বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬
কওমী টাইমস

মেট্রো শোরুমে হিন্দুত্ববাদীদের তাণ্ডব; ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখার অভিযোগ তুলে নামফলকে সেঁটে দেওয়া হলো অবমাননাকর স্টিকার

উত্তরাখণ্ডে জুতার শোরুমে ঢুকে মুসলিম কর্মীদের ‘জিহাদি’ আখ্যা ও হেনস্থার অভিযোগ



উত্তরাখণ্ডে জুতার শোরুমে ঢুকে মুসলিম কর্মীদের ‘জিহাদি’ আখ্যা ও হেনস্থার অভিযোগ

ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন শহরে একটি নামী জুতার শোরুমে ঢুকে মুসলিম কর্মীদের চরমভাবে হেনস্থা ও অপদস্থ করেছে একদল হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থী। শোরুমের মুসলিম বিক্রয়কর্মীরা হিন্দু ক্রেতাদের ঠকানোর জন্য তাদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখছেন—এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তাদের নামফলকে (নেমপ্লেট) ‘জিহাদি’ শব্দ লিখে সেঁটে দেওয়া হয়। এই বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ভারতের পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এক ন্যাক্কারজনক বিদ্বেষমূলক অপরাধের (হেট ক্রাইম) ঘটনা সামনে এসেছে। শহরের একটি নামী জুতার ব্র্যান্ড ‘মেট্রো’ (Metro)-র শোরুমে কর্মরত মুসলিম সেলসম্যানরা এই চরম অপমানের শিকার হন।

বিপুল সংখ্যক হিন্দুত্ববাদী সমর্থক দলবদ্ধ হয়ে হঠাৎ করে দেরাদুনের ওই মেট্রো শোরুমে প্রবেশ করে। তারা শোরুমের ভেতরে থাকা মুসলিম কর্মচারীদের ঘিরে ধরে এবং একের পর এক ভিত্তিহীন অভিযোগ আনতে শুরু করে। উগ্রপন্থীদের দাবি, এই মুসলিম কর্মীরা শোরুম থেকে বিভিন্ন পণ্য চুরি করছেন এবং সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন।

আক্রমণকারীদের মূল ক্ষোভ ছিল কর্মচারীদের পোশাক ও নামফলক নিয়ে। তারা অভিযোগ তোলে যে, মুসলিম কর্মীরা তাদের আসল নামফলক প্রদর্শন না করে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখছেন, যাতে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ক্রেতারা বুঝতে না পেরে তাদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন। এই তথাকথিত ‘প্রতারণা’র অজুহাত তুলে উগ্রপন্থীরা চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং উপস্থিত মুসলিম সেলসম্যানদের নামফলকের ওপর অবমাননাকর ‘জিহাদি’ (Jihadi) লেখা স্টিকার সেঁটে দেয়।

একটি সুপরিচিত ও ব্যস্ত শোরুমের ভেতরে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ন্যাক্কারজনক এবং উসকানিমূলক ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়ে মন্তব্য বা কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে স্থানীয় দেরাদুন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সংখ্যালঘু ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্মাবলম্বী হওয়ার এবং অনুচ্ছেদ ১৯ অনুযায়ী দেশের যেকোনো প্রান্তে স্বাধীনভাবে বৈধ ব্যবসা বা চাকরি করার অধিকার রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নামফলকে নাম না থাকা কোনো আইনি অপরাধ নয়, বরং এটি অনেক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পলিসির অংশ হতে পারে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে কর্মক্ষেত্রে ঢুকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করা এবং 'জিহাদি'র মতো উস্কানিমূলক শব্দ ব্যবহার করা স্পষ্টত মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। এই ঘটনা স্থানীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

উত্তরাখণ্ড রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হকারদের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার ঘটনা ইতিপূর্বেও দেখা গেছে। এর আগে কিছু স্থানীয় প্রশাসনও দোকানপাটের সামনে মালিকের নাম ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশিকা জারি করেছিল, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিতর্ক গড়ায় এবং আদালত উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজে কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের হেনস্থা হওয়া আইন ও মানবতার পরিপন্থী। দেরাদুন প্রশাসনের উচিত দ্রুত এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা, যাতে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকে।

বিষয় : মানবাধিকার

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬


উত্তরাখণ্ডে জুতার শোরুমে ঢুকে মুসলিম কর্মীদের ‘জিহাদি’ আখ্যা ও হেনস্থার অভিযোগ

প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

featured Image

ভারতের উত্তরাখণ্ডের দেরাদুন শহরে একটি নামী জুতার শোরুমে ঢুকে মুসলিম কর্মীদের চরমভাবে হেনস্থা ও অপদস্থ করেছে একদল হিন্দুত্ববাদী উগ্রপন্থী। শোরুমের মুসলিম বিক্রয়কর্মীরা হিন্দু ক্রেতাদের ঠকানোর জন্য তাদের ধর্মীয় পরিচয় লুকিয়ে রাখছেন—এমন ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলে তাদের নামফলকে (নেমপ্লেট) ‘জিহাদি’ শব্দ লিখে সেঁটে দেওয়া হয়। এই বিদ্বেষমূলক অপরাধের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।

