শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

উত্তরাখণ্ডে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে জম্মুর এক মুসলিমকে এলাকা ছাড়ার নির্দেশ; বদ্রি-কেদার মন্দির কমিটির বিতর্কিত সিদ্ধান্তে ক্ষোভ

কেদারনাথে অ-হিন্দুদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: জম্মুর মুসলিম খচ্চর চালককে এলাকা ছাড়ার হুমকি



কেদারনাথে অ-হিন্দুদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: জম্মুর মুসলিম খচ্চর চালককে এলাকা ছাড়ার হুমকি

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কেদারনাথে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হেনস্তার শিকার হয়েছেন জম্মু থেকে আসা এক মুসলিম খচ্চর চালক। বদ্রি-কেদার মন্দির কমিটির (BKTC) সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞার দোহাই দিয়ে উগ্রবাদী একদল যুবক তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি প্রদান করে। এই ঘটনাটি চারধাম যাত্রার শুরুর প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও প্রান্তিক কর্মীদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

বদ্রি-কেদার মন্দির কমিটি (BKTC) গত মার্চ মাসে তাদের আওতাধীন ৪৭টি মন্দিরে "অ-সনাতনী" তথা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান হেমন্ত দ্বিবেদী এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, "তীর্থস্থানগুলোর আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান ভিড় নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।" সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় উগ্রপন্থী কর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভিডিওতে একজন উগ্রবাদী কর্মীকে বলতে শোনা যায়, "এখানে মুসলমানদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।" তারা দাবি করছে যে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি হিন্দু তীর্থস্থানের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। হেনস্তাকারীদের একজন ভিডিওতে আক্রমণাত্মক সুরে বলে, "তোমরা এখান থেকে রুজি-রোজগার করো আবার আমাদের ওপরই বোমা মারো।"

গত ২২ এপ্রিল, রুদ্রপ্রয়াগের কেদারনাথ মন্দির অভিমুখে পাহাড়ি পথে জম্মুর এক মুসলিম খচ্চর চালককে ঘিরে ধরে ৩-৪ জন যুবক। ভুক্তভোগী যুবক চারধাম যাত্রা উপলক্ষে তীর্থযাত্রীদের মালামাল বহনের কাজ করতে সেখানে গিয়েছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ভুক্তভোগী যুবক শান্ত থাকলেও আক্রমণকারীরা ক্রমাগত তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করতে থাকে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে যে, সরকার কেন মুসলমানদের কেদারনাথে কাজ করতে দিচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের এই চারধাম যাত্রা প্রতিবছর হাজার হাজার মুসলিম শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, যারা খচ্চর চালক বা কায়িক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বর্তমান নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই ধরণের প্রকাশ্য বিদ্বেষ ও হেনস্তা জম্মু-কাশ্মীর থেকে আসা দরিদ্র কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া অনুচ্ছেদ ১৯ প্রতিটি নাগরিককে দেশের যেকোনো স্থানে অবাধে চলাফেরা ও পেশা নির্বাচনের অধিকার প্রদান করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, "আধ্যাত্মিক পবিত্রতা" রক্ষার নামে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে সর্বজনীন স্থানে প্রবেশে বা কর্মসংস্থানে বাধা দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নাগরিক সুরক্ষা কাঠামোর নিরিখে কোনো বেসরকারি কমিটি বা গোষ্ঠী কাউকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে পারে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরণের উস্কানিমূলক আচরণ কেবল সাম্প্রদায়িক বিভেদই বাড়ায় না, বরং পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত এবং দরিদ্র কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। উত্তরাখণ্ড সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।

বিষয় : ভারত

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

শুক্রবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৬


কেদারনাথে অ-হিন্দুদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা: জম্মুর মুসলিম খচ্চর চালককে এলাকা ছাড়ার হুমকি

প্রকাশের তারিখ : ২৪ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরাখণ্ড রাজ্যের কেদারনাথে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হেনস্তার শিকার হয়েছেন জম্মু থেকে আসা এক মুসলিম খচ্চর চালক। বদ্রি-কেদার মন্দির কমিটির (BKTC) সাম্প্রতিক এক বিতর্কিত নিষেধাজ্ঞার দোহাই দিয়ে উগ্রবাদী একদল যুবক তাকে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার হুমকি প্রদান করে। এই ঘটনাটি চারধাম যাত্রার শুরুর প্রাক্কালে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও প্রান্তিক কর্মীদের কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে।

বদ্রি-কেদার মন্দির কমিটি (BKTC) গত মার্চ মাসে তাদের আওতাধীন ৪৭টি মন্দিরে "অ-সনাতনী" তথা অন্য ধর্মাবলম্বীদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাব অনুমোদন করে। মন্দির কমিটির চেয়ারম্যান হেমন্ত দ্বিবেদী এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে যুক্তি দিয়ে বলেন, "তীর্থস্থানগুলোর আধ্যাত্মিক পবিত্রতা ও ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষা এবং ক্রমবর্ধমান ভিড় নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।" সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, স্থানীয় উগ্রপন্থী কর্মীরা এই সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে। ভিডিওতে একজন উগ্রবাদী কর্মীকে বলতে শোনা যায়, "এখানে মুসলমানদের নিষিদ্ধ করা হয়েছে।" তারা দাবি করছে যে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের উপস্থিতি হিন্দু তীর্থস্থানের পবিত্রতা নষ্ট করে এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি স্বরূপ। হেনস্তাকারীদের একজন ভিডিওতে আক্রমণাত্মক সুরে বলে, "তোমরা এখান থেকে রুজি-রোজগার করো আবার আমাদের ওপরই বোমা মারো।"

গত ২২ এপ্রিল, রুদ্রপ্রয়াগের কেদারনাথ মন্দির অভিমুখে পাহাড়ি পথে জম্মুর এক মুসলিম খচ্চর চালককে ঘিরে ধরে ৩-৪ জন যুবক। ভুক্তভোগী যুবক চারধাম যাত্রা উপলক্ষে তীর্থযাত্রীদের মালামাল বহনের কাজ করতে সেখানে গিয়েছিলেন। ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হচ্ছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ভুক্তভোগী যুবক শান্ত থাকলেও আক্রমণকারীরা ক্রমাগত তার ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে কটাক্ষ করতে থাকে। তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে যে, সরকার কেন মুসলমানদের কেদারনাথে কাজ করতে দিচ্ছে। উত্তরাখণ্ডের এই চারধাম যাত্রা প্রতিবছর হাজার হাজার মুসলিম শ্রমিকের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, যারা খচ্চর চালক বা কায়িক শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। কিন্তু বর্তমান নিষেধাজ্ঞার ফলে তাদের জীবন ও জীবিকা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এই ধরণের প্রকাশ্য বিদ্বেষ ও হেনস্তা জম্মু-কাশ্মীর থেকে আসা দরিদ্র কর্মীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে দিয়েছে।

ভারতের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫ অনুযায়ী, ধর্ম, জাতি বা লিঙ্গের ভিত্তিতে কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া অনুচ্ছেদ ১৯ প্রতিটি নাগরিককে দেশের যেকোনো স্থানে অবাধে চলাফেরা ও পেশা নির্বাচনের অধিকার প্রদান করে। মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, "আধ্যাত্মিক পবিত্রতা" রক্ষার নামে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মের মানুষকে সর্বজনীন স্থানে প্রবেশে বা কর্মসংস্থানে বাধা দেওয়া সাংবিধানিক অধিকারের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এবং ভারতের নাগরিক সুরক্ষা কাঠামোর নিরিখে কোনো বেসরকারি কমিটি বা গোষ্ঠী কাউকে এলাকা ছাড়ার হুমকি দিতে পারে না। বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরণের উস্কানিমূলক আচরণ কেবল সাম্প্রদায়িক বিভেদই বাড়ায় না, বরং পর্যটন ও স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ তদন্ত এবং দরিদ্র কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের নৈতিক ও আইনি দায়িত্ব। উত্তরাখণ্ড সরকার ও পুলিশ প্রশাসনকে উগ্রপন্থার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত