বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
কওমী টাইমস

রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে পরিকল্পিত ও সংগঠিত গণহত্যা চালিয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনী

রোহিঙ্গা গণহত্যা: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুনানি শুরু


আন্তর্জাতিক ডেস্ক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ | প্রিন্ট সংস্করণ

রোহিঙ্গা গণহত্যা: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুনানি শুরু

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ/UAD)-এ মূল শুনানি শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতে ১২–২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই শুনানি। গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে, মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (UAD) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার মূল শুনানির প্রথম দিনেই গাম্বিয়া জোরালোভাবে অভিযোগ তোলে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে এবং তাদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গণহত্যা চালিয়েছে।

গাম্বিয়ার পক্ষে আদালতে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দেশটির বিচারমন্ত্রী দাউদা জালো (Dawda Jallow)। তিনি বলেন,

“এটি আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিমূর্ত বিতর্ক নয়। এটি বাস্তব মানুষের, বাস্তব গল্পের এবং একটি জীবিত জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করার জন্য লক্ষ্য করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা শুধু সংখ্যা বা পরিসংখ্যান নয়—এটি জীবিত মানুষের যন্ত্রণা।”

গাম্বিয়ার আইনজীবী দল জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে চরম নৃশংসতা, সংগঠিত ধ্বংসযজ্ঞ, এবং নারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন সহিংসতা স্পষ্টভাবে গণহত্যার অভিপ্রায় নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস (Philippe Sands) বলেন, এসব অপরাধ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।

গাম্বিয়ার আরেক আইনজীবী পল রাইখলার (Paul Reichler) আদালতে জাতিসংঘের ২০১৯ সালের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়,

“আরাকানে পরিচালিত ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এ সেনারা যুদ্ধরত ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। সবাই ছিল লক্ষ্যবস্তু—মা, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা নির্মম অভিযানের শিকার হয়েছে।”

গাম্বিয়ার আইনজীবী আরসালান সুলেমান (Arsalan Suleman) বলেন, মিয়ানমারের দাবি—এই অভিযান ছিল ‘ARSA সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা’—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযানের ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা গণহত্যার উদ্দেশ্যকে আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করে।

মিয়ানমার আদালতে জমা দেওয়া লিখিত বক্তব্যে গণহত্যার অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটি দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান ছিল বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং এতে গণহত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

এই মামলার বিশেষত্ব হলো—গণহত্যার সরাসরি শিকার কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং গাম্বিয়া ‘এরগা ওম্নেস’ (সবার প্রতি দায়বদ্ধতা) নীতির ভিত্তিতে মামলা করেছে। এই দিক থেকে মামলাটি দক্ষিণ আফ্রিকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা গণহত্যা মামলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা দায়ের করে। ২৩ জানুয়ারি ২০২০-এ আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে আদালত মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে মামলাটিকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে।

এ পর্যন্ত কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসসহ ১১টি দেশ মামলায় গাম্বিয়ার পক্ষে হস্তক্ষেপ করেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এর ফলে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের হিসাবে, মোট শরণার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে শত শত গ্রাম ধ্বংসের প্রমাণ দিয়েছে এবং এই সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধন’ ও ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

বিষয় : রোহিঙ্গা মিয়ানমার নেদারল্যান্ড

আপনার মতামত লিখুন

কওমী টাইমস

বৃহস্পতিবার, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬


রোহিঙ্গা গণহত্যা: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে শুনানি শুরু

প্রকাশের তারিখ : ১৪ জানুয়ারি ২০২৬

featured Image

রোহিঙ্গা মুসলমানদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গাম্বিয়ার করা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ/UAD)-এ মূল শুনানি শুরু হয়েছে। নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আদালতে ১২–২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত চলবে এই শুনানি। গাম্বিয়া অভিযোগ করেছে, মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গা মুসলমানদের নিশ্চিহ্ন করতে গণহত্যা কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে। এই মামলা আন্তর্জাতিক আইনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (UAD) গাম্বিয়া বনাম মিয়ানমার মামলার মূল শুনানির প্রথম দিনেই গাম্বিয়া জোরালোভাবে অভিযোগ তোলে যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী পরিকল্পিতভাবে আরাকান (রাখাইন) রাজ্যের রোহিঙ্গা মুসলমানদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে এবং তাদের সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গণহত্যা চালিয়েছে।