ভারতের পাহাড়ি রাজ্য উত্তরাখণ্ডের রাজধানী দেরাদুনে সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে এক ন্যাক্কারজনক বিদ্বেষমূলক অপরাধের (হেট ক্রাইম) ঘটনা সামনে এসেছে। শহরের একটি নামী জুতার ব্র্যান্ড ‘মেট্রো’ (Metro)-র শোরুমে কর্মরত মুসলিম সেলসম্যানরা এই চরম অপমানের শিকার হন।

বিপুল সংখ্যক হিন্দুত্ববাদী সমর্থক দলবদ্ধ হয়ে হঠাৎ করে দেরাদুনের ওই মেট্রো শোরুমে প্রবেশ করে। তারা শোরুমের ভেতরে থাকা মুসলিম কর্মচারীদের ঘিরে ধরে এবং একের পর এক ভিত্তিহীন অভিযোগ আনতে শুরু করে। উগ্রপন্থীদের দাবি, এই মুসলিম কর্মীরা শোরুম থেকে বিভিন্ন পণ্য চুরি করছেন এবং সাধারণ ক্রেতাদের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছেন।

আক্রমণকারীদের মূল ক্ষোভ ছিল কর্মচারীদের পোশাক ও নামফলক নিয়ে। তারা অভিযোগ তোলে যে, মুসলিম কর্মীরা তাদের আসল নামফলক প্রদর্শন না করে নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় গোপন রাখছেন, যাতে সনাতন ধর্মাবলম্বী বা হিন্দু ক্রেতারা বুঝতে না পেরে তাদের কাছ থেকে পণ্য কেনেন। এই তথাকথিত ‘প্রতারণা’র অজুহাত তুলে উগ্রপন্থীরা চরম ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করে এবং উপস্থিত মুসলিম সেলসম্যানদের নামফলকের ওপর অবমাননাকর ‘জিহাদি’ (Jihadi) লেখা স্টিকার সেঁটে দেয়।

একটি সুপরিচিত ও ব্যস্ত শোরুমের ভেতরে প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ন্যাক্কারজনক এবং উসকানিমূলক ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এই বিষয়ে মন্তব্য বা কী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানতে স্থানীয় দেরাদুন পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঘটনার পর থেকে স্থানীয় সংখ্যালঘু ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীদের মধ্যে এক ধরনের আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা বিরাজ করছে।

ভারতের সংবিধানের ২৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রত্যেক নাগরিকের যেকোনো ধর্মাবলম্বী হওয়ার এবং অনুচ্ছেদ ১৯ অনুযায়ী দেশের যেকোনো প্রান্তে স্বাধীনভাবে বৈধ ব্যবসা বা চাকরি করার অধিকার রয়েছে। কর্মক্ষেত্রে নামফলকে নাম না থাকা কোনো আইনি অপরাধ নয়, বরং এটি অনেক প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ পলিসির অংশ হতে পারে। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে এভাবে কর্মক্ষেত্রে ঢুকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে টার্গেট করা এবং 'জিহাদি'র মতো উস্কানিমূলক শব্দ ব্যবহার করা স্পষ্টত মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকারের লঙ্ঘন। এই ঘটনা স্থানীয় সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মনে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ও উদ্বেগ তৈরি করেছে।

উত্তরাখণ্ড রাজ্যে সাম্প্রতিক সময়ে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও হকারদের ধর্মীয় পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য বিভিন্ন কট্টরপন্থী গোষ্ঠীর পক্ষ থেকে চাপ দেওয়ার ঘটনা ইতিপূর্বেও দেখা গেছে। এর আগে কিছু স্থানীয় প্রশাসনও দোকানপাটের সামনে মালিকের নাম ঝুলিয়ে রাখার নির্দেশিকা জারি করেছিল, যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত বিতর্ক গড়ায় এবং আদালত উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

একটি গণতান্ত্রিক ও বহুত্ববাদী সমাজে কর্মক্ষেত্রে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের হেনস্থা হওয়া আইন ও মানবতার পরিপন্থী। দেরাদুন প্রশাসনের উচিত দ্রুত এই ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে দোষীদের আইনের আওতায় আনা, যাতে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় থাকে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ
সম্পাদক ও প্রকাশক : আহমাদ আওয়াহ