শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

হিন্দু নামে অর্ডার, মুসলিম রেস্টুরেন্ট থেকে ডেলিভারি—উত্তরাখণ্ডে বিরিয়ানি বিতর্ক ঘিরে উত্তেজনা, পুলিশ হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে

উত্তরাখণ্ডে হালাল বিরিয়ানি বিক্রির জেরে মুসলিম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা



উত্তরাখণ্ডে হালাল বিরিয়ানি বিক্রির জেরে মুসলিম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উধম সিং নগরে এক মুসলিম রেস্তোরাঁ মালিকের বিরুদ্ধে হালাল চিকেন বিরিয়ানি বিক্রির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। জনৈক হিন্দু গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ‘প্রতারণা’র এই মামলাটি নথিভুক্ত করে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় রবি চন্দ্র নামক এক ব্যক্তির অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে। রবি চন্দ্রের দাবি, তিনি ‘জোমাটো’ অ্যাপে ‘সৌরভ চিকেন বিরিয়ানি’ নামক একটি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করেছিলেন, যা তিনি একজন হিন্দু মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বলে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু ডেলিভারি লোকেশন দেখে তার সন্দেহ জাগে।

অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, "রেস্তোরাঁটির অবস্থান ছিল ত্রিশূল চক নামক একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়, যেখানে কোনো হিন্দু রেস্তোরাঁ থাকার কথা নয়।" রবি চন্দ্র এবং তার বন্ধুরা মিলে ডেলিভারি রাইডারকে অনুসরণ করেন এবং দেখতে পান যে খাবারটি মূলত ‘ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মালিক রাশিদ নামক এক ব্যক্তি।

রবি চন্দ্র এফআইআর-এ (FIR) অভিযোগ করেছেন যে, রাশিদ ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দুদের প্রতারিত করার জন্য এবং তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করে অনলাইনে হালাল খাবার বিক্রি করছিলেন। কট্টরপন্থী কিছু গোষ্ঠীর দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত 'প্রতারণা' এবং শহরের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা।

ঘটনাটি ঘটে ১৬ এপ্রিল, উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপুর এলাকার উধম সিং নগরে। অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ মালিক রাশিদ যখন তার পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। রবি চন্দ্রের সাথে থাকা একদল ব্যক্তি এবং লাঠিসোঁটাধারী কিছু স্বঘোষিত ‘গোরক্ষক’ রাশিদ ও তার রেস্তোরাঁটি ঘেরাও করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা রাশিদকে লক্ষ্য করে চিৎকার করছে এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। জনৈক আক্রমণকারীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, "ও অনেক বড় ভুল করেছে, ওকে শাস্তি পেতে হবে।"

পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলেও রাশিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩১৮ (২) ধারায় (প্রতারণা) মামলা করা হয়েছে। একইসাথে ‘সৌরভ’ নামক এক ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে, যে রাশিদকে তার নাম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এই ঘটনার ফলে স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে যারা হালাল খাবার সরবরাহ করেন, তারা এখন লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা করছেন। যদিও পুলিশ জানিয়েছে দোকান বন্ধ করার কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি, তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হুমকিতে ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থবির হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো ভিন্ন নাম ব্যবহার করা বা ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে ব্যবসা করা ভারতে অবৈধ কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘খাদ্য’ ও ‘পরিচয়’কে কেন্দ্র করে যেভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক।

ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের পছন্দমতো ব্যবসা করার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কারো ধর্মীয় পরিচয় বা খাবারের অভ্যাসের কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। পুলিশি তদন্তে এটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন যে, ব্যবসায়িক কৌশল আর 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত'—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কোথায়।

পাবলিক ডোমেইনে থাকা তথ্য অনুযায়ী, অনেক রেস্তোরাঁই মাল্টি-ব্র্যান্ড ক্লাউড কিচেন হিসেবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে কেবলমাত্র মুসলিম মালিক হওয়ার কারণে কোনো আইনি ধারা চাপিয়ে দেওয়া স্বচ্ছ তদন্তের পরিপন্থী হতে পারে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো—উস্কানিদাতাদের হাত থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং নিশ্চিত করা যেন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অযৌক্তিকভাবে হয়রানি করা না হয়।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬


উত্তরাখণ্ডে হালাল বিরিয়ানি বিক্রির জেরে মুসলিম ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে প্রতারণার মামলা

প্রকাশের তারিখ : ১৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের উধম সিং নগরে এক মুসলিম রেস্তোরাঁ মালিকের বিরুদ্ধে হালাল চিকেন বিরিয়ানি বিক্রির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। জনৈক হিন্দু গ্রাহকের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ ‘প্রতারণা’র এই মামলাটি নথিভুক্ত করে। ঘটনাটি কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়লে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ঘটনার সূত্রপাত হয় রবি চন্দ্র নামক এক ব্যক্তির অনলাইন অর্ডারের মাধ্যমে। রবি চন্দ্রের দাবি, তিনি ‘জোমাটো’ অ্যাপে ‘সৌরভ চিকেন বিরিয়ানি’ নামক একটি রেস্তোরাঁ থেকে খাবার অর্ডার করেছিলেন, যা তিনি একজন হিন্দু মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বলে বিশ্বাস করেছিলেন। কিন্তু ডেলিভারি লোকেশন দেখে তার সন্দেহ জাগে।

