ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত বছর মসজিদে নির্মমভাবে নিহত মুসলিম যুবক আবু বকর সিসের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রজাতন্ত্র চত্বরে (Place de la République) সমবেত হয়ে আন্দোলনকারীরা ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের অবসান এবং ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের এক চরম রূপ বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
আবু বকর সিসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত অলিভিয়ের এইচ-কে (Olivier H) বর্তমানে তদন্তের অধীনে রাখা হয়েছে। ঘটনার পর তিনি ইতালিতে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করেন। ফরাসি বিচার বিভাগীয় নথিতে তাকে "জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে পরিকল্পিত মানব হত্যা"র দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে ২০ জুন, ২০২৫-এ আদালতের নির্দেশে তাকে দক্ষিণ ফ্রান্সের পূর্ব পিরেনিস অঞ্চলের একটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে একে একটি আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও, সমালোচকদের দাবি, এটি বিচারে দীর্ঘসূত্রতা তৈরির একটি কৌশল হতে পারে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রিটেইলিউ ওই সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করায় সরকারি নির্লিপ্ততার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে ফ্রান্সের গার্ড প্রদেশের লা গ্র্যান্ড-কম্বে (La Grand-Combe) শহরের খাদিজা মসজিদে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ঘাতক অলিভিয়ের এইচ মসজিদে এসে আবু বকর সিসের কাছে নামাজ শেখার আগ্রহ প্রকাশ করে। উদারমনা ও সচ্চরিত্রের যুবক হিসেবে পরিচিত সিসে তাকে সাহায্য করতে রাজি হন। কিন্তু অত্যন্ত নৃশংসভাবে সিসে যখন সেজদায় যান, তখনই ঘাতক তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার এক বছর পূর্তিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে "আবু বকরের জন্য ইনসাফ", "ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়" এবং "আমরা ভুলিনি, আমরা ক্ষমা করব না" এমন স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভে ফরাসি পার্লামেন্ট সদস্য গ্যাব্রিয়েল কাথালা, আন্তোইন লিউমেন্ট এবং সাবরিনা সেবাইহি উপস্থিত ছিলেন। কাথালা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যদি কোনো গির্জা বা সিনাগগে ধর্মীয় কারণে কেউ নিহত হতো, তবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে ছুটে যেত। কিন্তু সিসের ক্ষেত্রে তা হয়নি।" মুসলিম ছাত্র সংগঠনের (EMF) সদস্য সোনিয়া জানান, ফ্রান্সে মুসলিমদের ওপর শারীরিক ও মানসিক আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে শঙ্কিত করে তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আবু বকর সিসের মৃত্যুকে নিছক অপরাধ হিসেবে নয়, বরং ফ্রান্সে শেকড় গেড়ে বসা 'ইসলামোফোবিক ক্রাইম' হিসেবে দেখছেন। ফরাসি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ২০১৬ সালে পুলিশের হাতে নিহত আদামা ট্রাওরের বোন আসা ট্রাওরে এই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, "এক বছর পার হলেও ঘাতকের বিচার সম্পন্ন হয়নি, যা ফরাসি বিচারব্যবস্থার বর্ণবাদী চরিত্রকেই তুলে ধরে।"
বিষয় : ফ্রান্স

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ এপ্রিল ২০২৬
ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে গত বছর মসজিদে নির্মমভাবে নিহত মুসলিম যুবক আবু বকর সিসের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বিশাল বিক্ষোভ কর্মসূচি পালিত হয়েছে। ঐতিহাসিক প্রজাতন্ত্র চত্বরে (Place de la République) সমবেত হয়ে আন্দোলনকারীরা ইসলামোফোবিয়া ও বর্ণবাদের অবসান এবং ঘাতকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। এই হত্যাকাণ্ড ফ্রান্সে ক্রমবর্ধমান মুসলিম বিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় বৈষম্যের এক চরম রূপ বলে অভিহিত করেছেন বিশ্লেষকরা।
আবু বকর সিসে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় প্রধান অভিযুক্ত অলিভিয়ের এইচ-কে (Olivier H) বর্তমানে তদন্তের অধীনে রাখা হয়েছে। ঘটনার পর তিনি ইতালিতে পালিয়ে গেলেও পরবর্তীতে আত্মসমর্পণ করেন। ফরাসি বিচার বিভাগীয় নথিতে তাকে "জাতি বা ধর্মের ভিত্তিতে পরিকল্পিত মানব হত্যা"র দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। তবে ২০ জুন, ২০২৫-এ আদালতের নির্দেশে তাকে দক্ষিণ ফ্রান্সের পূর্ব পিরেনিস অঞ্চলের একটি মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্রে পাঠানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে একে একটি আইনি প্রক্রিয়া হিসেবে দেখা হলেও, সমালোচকদের দাবি, এটি বিচারে দীর্ঘসূত্রতা তৈরির একটি কৌশল হতে পারে। তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রুনো রিটেইলিউ ওই সময় ঘটনাস্থল পরিদর্শন না করায় সরকারি নির্লিপ্ততার অভিযোগ ওঠে।
ঘটনাটি ঘটেছিল ২৫ এপ্রিল, ২০২৫ তারিখে ফ্রান্সের গার্ড প্রদেশের লা গ্র্যান্ড-কম্বে (La Grand-Combe) শহরের খাদিজা মসজিদে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, ঘাতক অলিভিয়ের এইচ মসজিদে এসে আবু বকর সিসের কাছে নামাজ শেখার আগ্রহ প্রকাশ করে। উদারমনা ও সচ্চরিত্রের যুবক হিসেবে পরিচিত সিসে তাকে সাহায্য করতে রাজি হন। কিন্তু অত্যন্ত নৃশংসভাবে সিসে যখন সেজদায় যান, তখনই ঘাতক তাকে ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়।
এই ঘটনার এক বছর পূর্তিতে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলে "আবু বকরের জন্য ইনসাফ", "ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি সম্ভব নয়" এবং "আমরা ভুলিনি, আমরা ক্ষমা করব না" এমন স্লোগান দেওয়া হয়। বিক্ষোভে ফরাসি পার্লামেন্ট সদস্য গ্যাব্রিয়েল কাথালা, আন্তোইন লিউমেন্ট এবং সাবরিনা সেবাইহি উপস্থিত ছিলেন। কাথালা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "যদি কোনো গির্জা বা সিনাগগে ধর্মীয় কারণে কেউ নিহত হতো, তবে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্র সেখানে ছুটে যেত। কিন্তু সিসের ক্ষেত্রে তা হয়নি।" মুসলিম ছাত্র সংগঠনের (EMF) সদস্য সোনিয়া জানান, ফ্রান্সে মুসলিমদের ওপর শারীরিক ও মানসিক আক্রমণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে, যা তাদের জীবনযাত্রাকে শঙ্কিত করে তুলেছে।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আবু বকর সিসের মৃত্যুকে নিছক অপরাধ হিসেবে নয়, বরং ফ্রান্সে শেকড় গেড়ে বসা 'ইসলামোফোবিক ক্রাইম' হিসেবে দেখছেন। ফরাসি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা ও জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। ২০১৬ সালে পুলিশের হাতে নিহত আদামা ট্রাওরের বোন আসা ট্রাওরে এই বিক্ষোভে অংশ নিয়ে বলেন, "এক বছর পার হলেও ঘাতকের বিচার সম্পন্ন হয়নি, যা ফরাসি বিচারব্যবস্থার বর্ণবাদী চরিত্রকেই তুলে ধরে।"

আপনার মতামত লিখুন