শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমি টাইমস একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান, স্বাধীন সাংবাদিকতা অব্যাহত রাখতে আপনার সহযোগিতা প্রয়োজন। সহযোগিতা করুন
শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬
কওমী টাইমস

রাজস্থানে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিপন্ন: আইনের মারপ্যাঁচে বন্ধ হলো মিশনারি স্কুল

ভারতের রাজস্থান রাজ্যে কথিত ধর্মান্তকরণের অভিযোগে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত খ্রিস্টান মিশনারি স্কুল বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। রাজস্থানের ডুঙ্গারপুর জেলার পাতেলা গ্রামে অবস্থিত ‘সেন্ট পল সেকেন্ডারি স্কুল’ বন্ধের এই সিদ্ধান্তে প্রায় ৩০০ শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে ঘিরে একদিকে ধর্মীয় উত্তজনা ও অন্যদিকে সংখ্যালঘু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়েছে।রাজস্থানের ক্ষমতাসীন দল এবং স্থানীয় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট পল সেকেন্ডারি স্কুলের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলা হচ্ছিল। তাদের দাবি, স্কুলটি উপজাতীয় অঞ্চলের দরিদ্র শিক্ষার্থীদের খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করার কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। উগ্রপন্থী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে সংবাদমাধ্যমে বলা হয়েছে, “শিক্ষার্থীদের খ্রিস্টান প্রার্থনায় বাধ্য করা হচ্ছে এবং বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে তাদের ওপর ধর্ম চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”রাজস্থান সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এই অভিযোগগুলোকে আমলে নিয়ে দাবি করেছে যে, স্কুলটি ‘সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি’ নষ্ট করছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, “ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত এবং ধর্মান্তকরণের প্রাথমিক প্রমাণ মেলায় জনস্বার্থে এবং শৃঙ্খলা রক্ষায় স্কুলের স্বীকৃতি বাতিল করা হয়েছে।” মূলত রাজস্থান ধর্মান্তকরণ বিরোধী কঠোর আইনের দোহাই দিয়ে এই পদক্ষেপকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।ঘটনাটি ঘটেছে রাজস্থানের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপজাতীয় অধ্যুষিত ডুঙ্গারপুর জেলার পাতেলা গ্রামে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা উত্তেজনার পর, প্রশাসন হঠাৎ করেই সেন্ট পল সেকেন্ডারি স্কুলের স্বীকৃতি বাতিল করে এর কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন রাতারাতি স্থবির হয়ে পড়েছে।ভুক্তভোগী অভিভাবক ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, কোনো সুনির্দিষ্ট তদন্ত বা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়েই স্কুলটি বন্ধ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীদের অধিকাংশই নিম্নবিত্ত ও সংখ্যালঘু পরিবারের। অভিভাবকরা এখন সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চরম উৎকণ্ঠার মধ্যে রয়েছেন। অনেক অভিভাবক জানান, নামমাত্র খরচে এই স্কুলে তাদের সন্তানরা আধুনিক শিক্ষা পাচ্ছিল, যা এখন বন্ধ হয়ে গেল। কর্মরত শিক্ষক ও কর্মচারীরাও কর্মসংস্থান হারিয়ে অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন। স্থানীয়রা বলছেন, সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক চাপের মুখে একটি দীর্ঘদিনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো।বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনাটি ‘রাজস্থান অবৈধ ধর্ম পরিবর্তন নিষিদ্ধ আইন, ২০২৫’-এর অপপ্রয়োগের একটি প্রকট উদাহরণ। উক্ত আইনে ‘প্রলোভন’ বা ‘ভুল উপস্থাপন’ শব্দগুলোর সংজ্ঞা অত্যন্ত অস্পষ্ট, যা প্রশাসনকে যেকোনো সেবামূলক কাজ বা ধর্মীয় আলোচনাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার অবাধ সুযোগ করে দিয়েছে।ধারা ২৫ ও ২৬: ভারতের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নিজ ধর্ম পালন ও প্রচারের অধিকার দেয়।ধারা ৩০(১): সংখ্যালঘুদের নিজস্ব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন ও পরিচালনার বিশেষ অধিকার প্রদান করা হয়েছে।মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, যেকোনো অভিযোগের তদন্ত হতে হবে স্বচ্ছ এবং নিয়মতান্ত্রিক। প্রমাণের আগেই একটি স্কুল বন্ধ করে দেওয়া ‘ন্যায্য বিচার’ বা ‘Natural Justice’-এর পরিপন্থী। এটি কেবল একটি ধর্মের ওপর আঘাত নয়, বরং ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামোর ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন।আইন যখন নিপীড়নের হাতিয়ার হয়, তখন সংখ্যালঘু নাগরিকরা নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কেবল সন্দেহের বশে ৩০০ শিশুর ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া কোনোভাবেই ন্যায্য হতে পারে যা। এই ঘটনায় স্বচ্ছ তদন্ত, দোষীদের শনাক্তকরণ এবং শিক্ষার্থীদের পুনরায় শিক্ষার অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

রাজস্থানে ৩ শতাধিক শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন বিপন্ন: আইনের মারপ্যাঁচে বন্ধ হলো মিশনারি স্কুল