অভিযোগকারীর ভাষ্যমতে, "রেস্তোরাঁটির অবস্থান ছিল ত্রিশূল চক নামক একটি মুসলিম অধ্যুষিত এলাকায়, যেখানে কোনো হিন্দু রেস্তোরাঁ থাকার কথা নয়।" রবি চন্দ্র এবং তার বন্ধুরা মিলে ডেলিভারি রাইডারকে অনুসরণ করেন এবং দেখতে পান যে খাবারটি মূলত ‘ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে, যার মালিক রাশিদ নামক এক ব্যক্তি।

রবি চন্দ্র এফআইআর-এ (FIR) অভিযোগ করেছেন যে, রাশিদ ইচ্ছাকৃতভাবে হিন্দুদের প্রতারিত করার জন্য এবং তাদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেওয়ার জন্য ছদ্মনাম ব্যবহার করে অনলাইনে হালাল খাবার বিক্রি করছিলেন। কট্টরপন্থী কিছু গোষ্ঠীর দাবি, এটি একটি পরিকল্পিত 'প্রতারণা' এবং শহরের শান্তি বিঘ্নিত করার চেষ্টা।

ঘটনাটি ঘটে ১৬ এপ্রিল, উত্তরাখণ্ডের রুদ্রপুর এলাকার উধম সিং নগরে। অভিযুক্ত রেস্তোরাঁ মালিক রাশিদ যখন তার পরিচয় প্রকাশ করেন, তখন পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয়। রবি চন্দ্রের সাথে থাকা একদল ব্যক্তি এবং লাঠিসোঁটাধারী কিছু স্বঘোষিত ‘গোরক্ষক’ রাশিদ ও তার রেস্তোরাঁটি ঘেরাও করে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, উত্তেজিত জনতা রাশিদকে লক্ষ্য করে চিৎকার করছে এবং পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে। জনৈক আক্রমণকারীকে চিৎকার করে বলতে শোনা যায়, "ও অনেক বড় ভুল করেছে, ওকে শাস্তি পেতে হবে।"

পুলিশি হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি শান্ত হলেও রাশিদের বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির ৩১৮ (২) ধারায় (প্রতারণা) মামলা করা হয়েছে। একইসাথে ‘সৌরভ’ নামক এক ব্যক্তিকেও অভিযুক্ত করা হয়েছে, যে রাশিদকে তার নাম ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে। এই ঘটনার ফলে স্থানীয় মুসলিম ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে অনলাইনে যারা হালাল খাবার সরবরাহ করেন, তারা এখন লক্ষ্যবস্তু হওয়ার আশঙ্কা করছেন। যদিও পুলিশ জানিয়েছে দোকান বন্ধ করার কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি, তবে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর হুমকিতে ব্যবসায়িক পরিবেশ স্থবির হয়ে পড়েছে।

মানবাধিকার ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কোনো ভিন্ন নাম ব্যবহার করা বা ফ্র্যাঞ্চাইজি মডেলে ব্যবসা করা ভারতে অবৈধ কিছু নয়। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘খাদ্য’ ও ‘পরিচয়’কে কেন্দ্র করে যেভাবে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে, তা উদ্বেগজনক।

ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(জি) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী যেকোনো নাগরিকের পছন্দমতো ব্যবসা করার অধিকার রয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী, কারো ধর্মীয় পরিচয় বা খাবারের অভ্যাসের কারণে তাকে লক্ষ্যবস্তু করা মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘন। পুলিশি তদন্তে এটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন যে, ব্যবসায়িক কৌশল আর 'ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত'—এই দুটির মধ্যে পার্থক্য কোথায়।

পাবলিক ডোমেইনে থাকা তথ্য অনুযায়ী, অনেক রেস্তোরাঁই মাল্টি-ব্র্যান্ড ক্লাউড কিচেন হিসেবে পরিচালিত হয়। এক্ষেত্রে কেবলমাত্র মুসলিম মালিক হওয়ার কারণে কোনো আইনি ধারা চাপিয়ে দেওয়া স্বচ্ছ তদন্তের পরিপন্থী হতে পারে। রাষ্ট্র ও প্রশাসনের দায়িত্ব হলো—উস্কানিদাতাদের হাত থেকে সাধারণ ব্যবসায়ীদের সুরক্ষা দেওয়া এবং নিশ্চিত করা যেন কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে অযৌক্তিকভাবে হয়রানি করা না হয়।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত