কানাডায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা মুসলিম বিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে দেশটিতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস’ (NCCM)। ২০২১ সালের জুনে ওন্টারিওতে গাড়িচাপায় একটি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার নির্মম ঘটনার বার্ষিকীকে স্মরণ করে সংস্থাটি এই দাবি উত্থাপন করেছে। তাদের মতে, কানাডায় ইসলামোফোবিয়া একটি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
কানাডার প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠন 'ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস' (NCCM) তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, বিশ্বের শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট ‘জি৭’ (G7)-এর মধ্যে কানাডাই হচ্ছে এমন এক রাষ্ট্র যেখানে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ও সহিংস হামলা সংঘটিত হচ্ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ও মুসলিমদের সুরক্ষায় সরকারের নীতিগত ঘাটতি পূরণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় বিশেষ নির্দেশিকা
সংস্থাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, মুসলিম বিদ্বেষ এবং ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সরকারের বর্তমান নীতিমালা ও কৌশলগুলো একেবারেই অপর্যাপ্ত। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে এবং মুসলিমদের আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনসিসিএম (NCCM) একটি বিশেষ নির্দেশিকা বা ‘হ্যান্ডবুক’ তৈরি ও প্রকাশ করেছে।
এই নির্দেশিকার মাধ্যমে সংগঠনটি কানাডায় বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জানমালের সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বাস্তবায়ন, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
২০২১ সালের সেই নৃশংস হামলা ও স্মৃতি চারণ
কানাডায় মুসলিম বিদ্বেষের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে এনসিসিএম ২০২১ সালের ৬ জুনের সেই কালো দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ওন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরে একটি মুসলিম পরিবারের ওপর বর্ণবাদী ও উগ্রপন্থী হামলা চালানো হয়েছিল।
হাঁটার রাস্তায় থাকা পাঁচ সদস্যের একটি মুসলিম পরিবারের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে স্পিড বাড়িয়ে পিকআপ ভ্যান উঠিয়ে দেয় ন্যাথানিয়েল ভেল্টম্যান নামের এক চরমপন্থী যুবক। এই বর্বরোচিত হামলায় একই পরিবারের চারজন সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহতরা হলেন—
এই নৃশংস ঘটনায় পরিবারের একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য ৯ বছর বয়সী শিশু ফায়েজ সালমান গুরুতর আহত হয়েছিল।
বিচার প্রক্রিয়া
ভয়াবহ এই হামলার পর ২২ বছর বয়সী ঘাতক ন্যাথানিয়েল ভেল্টম্যানকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে চেরিহিল বুলেভার্ড থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, হামলাটি সম্পূর্ণ ‘পূর্বপরিকল্পিত’ এবং ‘ঘৃণাজনিত অপরাধ’ (Hate Crime) ছিল। তৎকালীন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই ঘটনাকে সরাসরি একটি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত খুনি ভেল্টম্যানকে হত্যা এবং হত্যার চেষ্টার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
এনসিসিএম মনে করে, কেবল একজন অপরাধীর শাস্তিই যথেষ্ট নয়, বরং কানাডার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে গেঁথে থাকা ইসলামোফোবিয়ার শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে এখন সরকারের পক্ষ থেকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দ্রুত বড় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কানাডায় মুসলিমদের ওপর হামলা এটিই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে কিউবেক সিটির একটি মসজিদে বন্দুকধারীর হামলায় ৬ জন নামাজি নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়েছিলেন। লন্ডন শহরের ২০২১ সালের ঘটনাটি কানাডিয়ান সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করে এবং এরপর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামোফোবিয়া বিরোধী বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জোরালো হয়। ২০২৬ সালে এসেও মুসলিমদের এই সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রমাণ করে যে, গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশ হিসেবে কানাডার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হলে সব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমসের এই সাম্প্রতিক প্রস্তাবনা ও দাবিগুলোকে সরকার কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের আইনি সংস্কার নিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
বিষয় : ইসলামোফোবিয়া কানাডা

শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জুন ২০২৬