গাম্বিয়ার পক্ষে আদালতে উদ্বোধনী বক্তব্য দেন দেশটির বিচারমন্ত্রী দাউদা জালো (Dawda Jallow)। তিনি বলেন,

“এটি আন্তর্জাতিক আইনের কোনো বিমূর্ত বিতর্ক নয়। এটি বাস্তব মানুষের, বাস্তব গল্পের এবং একটি জীবিত জনগোষ্ঠীর প্রশ্ন। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ধ্বংস করার জন্য লক্ষ্য করেছে। রোহিঙ্গাদের ওপর যা ঘটেছে, তা শুধু সংখ্যা বা পরিসংখ্যান নয়—এটি জীবিত মানুষের যন্ত্রণা।”

গাম্বিয়ার আইনজীবী দল জানায়, মিয়ানমার সেনাবাহিনীর অভিযানে চরম নৃশংসতা, সংগঠিত ধ্বংসযজ্ঞ, এবং নারীদের বিরুদ্ধে ব্যাপক যৌন সহিংসতা স্পষ্টভাবে গণহত্যার অভিপ্রায় নির্দেশ করে। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস (Philippe Sands) বলেন, এসব অপরাধ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একটি সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতির অংশ।

গাম্বিয়ার আরেক আইনজীবী পল রাইখলার (Paul Reichler) আদালতে জাতিসংঘের ২০১৯ সালের অনুসন্ধান প্রতিবেদন থেকে উদ্ধৃতি তুলে ধরেন। প্রতিবেদনে বলা হয়,

“আরাকানে পরিচালিত ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এ সেনারা যুদ্ধরত ও বেসামরিক নাগরিকদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করেনি। সবাই ছিল লক্ষ্যবস্তু—মা, নবজাতক, অন্তঃসত্ত্বা নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থরা নির্মম অভিযানের শিকার হয়েছে।”

গাম্বিয়ার আইনজীবী আরসালান সুলেমান (Arsalan Suleman) বলেন, মিয়ানমারের দাবি—এই অভিযান ছিল ‘ARSA সন্ত্রাসী হামলার বিরুদ্ধে আত্মরক্ষা’—এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। অভিযানের ব্যাপকতা ও নিষ্ঠুরতা গণহত্যার উদ্দেশ্যকে আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করে।

মিয়ানমার আদালতে জমা দেওয়া লিখিত বক্তব্যে গণহত্যার অভিযোগ সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করেছে। দেশটি দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান ছিল বৈধ সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম এবং এতে গণহত্যার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।

এই মামলার বিশেষত্ব হলো—গণহত্যার সরাসরি শিকার কোনো রাষ্ট্র নয়, বরং গাম্বিয়া ‘এরগা ওম্নেস’ (সবার প্রতি দায়বদ্ধতা) নীতির ভিত্তিতে মামলা করেছে। এই দিক থেকে মামলাটি দক্ষিণ আফ্রিকার ইসরায়েলের বিরুদ্ধে করা গণহত্যা মামলার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক আইনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গাম্বিয়া ১১ নভেম্বর ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মামলা দায়ের করে। ২৩ জানুয়ারি ২০২০-এ আদালত মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অস্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেয়। ২০২২ সালের জুলাইয়ে আদালত মিয়ানমারের প্রাথমিক আপত্তি খারিজ করে মামলাটিকে গ্রহণযোগ্য ঘোষণা করে।

এ পর্যন্ত কানাডা, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, নেদারল্যান্ডসসহ ১১টি দেশ মামলায় গাম্বিয়ার পক্ষে হস্তক্ষেপ করেছে।

২০১৭ সালে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর তথাকথিত ‘ক্লিনিং অপারেশন’-এর ফলে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘের হিসাবে, মোট শরণার্থীর সংখ্যা ৯ লাখ ছাড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উপগ্রহচিত্রের মাধ্যমে শত শত গ্রাম ধ্বংসের প্রমাণ দিয়েছে এবং এই সহিংসতাকে ‘জাতিগত নিধন’ ও ‘গণহত্যা’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।


কওমী টাইমস

সম্পাদক ও প্রকাশক : মোঃ মুস্তাইন বিল্লাহ
কপিরাইট © ২০২৬ কওমী টাইমস । সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত