রোববার, ১৭ মে ২০২৬
রোববার, ১৭ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

শান্তির স্বার্থে বাবরি মসজিদের রায় মেনে নিয়েছিল মুসলিমরা: ভোজশালা রায় নিয়ে মাহমুদ মাদানির প্রশ্ন

ভারতে একের পর এক ধর্মীয় উপাসনালয় নিয়ে নতুন আইনি বিরোধ তৈরি হওয়ায় ১৯৯১ সালের 'উপাসনালয় আইন' (Places of Worship Act)-এর কার্যকারিতা নিয়ে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ মাদানি। তিনি বলেছেন, দেশের শান্তি ও শৃঙ্খলার স্বার্থে মুসলিম সমাজ বাবরি মসজিদের রায় মেনে নিয়েছিল। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে একের পর এক নতুন বিতর্কিত রায় এই বিশেষ আইনটির অস্তিত্বকেই হুমকির মুখে ফেলছে।ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লির 'কনস্টিটিউশন ক্লাব অব ইন্ডিয়া'-তে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দ এবং 'সোসাইটি ফর অ্যাওয়ারনেস অ্যান্ড লিগ্যাল এইড' (SAMLA)-এর যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে দেশের চলমান ধর্মীয় ও আইনি পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে।সেমিনারে জমিয়ত প্রধান মাহমুদ মাদানি বলেন, "বাবরি মসজিদের রায়টি একটি ঐতিহাসিক রায় ছিল এবং মুসলিমরা তা মেনে নিয়েছিল বলেই এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে পেরেছে।" তিনি উল্লেখ করেন, অযোধ্যা মামলার রায়ের আগে আদালতের বাইরে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং তখন আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল যে বাবরি মসজিদের পর আর কোনো ধর্মীয় স্থান নিয়ে নতুন করে কোনো বিরোধ তোলা হবে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, এই রায়ের পরপরই দেশের বিভিন্ন আদালত জুড়ে একের পর এক নতুন মামলার সুনামি শুরু হয়েছে।মাওলানা মাদানি সাফ প্রশ্ন তোলেন, "যদি উপাসনালয় আইন বলবৎ থাকার পরেও ধর্মীয় স্থানগুলো নিয়ে আদালতে একের পর এক বিতর্কিত মামলা চলতেই থাকে, তবে এই আইনের আর কী প্রয়োজন আছে?"১৯৯১ সালের উপাসনালয় (বিশেষ বিধান) আইন অনুযায়ী, অযোধ্যা মামলা বাদে ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট ভারতের স্বাধীনতার দিন যেকোনো ধর্মীয় উপাসনালয় যে অবস্থায় বা যে ধর্মীয় চরিত্রের ছিল, তা অপরিবর্তিত থাকবে এবং এর কোনো রূপান্তর করা যাবে না। কিন্তু মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট ধার জেলার বিতর্কিত 'ভোজশালা-কামাল মাউলা মসজিদ' কমপ্লেক্সটিকে দেবী সরস্বতীর মন্দির হিসেবে ঘোষণা করার দিনই মাহমুদ মাদানি এই মন্তব্য করেন। এই রায়ের ফলে উক্ত স্থানে মুসলিমদের শুক্রবারের জুমা নামাজ পড়ার দীর্ঘদিনের অধিকার বন্ধ হয়ে গেছে।সেমিনারে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়, যার শিরোনাম ছিল— "এ ক্রিটিক্যাল অ্যানালাইসিস অব বাবরি মসজিদ জাজমেন্ট অ্যান্ড দ্য কেস অব দ্য প্লেসেস অব ওরশিপ (স্পেশাল প্রোভিশনস) অ্যাক্ট ১৯৯১" (বাবরি মসজিদের রায় এবং ১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইনের একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ)।এই প্রতিবেদনে সুপ্রিম কোর্টের অযোধ্যা রায় এবং ইসমাইল ফারুকি মামলার মতো গুরুত্বপূর্ণ রায়গুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করে দাবি করা হয় যে, সাম্প্রতিক বিচার বিভাগীয় ব্যাখ্যা ধর্মীয় স্থানগুলোর সাংবিধানিক সুরক্ষাকে দুর্বল করে দিয়েছে। ১৯৯১ সালের আইনের মূল উদ্দেশ্যকে উপেক্ষা করে বারানসি (জ্ঞানবাপী) এবং মথুরার মতো পবিত্র মসজিদগুলোর বিরুদ্ধে নতুন আইনি দাবি উত্থাপনের সুযোগ করে দেওয়া হচ্ছে। প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে অভিযোগ করা হয়:"বিচার বিভাগ যেভাবে ক্রমাগত হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছে, তাতে মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলো আইনিভাবে অরক্ষিত, সাংস্কৃতিকভাবে বিতর্কিত এবং রাজনৈতিকভাবে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছে।"সংগঠনটি অবশ্য জানিয়েছে, ভোজশালা মামলার রায়ের দিনই এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়াটি সম্পূর্ণ একটি কাকতালীয় বিষয়।অনুষ্ঠানে সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সালমান খুরশিদ বলেন, বাবরি মসজিদের রায়ের বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ ও অংশ মুসলিম পক্ষের জন্য একটি আইনি ভিত্তি তৈরি করে দিয়েছিল। অন্যদিকে, খ্যাতনামা আইনবিদ ফাইজান মুস্তফা বলেন, মধ্যপ্রদেশের ভোজশালা মামলার রায়ের সাথে বাবরি মসজিদ রায়ের অনেক মিল রয়েছে, যদিও ভোজশালার মামলাটি কোনো মালিকানা স্বত্বের (title suit) মামলা ছিল না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই বিষয়টি উচ্চ আদালতে আরও আইনি পর্যালোচনার মুখোমুখি হবে।সেমিনারের শেষভাগে জমিয়ত উলামায়ে হিন্দের পক্ষ থেকে জোর সুপারিশ করা হয় যেন দেশের আদালতগুলো ১৯৯১ সালের উপাসনালয় আইনকে কঠোরভাবে বজায় রাখে এবং ঐতিহাসিক কোনো বিরোধকে ধর্মীয় উপাসনালয় দখল বা নতুন আইনি লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে না দেয়।

শান্তির স্বার্থে বাবরি মসজিদের রায় মেনে নিয়েছিল মুসলিমরা: ভোজশালা রায় নিয়ে মাহমুদ মাদানির প্রশ্ন