১২৫৮ সালে মোঙ্গল বাহিনীর আব্বাসীয় খিলাফতের ঐতিহাসিক রাজধানী বাগদাদ দখল ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও বর্বরতম অধ্যায়। এই রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনে কেবল স্থাপত্য বা লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছাই করা হয়নি, বরং সমূলে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল ইসলামি বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও আলেমদের। ইতিহাসবিদ ইউসুফ সামি কামাদানের এক গবেষণামূলক নিবন্ধে উঠে এসেছে, কীভাবে এই পরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা ইসলামি সভ্যতার সোনালী যুগের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১২৫৮ সালে মোঙ্গল শাসক হালাকু খানের নেতৃত্বে পরিচালিত বাগদাদ অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞ মুসলিম জাহানের প্রাণকেন্দ্রে এক অপূরণীয় ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক কেন্দ্রভূমি বাগদাদকে মাত্র কয়েক দিনে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। ঐতিহাসিক বিবরণী অনুযায়ী, দজলা নদীর পানি একদিকে যেমন লাখ লাখ বইয়ের কালিতে কালো হয়েছিল, অন্যদিকে নির্দোষ মুসলিমদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল।
মোঙ্গলদের এই বর্বরতা কেবল সাধারণ নাগরিকদের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন তৎকালীন জ্ঞানজগতের নক্ষত্রেরা। যাদের 'চলন্ত লাইব্রেরি' বা জীবন্ত বিশ্বকোষ বলা হতো, সেই আলেম ও পণ্ডিত সমাজকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জীবনীভিত্তিক গ্রন্থগুলোর পাতা উল্টালে দেখা যায়, কীভাবে একের পর এক রত্নকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল।
আলেম ও পণ্ডিতদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
বিখ্যাত হাম্বলি আলেম ইবনুল জাওজির (মৃত্যু: ১২০১) পৌত্র এবং মুসতানসিরিয়া মাদ্রাসার খ্যাতনামা অধ্যাপক ইবনুল জাওজিকে তাঁর বাবা এবং দুই ভাইসহ ১২৫৮ সালে বাগদাদেই নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। পারস্যের প্রখ্যাত কবি শেখ সাদী তাঁর বিখ্যাত 'গুলিস্তাঁ' গ্রন্থে এই বরেণ্য শিক্ষকের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
একই বছর মোঙ্গলদের তলোয়ারের নিচে প্রাণ হারান শাফেয়ী ফকীহ শিহাবউদ্দিন আল-জানজানি। মামলুক আমলের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে তাগরীবর্দী তাঁর ‘আন-নুজুমুজ-জাহেরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসতানসিরিয়া মাদ্রাসার এই মহান শিক্ষক মোঙ্গলদের নির্বিচার গণহত্যার অন্যতম শিকার ছিলেন।
কূটকৌশল ও অলৌকিক বেঁচে যাওয়া
এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও কেউ কেউ বিশেষ প্রজ্ঞা বা মধ্যস্থতায় প্রাণে বেঁচে যান। শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ইবনে আবিল হাদিদ প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন তুসির মধ্যস্থতায় জীবন ফিরে পান।
অন্যতম অলৌকিক ও আকর্ষণীয় বেঁচে যাওয়ার গল্পটি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে আবুশ শুকরের। ঐতিহাসিক আবু আল-ফরাজ ইবনুল ইবরির ‘তারিখু মুখতাসারিদ-দুয়াল’ গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, ১২৬০ সালে দামেস্ক বিজয়ের পর হালাকু খানের সৈন্যরা মুসলিম আমলা ও পণ্ডিতদের এই বলে ডেকে নিয়ে যায় যে, "খান আপনাদের ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।" কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই মোঙ্গলরা তাদের ওপর চড়াও হয় এবং তরবারি দিয়ে কোপাতে শুরু করে।
মৃত্যু যখন অনিবার্য, তখন ইবনে আবুশ শুকর চিৎকার করে বলে ওঠেন, "আমি একজন জ্যোতির্বিদ! আমি নক্ষত্রের গতিবিধি দেখে ভবিষ্যৎ বলতে পারি। খানের কাছে আমার একটি অত্যন্ত জরুরি বার্তা আছে।" এই কথা শুনে মোঙ্গলরা তাকে হত্যা না করে হালাকু খানের দরবারে হাজির করে। হালাকু খান তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে মারাগেহ শহরের নাসিরুদ্দিন তুসির মানমন্দিরে পাঠিয়ে দেন।
