নেদারল্যান্ডসে এক ফিলিস্তিনি আশ্রয়প্রার্থীকে আটকের সময় তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে পুলিশের মাটিতে ছুড়ে ফেলার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। গত ১৯ মে ঘটে যাওয়া এই অমানবিক ঘটনার ফুটেজ সম্প্রতি প্রকাশ্যে আসার পর বিশ্বজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নির্মম এই পুলিশি আগ্রাসনের মাত্র পাঁচ দিন পরেই ওই নারী সময়ের আগে (অপরিণত) সন্তান প্রসব করতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানা গেছে।ইউরোপের মানবাধিকারের দাবিদার রাষ্ট্র নেদারল্যান্ডসে এক ফিলিস্তিনি গর্ভবতী নারীর ওপর সে দেশের পুলিশের বর্বর আচরণের চিত্র সামনে এসেছে। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখট শহরের কাছে জেইস্ট নামক এলাকার ‘কাম্পওয়েগ আশ্রয়প্রার্থী কেন্দ্রে’ এই ঘটনাটি ঘটে।কী ঘটেছিল সেই মুহূর্তেপ্রকাশিত ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিপুল সংখ্যক ডাচ পুলিশ সদস্য গাজা থেকে আসা এক ফিলিস্তিনি আশ্রয়প্রার্থী পুরুষকে চারপাশ থেকে ঘিরে ধরে আটক করছে। এ সময় তার উন্নত স্তরের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী পুলিশের কাছে এগিয়ে যান এবং তার স্বামীর সাথে থাকার অনুরোধ জানান। কিন্তু পুলিশ তার এই মানবিক অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে তাকে ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়।অন্য একটি ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর দুজন পুলিশ সদস্য ওই গর্ভবতী নারীকে ধরে টেনে-হিঁচড়ে নিয়ে যাচ্ছে। একজন গণমাধ্যমকর্মীর সাথে আলাপকালে ভুক্তভোগী ফিলিস্তিনি নারী জানান, পুলিশের এই নির্মম ও সহিংস আচরণের মানসিক ও শারীরিক ট্রমার কারণে ঘটনার ঠিক পাঁচ দিন পরেই তিনি সময়ের আগেই সন্তান প্রসব করেন।কর্তৃপক্ষের বক্তব্যডাচ জাতীয় সম্প্রচার মাধ্যম 'এনওএস' এবং স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ঘটনাটি জেইস্টের আশ্রয়প্রার্থী কেন্দ্রে ঘটার সত্যতা নিশ্চিত করেছে। তবে এই ঘটনার সূত্রপাত কীভাবে হয়েছিল, ভিডিও ধারণের আগে পুলিশ কোনো সতর্কবার্তা দিয়েছিল কি না, কিংবা ওই ফিলিস্তিনি পুরুষকে ঠিক কী কারণে আটক করা হচ্ছিল—তা এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। ওলন্দাজ (ডাচ) কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত ঘটনার কোনো বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত চলছে বলে জানিয়েছে।শরণার্থী ও আশ্রয়প্রার্থীদের সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (UNHCR)-এর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে, যেখানে যেকোনো পরিস্থিতিতে মানবিক আচরণ ও গর্ভবতী নারীদের বিশেষ সুরক্ষার কথা বলা হয়েছে। ডাচ পুলিশের এই আচরণ ইউরোপীয় মানবাধিকার সনদের (ECHR) ধারা ৩-এর (অমানবিক বা মর্যাদাহানিকর আচরণ প্রতিরোধ) লঙ্ঘন কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।এই ঘটনা ইউরোপে আশ্রয়প্রার্থীদের ওপর আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ক্রমবর্ধমান কঠোরতা এবং মানবাধিকারের দ্বিমুখী নীতিকে পুনরায় আলোচনায় এনেছে। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দোষী পুলিশ সদস্যদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা না হলে দেশটির বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যাবে।নেদারল্যান্ডসে সাম্প্রতিক সময়ে অভিবাসন ও আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন সংকট এবং তাদের প্রতি পুলিশের কঠোর মনোভাব নিয়ে বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য ও গাজা থেকে আসা যুদ্ধবিধ্বস্ত শরণার্থীদের মানসিক ট্রমা এবং তাদের সুরক্ষার বিষয়টি ডাচ রাজনীতিতেও একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।একটি গণতান্ত্রিক ও মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবে নেদারল্যান্ডসের মাটিতে এই ধরনের ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার নামে অন্তঃসত্ত্বা নারীর ওপর এমন বলপ্রয়োগ ডাচ প্রশাসনের পেশাদারিত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা ডাচ কর্তৃপক্ষের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।