শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে তামিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে একটি ভয় ও বৈরিতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা ইতোমধ্যে বৈষম্যের শিকার সংখ্যালঘুদের উপর নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেইট’ (CSOH)-এর এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘Contours of Emerging Hate in Sri Lanka’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও, তা নতুন ধরনের চরমপন্থার উত্থানের পথ খুলে দিয়েছে। গবেষকরা মনে করেন, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, স্থানীয় রাজনীতি এবং ডিজিটাল অপতথ্যের সংমিশ্রণ তামিল-সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সামাজিক সম্পর্ককে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।
এই নতুন চরমপন্থা মূলত মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলঙ্কার ধর্মীয় ল্যান্ডস্কেপের অংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে তামিল-অধ্যুষিত অঞ্চলে কিছু হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সেই একই কৌশল অবলম্বন করছে, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সিংহলী-বৌদ্ধ কট্টরপন্থী দলগুলো ব্যবহার করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে বেশ কয়েকটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে:
উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের খ্রিস্টান নেতারা এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, খ্রিস্টান মণ্ডলীগুলো ধর্মান্তর, আন্তঃধর্মীয় বিবাহ বা এমনকি খ্রিস্টান প্রতীক প্রদর্শনের বিরোধিতা করা কর্মীদের দ্বারা চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। চার্চ নেতারা মনে করেন, এই কট্টর কর্মীদের দ্বারা ব্যবহৃত কিছু যুক্তি ভারতীয় ডানপন্থী গোষ্ঠীর যুক্তির অনুরূপ, যা আন্তঃসীমান্ত আদর্শিক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গবেষকরা মনে করেন, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটভূমি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যা এই গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের পর বড় তামিল রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়েছে, আবার একসময় প্রভাবশালী সিংহলী-বৌদ্ধ কট্টরপন্থী দলগুলোও গতি হারিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছোট ছোট সংগঠনগুলোকে সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছে।
রিপোর্টে শ্রীলঙ্কার হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মীদের সাথে ভারতীয় রাজনীতিবিদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মীয় কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সংযোগগুলো তাদের বার্তাগুলিকে প্রসারিত করছে এবং বাস্তবে তাদের সংখ্যা সীমিত হলেও দৃশ্যমানতা দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিংহলী-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী উসকানিতে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা এমনিতেই আতঙ্কে রয়েছে। এখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান তাদের উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তামিল-অধ্যুষিত এলাকার খ্রিস্টানদের জন্য উদ্বেগ হলো, এখন তাদের নিজস্ব জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেও বৈরিতা আসতে পারে, কেবল সিংহলী-বৌদ্ধদের কাছ থেকে নয়।
CSOH এর গবেষণায় বলেছে, এই হিন্দু গোষ্ঠীগুলো আকারে ছোট হলেও তাদের ধারণা রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ছাড়া শ্রীলঙ্কা এমন বিভাজন আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা বারবার বৈষম্য, অস্থিরতা এবং সহিংসতার চক্রে অবদান রেখেছে।
বিষয় : ইসলামফোবিয়া শ্রীলংকা

মঙ্গলবার, ০২ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫
শ্রীলঙ্কায় সংখ্যালঘু মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের ওপর চাপ ক্রমশ বাড়ছে। একটি নতুন গবেষণা প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে তামিল হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলো শ্রীলঙ্কার উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে তাদের উপস্থিতি বাড়াচ্ছে। এই গোষ্ঠীগুলো তৃণমূল পর্যায়ে প্রভাব বিস্তার করে একটি ভয় ও বৈরিতার পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা ইতোমধ্যে বৈষম্যের শিকার সংখ্যালঘুদের উপর নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অফ অর্গানাইজড হেইট’ (CSOH)-এর এক গবেষণায় এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। ‘Contours of Emerging Hate in Sri Lanka’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে গৃহযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলেও, তা নতুন ধরনের চরমপন্থার উত্থানের পথ খুলে দিয়েছে। গবেষকরা মনে করেন, ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, স্থানীয় রাজনীতি এবং ডিজিটাল অপতথ্যের সংমিশ্রণ তামিল-সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর ও পূর্বাঞ্চলে সামাজিক সম্পর্ককে নতুনভাবে প্রভাবিত করছে।
এই নতুন চরমপন্থা মূলত মুসলিম ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যারা দীর্ঘকাল ধরে শ্রীলঙ্কার ধর্মীয় ল্যান্ডস্কেপের অংশ। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে তামিল-অধ্যুষিত অঞ্চলে কিছু হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সেই একই কৌশল অবলম্বন করছে, যা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মুসলিমদের লক্ষ্য করে সিংহলী-বৌদ্ধ কট্টরপন্থী দলগুলো ব্যবহার করেছে।
গবেষণা অনুযায়ী, গত এক দশকে বেশ কয়েকটি হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠী সক্রিয় হয়েছে:
উত্তর ও পূর্বাঞ্চলের খ্রিস্টান নেতারা এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, খ্রিস্টান মণ্ডলীগুলো ধর্মান্তর, আন্তঃধর্মীয় বিবাহ বা এমনকি খ্রিস্টান প্রতীক প্রদর্শনের বিরোধিতা করা কর্মীদের দ্বারা চাপের সম্মুখীন হচ্ছে। চার্চ নেতারা মনে করেন, এই কট্টর কর্মীদের দ্বারা ব্যবহৃত কিছু যুক্তি ভারতীয় ডানপন্থী গোষ্ঠীর যুক্তির অনুরূপ, যা আন্তঃসীমান্ত আদর্শিক প্রভাবের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গবেষকরা মনে করেন, শ্রীলঙ্কার রাজনৈতিক পটভূমি এমনভাবে পরিবর্তিত হয়েছে যা এই গোষ্ঠীগুলোর জন্য সুযোগ সৃষ্টি করেছে। যুদ্ধের পর বড় তামিল রাজনৈতিক দলগুলো দুর্বল হয়েছে, আবার একসময় প্রভাবশালী সিংহলী-বৌদ্ধ কট্টরপন্থী দলগুলোও গতি হারিয়েছে। দেশের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ছোট ছোট সংগঠনগুলোকে সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের রক্ষক হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিয়েছে।
রিপোর্টে শ্রীলঙ্কার হিন্দু জাতীয়তাবাদী কর্মীদের সাথে ভারতীয় রাজনীতিবিদ, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং ধর্মীয় কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সংযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই সংযোগগুলো তাদের বার্তাগুলিকে প্রসারিত করছে এবং বাস্তবে তাদের সংখ্যা সীমিত হলেও দৃশ্যমানতা দিচ্ছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিংহলী-বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী উসকানিতে শ্রীলঙ্কার মুসলিমরা এমনিতেই আতঙ্কে রয়েছে। এখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর উত্থান তাদের উদ্বেগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তামিল-অধ্যুষিত এলাকার খ্রিস্টানদের জন্য উদ্বেগ হলো, এখন তাদের নিজস্ব জাতিগত সম্প্রদায়ের মধ্য থেকেও বৈরিতা আসতে পারে, কেবল সিংহলী-বৌদ্ধদের কাছ থেকে নয়।
CSOH এর গবেষণায় বলেছে, এই হিন্দু গোষ্ঠীগুলো আকারে ছোট হলেও তাদের ধারণা রাজনৈতিক ও সামাজিক আলোচনায় স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকারের জন্য শক্তিশালী সুরক্ষা ছাড়া শ্রীলঙ্কা এমন বিভাজন আরও গভীর হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে, যা বারবার বৈষম্য, অস্থিরতা এবং সহিংসতার চক্রে অবদান রেখেছে।

আপনার মতামত লিখুন