বাগদাদের বাইরেও রক্তের হোলিখেলা
মোঙ্গলদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা কেবল বাগদাদেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোঙ্গলদের সামরিক অভিযানের মানচিত্র যেখানেই বিস্তৃত হয়েছে, সেখানেই ইসলামি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কবর রচিত হয়েছে।
খোয়ারিজম (১২২১): কুবরাভিয়া সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা নাজমুদ্দিন কুবরা বৃদ্ধ বয়সেও মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হন। ঐতিহাসিক রশীদউদ্দিন ফজলুল্লাহর মতে, সেখানে এত বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল যে, হযরত নাজমুদ্দিন কুবরার পবিত্র মরদেহটি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নিশাপুর ও মার্ভ: নিশাপুরে মোঙ্গলদের হাতে শহীদ হন কালজয়ী ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি এবং 'মান্তিকুত তাইর' (পাখিদের সম্মেলন) কাব্যের রচয়িতা ফরিদউদ্দিন আত্তার। একই সময়ে মার্ভ নগরীতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও শাফেয়ী ফকীহ আবদুর রাহিম আল-সামআনিকে।
হেরাত ও ইসফাহান: চিকিৎসা শাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র নজীবউদ্দিন আল-সামারকান্দিকে ১২২২ সালে হেরাত গণহত্যার সময় শহীদ করা হয়। ইতিহাসবিদ ইবনে আবু উসাইবিয়া তাঁর ‘উয়ুনুল আনবা’ গ্রন্থে নিশ্চিত করেছেন যে, হেরাতের সাধারণ জনগণকে তরবারির নিচে কাটার সময়ই এই মহান চিকিৎসককে হত্যা করা হয়। এছাড়া পারস্যের বিখ্যাত কবি কামালউদ্দিন আল-ইসফাহানিও ইসফাহান আক্রমণের সময় মোঙ্গলদের নৃশংসতার শিকার হন।
মোঙ্গলদের এই ধারাবাহিক বর্বরতা ও মুসলিম মেধা নিধনযজ্ঞের ফলেই মূলত থমকে গিয়েছিল মুসলিম উম্মাহর বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রা, যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

রোববার, ১২ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুলাই ২০২৬
১২৫৮ সালে মোঙ্গল বাহিনীর আব্বাসীয় খিলাফতের ঐতিহাসিক রাজধানী বাগদাদ দখল ছিল মানব ইতিহাসের অন্যতম নিষ্ঠুর ও বর্বরতম অধ্যায়। এই রক্তক্ষয়ী আগ্রাসনে কেবল স্থাপত্য বা লাইব্রেরি পুড়িয়ে ছাই করা হয়নি, বরং সমূলে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল ইসলামি বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানী, দার্শনিক ও আলেমদের। ইতিহাসবিদ ইউসুফ সামি কামাদানের এক গবেষণামূলক নিবন্ধে উঠে এসেছে, কীভাবে এই পরিকল্পিত বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা ইসলামি সভ্যতার সোনালী যুগের পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল।
১২৫৮ সালে মোঙ্গল শাসক হালাকু খানের নেতৃত্বে পরিচালিত বাগদাদ অবরোধ ও ধ্বংসযজ্ঞ মুসলিম জাহানের প্রাণকেন্দ্রে এক অপূরণীয় ক্ষত সৃষ্টি করেছিল। তৎকালীন জ্ঞান-বিজ্ঞান, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বৈশ্বিক কেন্দ্রভূমি বাগদাদকে মাত্র কয়েক দিনে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করা হয়। ঐতিহাসিক বিবরণী অনুযায়ী, দজলা নদীর পানি একদিকে যেমন লাখ লাখ বইয়ের কালিতে কালো হয়েছিল, অন্যদিকে নির্দোষ মুসলিমদের রক্তে লাল হয়ে উঠেছিল।
মোঙ্গলদের এই বর্বরতা কেবল সাধারণ নাগরিকদের ওপরই সীমাবদ্ধ ছিল না; তাদের মূল লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছিলেন তৎকালীন জ্ঞানজগতের নক্ষত্রেরা। যাদের 'চলন্ত লাইব্রেরি' বা জীবন্ত বিশ্বকোষ বলা হতো, সেই আলেম ও পণ্ডিত সমাজকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জীবনীভিত্তিক গ্রন্থগুলোর পাতা উল্টালে দেখা যায়, কীভাবে একের পর এক রত্নকে দুনিয়া থেকে বিদায় করে দেওয়া হয়েছিল।
আলেম ও পণ্ডিতদের পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড
