মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তার পথ প্রায় রুদ্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। গাজা সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা উপত্যকাটির ২০ লক্ষাধিক মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিকভাবে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের ক্ষেত্রে 'নিরাপত্তা ঝুঁকি'র অজুহাত দিয়ে আসছে। তাদের দাবি, সীমান্তে কড়া নজরদারি ও পণ্য খালাসে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় যাতে কোনো দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে না পৌঁছায়। কট্টরপন্থী ইসরায়েলি গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই দাবি করে যে, গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রবেশ করছে এবং সংকটের জন্য স্থানীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তারা মাঝে মাঝে ত্রাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও জোরদার করার কথা বলে কার্যত সরবরাহ লাইন সংকুচিত করে রাখা হয়েছে।
গাজা সরকারি মিডিয়া অফিসের মহাপরিচালক ড. ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানিয়েছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ওপর অবরোধের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
ত্রাণবাহী ট্রাক: সাম্প্রতিক সময়ে যেখানে ৬,০০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা ছিল, সেখানে মাত্র ৬৪০টি ট্রাক ঢোকার অনুমতি পেয়েছে। এটি মোট চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকট: ৭,৪০০ ট্রাক জ্বালানির বিপরীতে মাত্র ১,০৮১টি ট্রাক প্রবেশ করেছে (১৪ শতাংশ)। রান্নার গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা: উপত্যকার ১৫ লক্ষাধিক মানুষ এখন সরাসরি খাদ্য অনিশ্চয়তার শিকার। বাজারে সবজি ও হিমায়িত খাদ্যের সরবরাহ নেই বললেই চলে, ফলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সেবা খাতে বিপর্যয়: জ্বালানি সংকটে পৌরসভাগুলো বর্জ্য অপসারণ করতে পারছে না এবং পানি পাম্প করার মেশিনগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা রোগীদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ড. থাওয়াবতা বলেন, "পূর্ববর্তী সমঝোতা অনুযায়ী যে পরিমাণ সহায়তা আসার কথা ছিল, ইসরায়েল তার ৪১ শতাংশও পালন করেনি। এটি গাজার বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত মন্থর মৃত্যুর প্রক্রিয়া।"
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার সতর্ক করেছে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা "যুদ্ধাপরাধের" শামিল।
বাস্তবতা হলো, গাজার ২৪ লক্ষ ফিলিস্তিনি নাগরিক কোনো পক্ষ নয়, বরং তারা একটি বৃহৎ কারাগারের বন্দী হিসেবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কেবল উদ্বেগ প্রকাশ না করে একটি স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার দাবি তোলা। একটি জনপদকে এভাবে তিলে তিলে নিশেষ করার দায় কে নেবে? ফিলিস্তিনিদের নাগরিক সুরক্ষা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার এখন সময়ের দাবি।
বিষয় : মধ্যপ্রাচ্য গাজা ফিলিস্তিন

সোমবার, ১৬ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তপ্ত পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় মানবিক সহায়তার পথ প্রায় রুদ্ধ করে দিয়েছে ইসরায়েল। গাজা সরকারি মিডিয়া অফিসের তথ্যমতে, সাম্প্রতিক সময়ে প্রয়োজনের তুলনায় মাত্র ১০ শতাংশ ত্রাণ প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছে, যা উপত্যকাটির ২০ লক্ষাধিক মানুষের জীবনকে চরম ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ঐতিহাসিকভাবে গাজায় ত্রাণ সরবরাহের ক্ষেত্রে 'নিরাপত্তা ঝুঁকি'র অজুহাত দিয়ে আসছে। তাদের দাবি, সীমান্তে কড়া নজরদারি ও পণ্য খালাসে কড়াকড়ি আরোপ করা হয় যাতে কোনো দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য সামগ্রী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হাতে না পৌঁছায়। কট্টরপন্থী ইসরায়েলি গোষ্ঠীগুলো প্রায়ই দাবি করে যে, গাজায় পর্যাপ্ত ত্রাণ প্রবেশ করছে এবং সংকটের জন্য স্থানীয় অব্যবস্থাপনা দায়ী। তবে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে তারা মাঝে মাঝে ত্রাণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বেষ্টনী আরও জোরদার করার কথা বলে কার্যত সরবরাহ লাইন সংকুচিত করে রাখা হয়েছে।
গাজা সরকারি মিডিয়া অফিসের মহাপরিচালক ড. ইসমাইল আল-থাওয়াবতা জানিয়েছেন, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার ওপর অবরোধের মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী:
ত্রাণবাহী ট্রাক: সাম্প্রতিক সময়ে যেখানে ৬,০০০ ট্রাক ত্রাণ প্রবেশের কথা ছিল, সেখানে মাত্র ৬৪০টি ট্রাক ঢোকার অনুমতি পেয়েছে। এটি মোট চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ।
জ্বালানি সংকট: ৭,৪০০ ট্রাক জ্বালানির বিপরীতে মাত্র ১,০৮১টি ট্রাক প্রবেশ করেছে (১৪ শতাংশ)। রান্নার গ্যাস সরবরাহ সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়েছে।
খাদ্য নিরাপত্তা: উপত্যকার ১৫ লক্ষাধিক মানুষ এখন সরাসরি খাদ্য অনিশ্চয়তার শিকার। বাজারে সবজি ও হিমায়িত খাদ্যের সরবরাহ নেই বললেই চলে, ফলে নিত্যপণ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে।
সেবা খাতে বিপর্যয়: জ্বালানি সংকটে পৌরসভাগুলো বর্জ্য অপসারণ করতে পারছে না এবং পানি পাম্প করার মেশিনগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালগুলোতে জেনারেটর চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে, যা রোগীদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ড. থাওয়াবতা বলেন, "পূর্ববর্তী সমঝোতা অনুযায়ী যে পরিমাণ সহায়তা আসার কথা ছিল, ইসরায়েল তার ৪১ শতাংশও পালন করেনি। এটি গাজার বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে একটি পরিকল্পিত মন্থর মৃত্যুর প্রক্রিয়া।"
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বারবার সতর্ক করেছে যে, ইচ্ছাকৃতভাবে মানবিক সহায়তা বাধাগ্রস্ত করা "যুদ্ধাপরাধের" শামিল।
বাস্তবতা হলো, গাজার ২৪ লক্ষ ফিলিস্তিনি নাগরিক কোনো পক্ষ নয়, বরং তারা একটি বৃহৎ কারাগারের বন্দী হিসেবে মানবেতর জীবন যাপন করছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত কেবল উদ্বেগ প্রকাশ না করে একটি স্বচ্ছ তদন্ত এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থার দাবি তোলা। একটি জনপদকে এভাবে তিলে তিলে নিশেষ করার দায় কে নেবে? ফিলিস্তিনিদের নাগরিক সুরক্ষা ও মর্যাদা পুনরুদ্ধার এখন সময়ের দাবি।

আপনার মতামত লিখুন