজা, লেবানন ও সিরিয়া ইস্যুতে তুর্কিয়ের কঠোর অবস্থানআল জাজিরার উপস্থাপক আলী আল দাফিরিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এরদোয়ান মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংকট নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, "তুর্কিয়ে কোনো অবস্থাতেই গাজার ফিলিস্তিনি ভাইদের নিঃসঙ্গ ছেড়ে দিতে পারে না।" তিনি উল্লেখ করেন, প্রতিরোধ যোদ্ধা হামাস তাদের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ইতিবাচক পদক্ষেপে বজায় রাখলেও দখলদার ইসরায়েল ক্রমাগত তাদের সামরিক আগ্রাসন চালিয়ে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করছে।লেবাননে ইসরায়েলি আক্রমণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে এরদোয়ান বলেন, তিনি সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের তুর্কিয়ে সফরকালে যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কার্যকর ভূমিকা পালনের জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি, সিরিয়ার আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও শান্তিতে সে দেশের সুন্নি ও কুর্দি জনসংখ্যার সমান অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন এবং শিগগিরই সিরিয়া সফরের পরিকল্পনার কথা জানান।হরমুজ প্রণালী ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতাকৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনঃউন্মুক্ত করা আঙ্কারার অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার উল্লেখ করে এরদোয়ান সতর্ক করেন যে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান জ্বালানি রুটে সামরিক প্রতিবন্ধকতা সব পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর। বিরোধ নিষ্পত্তিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাতারের গঠনমূলক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন তিনি। এছাড়া সুদান ও লিবিয়ার জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আঙ্কারার পূর্ণ সমর্থনের কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।ইইউ বর্জন ও সার্বভৌম প্রতিরক্ষা নীতির নতুন দিগন্তদীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্যপদের দ্বারে অপেক্ষা করলেও তুর্কিয়ে এখন আর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে না বলে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান স্পষ্ট জানান। তিনি অভিযোগ করেন, ইউরোপীয় নেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব রয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত ইইউ আঙ্কারাকে বাদ দিয়ে নিজেদেরই বেশি ক্ষতি করছে।অন্যদিকে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান চুক্তি প্রসঙ্গে এরদোয়ান বলেন, রাশিয়া থেকে এস-৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয়ের পর যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ট্রাম্প। তবে মার্কিন কংগ্রেসের ভেটো অগ্রাহ্য করে তুর্কিয়ে স্বনির্ভর ও স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতিতে এগিয়ে যাবে।তুর্কিয়ে, পাকিস্তান, সৌদি আরব এবং সম্ভাব্য মিশরের সমন্বয়ে গঠিত এই চার-দেশীয় জোট যদি পূর্ণতা পায়, তবে তা কেবল মধ্যপ্রাচ্য নয়, বরং সামগ্রিক মুসলিম উম্মাহর সার্বভৌমত্ব ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে এক নতুন মাত্রায় উন্নীত করবে।