বিখ্যাত হাম্বলি আলেম ইবনুল জাওজির (মৃত্যু: ১২০১) পৌত্র এবং মুসতানসিরিয়া মাদ্রাসার খ্যাতনামা অধ্যাপক ইবনুল জাওজিকে তাঁর বাবা এবং দুই ভাইসহ ১২৫৮ সালে বাগদাদেই নির্মমভাবে শহীদ করা হয়। পারস্যের প্রখ্যাত কবি শেখ সাদী তাঁর বিখ্যাত 'গুলিস্তাঁ' গ্রন্থে এই বরেণ্য শিক্ষকের কথা অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন।
একই বছর মোঙ্গলদের তলোয়ারের নিচে প্রাণ হারান শাফেয়ী ফকীহ শিহাবউদ্দিন আল-জানজানি। মামলুক আমলের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইবনে তাগরীবর্দী তাঁর ‘আন-নুজুমুজ-জাহেরা’ গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, মুসতানসিরিয়া মাদ্রাসার এই মহান শিক্ষক মোঙ্গলদের নির্বিচার গণহত্যার অন্যতম শিকার ছিলেন।
কূটকৌশল ও অলৌকিক বেঁচে যাওয়া
এই ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেও কেউ কেউ বিশেষ প্রজ্ঞা বা মধ্যস্থতায় প্রাণে বেঁচে যান। শিয়া মতাদর্শের অনুসারী ইবনে আবিল হাদিদ প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী নাসিরুদ্দিন তুসির মধ্যস্থতায় জীবন ফিরে পান।
অন্যতম অলৌকিক ও আকর্ষণীয় বেঁচে যাওয়ার গল্পটি গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানী ইবনে আবুশ শুকরের। ঐতিহাসিক আবু আল-ফরাজ ইবনুল ইবরির ‘তারিখু মুখতাসারিদ-দুয়াল’ গ্রন্থের বিবরণ অনুযায়ী, ১২৬০ সালে দামেস্ক বিজয়ের পর হালাকু খানের সৈন্যরা মুসলিম আমলা ও পণ্ডিতদের এই বলে ডেকে নিয়ে যায় যে, "খান আপনাদের ভোজসভায় আমন্ত্রণ জানিয়েছেন।" কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পরেই মোঙ্গলরা তাদের ওপর চড়াও হয় এবং তরবারি দিয়ে কোপাতে শুরু করে।
মৃত্যু যখন অনিবার্য, তখন ইবনে আবুশ শুকর চিৎকার করে বলে ওঠেন, "আমি একজন জ্যোতির্বিদ! আমি নক্ষত্রের গতিবিধি দেখে ভবিষ্যৎ বলতে পারি। খানের কাছে আমার একটি অত্যন্ত জরুরি বার্তা আছে।" এই কথা শুনে মোঙ্গলরা তাকে হত্যা না করে হালাকু খানের দরবারে হাজির করে। হালাকু খান তাঁর জ্যোতির্বিজ্ঞান বিষয়ক জ্ঞান দেখে মুগ্ধ হন এবং তাঁকে মারাগেহ শহরের নাসিরুদ্দিন তুসির মানমন্দিরে পাঠিয়ে দেন।
বাগদাদের বাইরেও রক্তের হোলিখেলা
মোঙ্গলদের এই বুদ্ধিবৃত্তিক গণহত্যা কেবল বাগদাদেই সীমাবদ্ধ ছিল না। মোঙ্গলদের সামরিক অভিযানের মানচিত্র যেখানেই বিস্তৃত হয়েছে, সেখানেই ইসলামি বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের কবর রচিত হয়েছে।
খোয়ারিজম (১২২১): কুবরাভিয়া সুফি তরিকার প্রতিষ্ঠাতা নাজমুদ্দিন কুবরা বৃদ্ধ বয়সেও মোঙ্গলদের বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হন। ঐতিহাসিক রশীদউদ্দিন ফজলুল্লাহর মতে, সেখানে এত বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল যে, হযরত নাজমুদ্দিন কুবরার পবিত্র মরদেহটি পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি।
নিশাপুর ও মার্ভ: নিশাপুরে মোঙ্গলদের হাতে শহীদ হন কালজয়ী ফারসি সাহিত্যের কিংবদন্তি এবং 'মান্তিকুত তাইর' (পাখিদের সম্মেলন) কাব্যের রচয়িতা ফরিদউদ্দিন আত্তার। একই সময়ে মার্ভ নগরীতে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও শাফেয়ী ফকীহ আবদুর রাহিম আল-সামআনিকে।
হেরাত ও ইসফাহান: চিকিৎসা শাস্ত্রের উজ্জ্বল নক্ষত্র নজীবউদ্দিন আল-সামারকান্দিকে ১২২২ সালে হেরাত গণহত্যার সময় শহীদ করা হয়। ইতিহাসবিদ ইবনে আবু উসাইবিয়া তাঁর ‘উয়ুনুল আনবা’ গ্রন্থে নিশ্চিত করেছেন যে, হেরাতের সাধারণ জনগণকে তরবারির নিচে কাটার সময়ই এই মহান চিকিৎসককে হত্যা করা হয়। এছাড়া পারস্যের বিখ্যাত কবি কামালউদ্দিন আল-ইসফাহানিও ইসফাহান আক্রমণের সময় মোঙ্গলদের নৃশংসতার শিকার হন।
মোঙ্গলদের এই ধারাবাহিক বর্বরতা ও মুসলিম মেধা নিধনযজ্ঞের ফলেই মূলত থমকে গিয়েছিল মুসলিম উম্মাহর বৈজ্ঞানিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অগ্রযাত্রা, যা পরবর্তী কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত আর কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি।

আপনার মতামত লিখুন