কানাডায় ক্রমাগত বাড়তে থাকা মুসলিম বিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে দেশটিতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার এবং সরকারের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছে ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস’ (NCCM)। ২০২১ সালের জুনে ওন্টারিওতে গাড়িচাপায় একটি মুসলিম পরিবারের চার সদস্যকে হত্যার নির্মম ঘটনার বার্ষিকীকে স্মরণ করে সংস্থাটি এই দাবি উত্থাপন করেছে। তাদের মতে, কানাডায় ইসলামোফোবিয়া একটি গভীর এবং প্রাতিষ্ঠানিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে।
কানাডার প্রভাবশালী মুসলিম সংগঠন 'ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমস' (NCCM) তাদের অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, বিশ্বের শিল্পোন্নত সাতটি দেশের জোট ‘জি৭’ (G7)-এর মধ্যে কানাডাই হচ্ছে এমন এক রাষ্ট্র যেখানে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সবচেয়ে বেশি প্রাণঘাতী ও সহিংস হামলা সংঘটিত হচ্ছে। এই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির দ্রুত অবসান ও মুসলিমদের সুরক্ষায় সরকারের নীতিগত ঘাটতি পূরণের তাগিদ দিয়েছে সংস্থাটি।
ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় বিশেষ নির্দেশিকা
সংস্থাটি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে যে, মুসলিম বিদ্বেষ এবং ইসলামোফোবিয়া মোকাবিলায় সরকারের বর্তমান নীতিমালা ও কৌশলগুলো একেবারেই অপর্যাপ্ত। এই ঘাটতি পূরণের লক্ষ্যে এবং মুসলিমদের আইনি ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এনসিসিএম (NCCM) একটি বিশেষ নির্দেশিকা বা ‘হ্যান্ডবুক’ তৈরি ও প্রকাশ করেছে।
এই নির্দেশিকার মাধ্যমে সংগঠনটি কানাডায় বসবাসরত মুসলিম জনগোষ্ঠীর জানমালের সুরক্ষার স্বার্থে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের বাস্তবায়ন, কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরকারের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
২০২১ সালের সেই নৃশংস হামলা ও স্মৃতি চারণ
কানাডায় মুসলিম বিদ্বেষের ভয়াবহতা বোঝাতে গিয়ে এনসিসিএম ২০২১ সালের ৬ জুনের সেই কালো দিনটির কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। ওন্টারিও প্রদেশের লন্ডন শহরে একটি মুসলিম পরিবারের ওপর বর্ণবাদী ও উগ্রপন্থী হামলা চালানো হয়েছিল।
হাঁটার রাস্তায় থাকা পাঁচ সদস্যের একটি মুসলিম পরিবারের ওপর ইচ্ছাকৃতভাবে এবং পূর্বপরিকল্পিতভাবে স্পিড বাড়িয়ে পিকআপ ভ্যান উঠিয়ে দেয় ন্যাথানিয়েল ভেল্টম্যান নামের এক চরমপন্থী যুবক। এই বর্বরোচিত হামলায় একই পরিবারের চারজন সদস্য ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহতরা হলেন—
এই নৃশংস ঘটনায় পরিবারের একমাত্র বেঁচে যাওয়া সদস্য ৯ বছর বয়সী শিশু ফায়েজ সালমান গুরুতর আহত হয়েছিল।
বিচার প্রক্রিয়া
ভয়াবহ এই হামলার পর ২২ বছর বয়সী ঘাতক ন্যাথানিয়েল ভেল্টম্যানকে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৬ কিলোমিটার দূরে চেরিহিল বুলেভার্ড থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তদন্ত শেষে পুলিশ জানায়, হামলাটি সম্পূর্ণ ‘পূর্বপরিকল্পিত’ এবং ‘ঘৃণাজনিত অপরাধ’ (Hate Crime) ছিল। তৎকালীন কানাডীয় প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো এই ঘটনাকে সরাসরি একটি ‘সন্ত্রাসী হামলা’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছিলেন। পরবর্তীতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আদালত খুনি ভেল্টম্যানকে হত্যা এবং হত্যার চেষ্টার অপরাধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডিত করে।
এনসিসিএম মনে করে, কেবল একজন অপরাধীর শাস্তিই যথেষ্ট নয়, বরং কানাডার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে গেঁথে থাকা ইসলামোফোবিয়ার শিকড় উপড়ে ফেলতে হলে এখন সরকারের পক্ষ থেকে আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে দ্রুত বড় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
কানাডায় মুসলিমদের ওপর হামলা এটিই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে কিউবেক সিটির একটি মসজিদে বন্দুকধারীর হামলায় ৬ জন নামাজি নিহত এবং ১৯ জন আহত হয়েছিলেন। লন্ডন শহরের ২০২১ সালের ঘটনাটি কানাডিয়ান সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করে এবং এরপর থেকেই রাষ্ট্রীয়ভাবে ইসলামোফোবিয়া বিরোধী বিশেষ প্রতিনিধি নিয়োগের দাবি জোরালো হয়। ২০২৬ সালে এসেও মুসলিমদের এই সর্বোচ্চ ঝুঁকিতে থাকা প্রমাণ করে যে, গৃহীত পদক্ষেপগুলো এখনো পুরোপুরি কার্যকর নয়।
একটি বহুসাংস্কৃতিক দেশ হিসেবে কানাডার বৈশ্বিক ভাবমূর্তি বজায় রাখতে হলে সব নাগরিকের জীবনের নিরাপত্তা ও ধর্মীয় স্বাধীনতা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। ন্যাশনাল কাউন্সিল অব কানাডিয়ান মুসলিমসের এই সাম্প্রতিক প্রস্তাবনা ও দাবিগুলোকে সরকার কীভাবে মূল্যায়ন করে এবং ভবিষ্যতে কী ধরনের আইনি সংস্কার নিয়ে আসে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন