উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে একাদশ শ্রেণীর হিন্দু ছাত্র সূর্য চৌহান হত্যাকাণ্ডের জেরে তৈরি হওয়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবার প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দল রাজ্যে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। দলটির শীর্ষ নেতা মুসলিম সম্প্রদায়কে মসজিদ বয়কট করার চরম হুঁশিয়ারি দেওয়ায় অঞ্চলটিতে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ঘটে যাওয়া একটি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ডে নতুন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ মে, পবিত্র ঈদুল আজহার (বাকরি ঈদ) দিন গাজিয়াবাদে ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সূর্য চৌহানকে আসাদ নামের এক মুসলিম যুবক হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে গত ৩১ মে গাজিয়াবাদ পুলিশ এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে (এনকাউন্টার) মূল অভিযুক্ত আসাদকে খতম করে।
তবে এই এনকাউন্টারের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তরাখণ্ডে চরমপন্থী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে উত্তরাখণ্ড হিন্দু রক্ষা দলের রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মাকে একদল যুবকের বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুমকি দিয়ে বলেন, তিনি তার এলাকায় জুম্মার নামাজ বা অন্য কোনো নামাজ পড়তে দেবেন না।
বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ললিত শর্মা অভিযুক্ত আসাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেবল আসাদ নয়, গাজিয়াবাদ পুলিশের উচিত ছিল তার পুরো পরিবারকেই এনকাউন্টারে মেরে ফেলা। তিনি বলেন, "যে মা তাকে জন্ম দিয়েছে, তাকেও এনকাউন্টার করা উচিত ছিল।"
এখানেই শেষ নয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি এক প্রকার আলটিমেটাম জারি করে তিনি বলেন, "মুসলমানরা যদি সত্যিই ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে চায়, তবে তাদের উচিত মসজিদ বয়কট করা। তাদের জন্য এটাই একমাত্র চিকিৎসা বা সমাধান।"
অতীতের ধারাবাহিকতা
ললিত শর্মার এমন উগ্র ও উস্কানিমূলক বক্তব্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে তরুণ কুমার নামের ২৬ বছর বয়সী এক হিন্দু যুবকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশী পরিবারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। হোলির সময় এক মুসলিম নারীর গায়ে জলভর্তি বেলুন ছুড়ে মারার ঘটনা থেকে সেই বিবাদের সূত্রপাত হয়। সেই সময়েও ললিত শর্মা উত্তম নগর পরিদর্শনে গিয়ে একই রকম হুমকি দিয়েছিলেন এবং সেখানে ঈদ উদযাপন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, "প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হোলি খেলা হবে।"
গাজিয়াবাদের ছাত্র খুনের ঘটনার পর পুলিশের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও কট্টরপন্থী দলগুলোর এই ধরনের উগ্র অবস্থান উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় তীব্র সামাজিক মেরুকরণ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের শাস্তি আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি ভারতের সংবিধানের ধারা ২৫ (ধর্মীয় স্বাধীনতা) এবং মৌলিক নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ললিত শর্মার এই ধরনের উস্কানিমূলক এবং উগ্র বক্তব্য এই প্রথম নয়। এর আগে গত মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে তরুণ কুমার নামের এক হিন্দু যুবক নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তিনি একই ধরনের উস্কানি দিয়েছিলেন এবং "প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হোলি খেলা হবে" বলে হুমকি দিয়ে ঈদ উদযাপনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ।
চলতি বছরের মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে হোলির রঙ ছিটানো নিয়ে দুই পরিবারের দ্বন্দ্বে তরুণ কুমার নামের এক হিন্দু যুবক নিহত হন। সেই ঘটনাটিকেও সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো। গাজিয়াবাদের বর্তমান ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের হলেও তার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রভাব উত্তরাখণ্ডের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হলেও সেটিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক বা আদর্শিক ফায়দা লোটার চেষ্টা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো উস্কানিমূলক গোষ্ঠী যেন সাধারণ নাগরিকদের ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকারে আঘাত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।
বিষয় : মানবাধিকার ভারত সংখ্যালঘু

শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ জুন ২০২৬
উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে একাদশ শ্রেণীর হিন্দু ছাত্র সূর্য চৌহান হত্যাকাণ্ডের জেরে তৈরি হওয়া সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এবার প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ডে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানকার কট্টরপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন হিন্দু রক্ষা দল রাজ্যে নামাজ পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করার দাবি তুলেছে। দলটির শীর্ষ নেতা মুসলিম সম্প্রদায়কে মসজিদ বয়কট করার চরম হুঁশিয়ারি দেওয়ায় অঞ্চলটিতে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক চাঞ্চল্য তৈরি হয়েছে।
ভারতের উত্তরপ্রদেশের গাজিয়াবাদে ঘটে যাওয়া একটি খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতিবেশী রাজ্য উত্তরাখণ্ডে নতুন করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গত ২৮ মে, পবিত্র ঈদুল আজহার (বাকরি ঈদ) দিন গাজিয়াবাদে ১৭ বছর বয়সী একাদশ শ্রেণীর ছাত্র সূর্য চৌহানকে আসাদ নামের এক মুসলিম যুবক হত্যা করে বলে অভিযোগ ওঠে। ঘটনার পর দ্রুত পদক্ষেপ নিয়ে গত ৩১ মে গাজিয়াবাদ পুলিশ এক কথিত বন্দুকযুদ্ধে (এনকাউন্টার) মূল অভিযুক্ত আসাদকে খতম করে।
তবে এই এনকাউন্টারের পরও পরিস্থিতি শান্ত হয়নি। বরং এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তরাখণ্ডে চরমপন্থী মনোভাব চাঙ্গা হয়ে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সম্প্রতি একটি ভিডিও ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে উত্তরাখণ্ড হিন্দু রক্ষা দলের রাজ্য সভাপতি ললিত শর্মাকে একদল যুবকের বিক্ষোভ সমাবেশে নেতৃত্ব দিতে দেখা যাচ্ছে। তিনি স্পষ্ট ভাষায় হুমকি দিয়ে বলেন, তিনি তার এলাকায় জুম্মার নামাজ বা অন্য কোনো নামাজ পড়তে দেবেন না।
বিতর্কিত ও উস্কানিমূলক বক্তব্য
সাংবাদিকদের সাথে আলাপকালে ললিত শর্মা অভিযুক্ত আসাদের পরিবারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর ও কঠোর ভাষা ব্যবহার করেন। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, কেবল আসাদ নয়, গাজিয়াবাদ পুলিশের উচিত ছিল তার পুরো পরিবারকেই এনকাউন্টারে মেরে ফেলা। তিনি বলেন, "যে মা তাকে জন্ম দিয়েছে, তাকেও এনকাউন্টার করা উচিত ছিল।"
এখানেই শেষ নয়, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি এক প্রকার আলটিমেটাম জারি করে তিনি বলেন, "মুসলমানরা যদি সত্যিই ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখতে চায়, তবে তাদের উচিত মসজিদ বয়কট করা। তাদের জন্য এটাই একমাত্র চিকিৎসা বা সমাধান।"
অতীতের ধারাবাহিকতা
ললিত শর্মার এমন উগ্র ও উস্কানিমূলক বক্তব্য এবারই প্রথম নয়। এর আগে চলতি বছরের মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে তরুণ কুমার নামের ২৬ বছর বয়সী এক হিন্দু যুবকের হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই প্রতিবেশী পরিবারের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হয়েছিল। হোলির সময় এক মুসলিম নারীর গায়ে জলভর্তি বেলুন ছুড়ে মারার ঘটনা থেকে সেই বিবাদের সূত্রপাত হয়। সেই সময়েও ললিত শর্মা উত্তম নগর পরিদর্শনে গিয়ে একই রকম হুমকি দিয়েছিলেন এবং সেখানে ঈদ উদযাপন করতে না দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছিলেন, "প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হোলি খেলা হবে।"
গাজিয়াবাদের ছাত্র খুনের ঘটনার পর পুলিশের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সত্ত্বেও কট্টরপন্থী দলগুলোর এই ধরনের উগ্র অবস্থান উত্তরাখণ্ড ও উত্তরপ্রদেশের সীমান্তবর্তী এলাকায় তীব্র সামাজিক মেরুকরণ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মানবাধিকার কর্মী ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের শাস্তি আইন অনুযায়ী নিশ্চিত করা বিচারব্যবস্থার দায়িত্ব। কিন্তু একটি সুনির্দিষ্ট অপরাধকে কেন্দ্র করে পুরো সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ বা নামাজ নিষিদ্ধ করার দাবি ভারতের সংবিধানের ধারা ২৫ (ধর্মীয় স্বাধীনতা) এবং মৌলিক নাগরিক অধিকারের পরিপন্থী।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ললিত শর্মার এই ধরনের উস্কানিমূলক এবং উগ্র বক্তব্য এই প্রথম নয়। এর আগে গত মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে তরুণ কুমার নামের এক হিন্দু যুবক নিহতের ঘটনাকে কেন্দ্র করেও তিনি একই ধরনের উস্কানি দিয়েছিলেন এবং "প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে হোলি খেলা হবে" বলে হুমকি দিয়ে ঈদ উদযাপনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। আইনশৃঙ্খলার স্বার্থে এই ধরনের পুনরাবৃত্তিমূলক উস্কানিমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনের জবাবদিহিতা ও কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সুশীল সমাজ।
চলতি বছরের মার্চ মাসে দিল্লির উত্তম নগরে হোলির রঙ ছিটানো নিয়ে দুই পরিবারের দ্বন্দ্বে তরুণ কুমার নামের এক হিন্দু যুবক নিহত হন। সেই ঘটনাটিকেও সাম্প্রদায়িক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলো। গাজিয়াবাদের বর্তমান ঘটনাটি উত্তর প্রদেশের হলেও তার ভৌগোলিক ও সামাজিক প্রভাব উত্তরাখণ্ডের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।
একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার সম্পন্ন হলেও সেটিকে পুঁজি করে রাজনৈতিক বা আদর্শিক ফায়দা লোটার চেষ্টা সামাজিক স্থিতিশীলতাকে বিনষ্ট করে। যেকোনো গণতান্ত্রিক সমাজে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি কোনো উস্কানিমূলক গোষ্ঠী যেন সাধারণ নাগরিকদের ধর্মীয় ও মৌলিক অধিকারে আঘাত করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব।

আপনার মতামত লিখুন